আপডেট : ১২ মার্চ, ২০১৬ ২১:৩২

মুস্তাফিজ ‘আলাদা জিনিস’: রমিজ

স্পোর্টস ডেস্ক
মুস্তাফিজ ‘আলাদা জিনিস’: রমিজ

বাংলাদেশ ক্রিকেটে সাম্প্রতিককালে সেরা আবিষ্কার বলে যিনি চিহ্নিত, সেই মুস্তাফিজুর রহমানের বোলিংকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন সাবেক পাকিস্তানি তারকা ও ক্রিকেট ভাষ্যকার রমিজ রাজা।

বাংলাদেশে সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল আক্রমণের মুখে পড়া রমিজ এক একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তার মতে মুস্তাফিজ ক্রিকেটের দুনিয়ায় এক অসাধারণ উপহার।

সাক্ষাৎকারের শর্তই ছিল পাকিস্তান দলের ধর্মশালায় বা ভারতে আসা নিয়ে কিংবা নিরাপত্তার প্রসঙ্গে কোনো প্রশ্ন করা চলবে না।

বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি যে মোটামুটি সর্বসম্মতভাবে এক নম্বর ভিলেন, সেটাও রামিজ রাজার বিলক্ষণ জানা – এবং সেখানে কী কী নামে তাকে ডাকা হয় সেগুলোও দেখা গেল দিব্বি মুখস্থ আছে। কিন্তু আবার – ওই ব্যাপারে তিনি মুখ খুলবেন না।

কিন্তু মুস্তাফিজুর রহমানের বোলিং ?

সঙ্গে সঙ্গে এক কথায় রাজি পাকিস্তানের এককালের এই দারুণ স্টাইলিশ ব্যাটসম্যান, ৯২য়ে বিশ্বকাপজয়ী দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আর বর্তমানে দুনিয়া চষে বেড়ানো টেলিভিশন ভাষ্যকার। ‘হ্যাঁ, এই টপিকটা দারুণ – বলুন, কী জানতে চান?’ বলে নিজেই রেকর্ডার অন করতে ইঙ্গিত করলেন রমিজ রাজা!

তো ধর্মশালার অপূর্ব সুন্দর স্টেডিয়াম যখন বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে – খেলা বন্ধ – তখনই রামিজের সঙ্গে বিবিসির কথোপকথন হল এরকম:

প্রশ্ন: আজকের এই প্রযুক্তির যুগে কোনো বোলারকে নিয়েই তো বেশিদিন না কি রহস্য থাকে না। কিন্তু গত বছরে অভিষেক হওয়া মুস্তাফিজুর রহমান কিন্তু এখনো ব্যাটসম্যানদের কাছে রীতিমতো হেঁয়ালি ... বিশেষ করে তার বিখ্যাত কাটার ডেলিভারিটার জন্য। আপনি কী বলবেন?

রমিজ : দেখুন, একটা কথা আমি খুব বিশ্বাস করি আপনি যদি ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের নজর কাড়তে পারেন তাহলে কিন্তু বিশ্ব ক্রিকেটের মঞ্চে আপনার ‘আবির্ভাব’ হয়ে গেছে। কারণ ভারতের ব্যাটিং লাইন আপ এই মুহুর্তে দুনিয়ার সেরা – আর তারা যদি আপনাকে খেলতে না-পারে তাহলে বলতেই হবে আপনার মধ্যে তারকা হয়ে ওঠার মালমশলা আছে।

মুস্তাফিজের চমক, ওর ড্রামা কিন্তু এখনো ফুরোয়নি – কারণ ওর একটা দারুণ ক্রিকেটিং বোলিং মস্তিষ্ক আছে। অনেকটা আমাদের মোহাম্মদ আমেরের মতো – এই মুস্তাফিজুর, আমেরদের আসলে বেশি কিছু বলতে হয় না। ওরা ন্যাচারালি গিফ্টেড ক্রিকেটার।

মুস্তাফিজুর যেমন ধরুন এই ধোঁকাটা দারুণ দিতে পারে – ও যখন ওর নরমাল ডেলিভারিগুলো করতে করতে ওর বিখ্যাত কাটারটা করে, তখন ওর অ্যাকশনে সামান্যতম কোনো অ্যাডজাস্টমেন্ট থাকে কি না, সেটা কিন্তু ধরা খুব মুশকিল। মানে ওর স্বাভাবিক ডেলিভারির চেয়ে ওর স্লোয়ারে প্রায় কোনো পার্থক্য ধরাই যায় না।

প্রশ্ন: মানে আপনি বলছেন, দুটো ক্ষেত্রেই মুস্তাফিজুরের অ্যাকশন একেবারে একই রকম থাকে ...

