আপডেট : ১২ মার্চ, ২০১৬ ১৫:৪৬

সন্দেহজনক আইসিসির আচরণ!

স্পোর্টস ডেস্ক
সন্দেহজনক আইসিসির আচরণ!

তিনটি শব্দ কাঁপিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট অঙ্গন—‘সন্দেহজনক বোলিং অ্যাকশন’