রমিজ: হ্যাঁ, অ্যাকশন প্রায় একই রকম থাকে – পার্থক্যটা হয় ভীষণ সূক্ষ। আর তা ছাড়া গতির যে রকমফের হবে, সেটাও কিন্তু ভীষণ সূক্ষ হতে হবে – হঠাৎ করে বলের পেসটা বিরাট বদলে গেলে চলবে না। তাহলে ব্যাটসম্যানরা সেটা ঠিক ধরে ফেলবে। তাই আমি বলতে চাইছি, মুস্তাফিজুরের এই গোটা বিষয়টা একটা সূক্ষ শিল্পকর্মের মতো – ওর বোলিং মস্তিষ্কের প্রয়োগ, কখন স্লোয়ারটা করবো সেটা ঠিক করা - সব মিলিয়েই এই ব্যাপারটা।

আমি শুধু একটা পরামর্শই ওকে দেব – ওর সঙ্গে কিপারের সমন্বয়টা বোধহয় বাড়াতে হবে। মানে আমি কয়েকটা ক্ষেত্রে দেখেছি, ওর কাটারে ব্যাটসম্যান ‘এজ’ করেছে – কিন্তু সেটা কিপারের কাছে পৌঁছয়নি (ক্যারি করেনি) কারণ কিপার তখন স্লোয়ার ডেলিভারির জন্য প্রস্তুত ছিল না। ফলে ওদের মধ্যে বোঝাপড়াটা তৈরি করতে হবে, বেসবলে যেমন সিগনাল দেওয়ার চল আছে সেভাবে ওরা নিজেদের মধ্যে একটা সঙ্কেতও চালু করতে পারে যে পরের ডেলিভারিটা স্লোয়ার আসতে যাচ্ছে ... এই রকম কিছু আর কী! কিন্তু সব মিলিয়ে আমি বলব মুস্তাফিজুর অবশ্যই ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ, এই খেলাটার জন্য দারুণ এক উপহার।

প্রশ্ন : টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চলছে এখন – মুস্তাফিজুরের এই ডেলিভারি কি টিটোয়েন্টি ফর্ম্যাটেও সমান কার্যকরী হবে? আপনার কি ধারণা?

রমিজ রাজা: নিশ্চই। কারণ, ব্যাটসম্যানরা এখনো ওর রহস্য ভেদ করতে পারেনি – আর আমি নিশ্চিত মুস্তাফিজও নিজেকে আরো পরিণত করবে, আরো পাল্টে নেবে। আসলে কি, আপনি যখনই নতুন শেখা বন্ধ করে দেবেন, তখনই কিন্তু এই খেলাটায় আপনার শেষের দিন ঘনিয়ে আসবে। তবে আমি ওকে শুধু বলব, এই বুঝি ব্যাটসম্যান আমার বোলিংটা ধরে ফেলল - এসব নিয়ে বেশি মাথা না-ঘামিয়ে ও বরং ওর নতুন জীবনটা উপভোগটা করুক। এই যে এত কম বয়সে তারকার খ্যাতি পাচ্ছে তা নিয়ে চুটিয়ে আনন্দ করুক। আর এতদিন ধরে যে দারুণ বোলিংটা করে আসছে, সেটাই চালিয়ে যাক!

প্রশ্ন: আপনার নিশ্চয় মনে আছে, বছরকয়েক আগে শ্রীলঙ্কার অজন্তা মেন্ডিস যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এলেন, তার ‘ক্যারম বল’ নিয়েও প্রচুর হইচই হয়েছিল। সেই মেন্ডিস এখন কোথায় হারিয়ে গেছেন, কেউ খবর রাখে না..

রমিজ : হ্যাঁ, দিব্বি মনে আছে। তবে আমি কিন্তু মুস্তাফিজুরের সঙ্গে ওর ঠিক তুলনা টানতে চাইব না। বরং আমি ভীষণভাবে চাই মুস্তাফিজ নিজেকে আরো উন্নত করুক – এবং আমার বিশ্বাস ও সেটা করবেও। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য এই বয়সে ও যা অর্জন করেছে - এই মুহুর্তে ওর নিজের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি আর কীই বা চাওয়ার থাকতে পারে?

তবে কি, ওকে কিন্তু ফিট থাকতেই হবে। ওর চেহারাটা আর একটু বড়সড় হলে আমার বেশি ভাল লাগত ... কারণ একজন ফাস্ট বোলারকে অনেক ধকল সইতে হয়, অনেক চাপ নিতে হয়। ক্রাঞ্চ টাইমে বোলিং করার চাপ

শরীর থেকে অনেক কিছু নিংড়ে নেয় – ফলে ফিটনেস একশোভাগ না থাকলে খুব মুশকিল। তবে হ্যাঁ, মুস্তাফিজের আন্তর্জাতিক কেরিয়ার সবে শুরু হয়েছে, বছরখানেকও বোধহয় হয়নি – আমি নিশ্চিত ও নিজেকে আরও গড়েপিটে নেবে, ওজনও একটু বাড়াবে।

আর একটা কথা কি, এই যে আহত হয়ে মুস্তাফিজকে এখন মাঠের বাইরে থাকতে হচ্ছে – এটা কিন্তু বিরাট একটা আঘাত। এত কম বয়সে আপনি কিছুতেই আনফিট হতে চাইবেন না – আর সারা দুনিয়া যখন আপনার কাছ থেকে আর একটা দুর্ধর্ষ স্পেল দেখার ভরসায় বসে আছে তখন তো কোনো মতেই নয়! ফলে আমি চাইব বুদ্ধিমান লোকজন ওর সঙ্গে কাজ করুক – যাতে মুস্তাফিজ আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, ঠিকঠাক খাওয়াদাওয়া আর ক্যালরিটা নিতে পারে এবং সবচেয়ে বড় কথা, যাতে বাংলাদেশের হয়ে লম্বা সময় ধরে খেলে পারফর্ম করতে পারে!

প্রশ্ন: আবার মুস্তাফিজের কাটারের কথায় ফিরে আসি – আপনি যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতেন, সেই সময়কার কোনো কাছাকাছি তুলনা কি আপনার মাথায় আসছে? মানে প্রত্যেক বোলারেরই তো এক-আধটা বিশেষ বল, বা স্পেশাল ডেলিভারি থাকে ...

রমিজ: আরে, স্টিভ ওয়া-র হাতে একটা দারুণ স্লোয়ার ডেলিভারি ছিল। টোনি ডডোমেড আর একজন যে ভীষণ ভাল স্লোয়ার করত – তা ছাড়া আমি সাইমন ওডোনেলের নামও করব। এরা প্রত্যেকেই অস্ট্রেলিয়ার আর সবাই আমার সমসাময়িক – সত্যিই খুব ভাল স্লোয়ার করত ওরা।

কিন্তু তবু আমি বলব, মুস্তাফিজুর রহমান সবার চেয়ে আলাদা। ওর শতকরা আশি ভাগ ডেলিভারিই স্লোয়ার ডেলিভারি বা কাটার – তবু কেউ ওকে এখনো ধরতে পারেনি, ওর রহস্য ভেদ করতে পারেনি। আমি মনে করি এশিয়ার পিচে, রাফ সারফেসে ওকে খেলা সত্যিই কঠিন, খুব কঠিন। ওর জন্য আমার অঢেল শুভেচ্ছা রইল।

একগাল হাসি নিয়ে, ধন্যবাদ জানিয়ে অত:পর বিদায় নিলেন রমিজ – যাওয়ার আগে আরো একবার মনে করিয়ে দিতে ভুললেন না, মুস্তাফিজুর রহমানকে নিয়ে কথা বলতে তার নিজেরও ভীষণ ভাল লেগেছে! (সূত্র: বিবিসি)

 

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/আইএম

 

 

উপরে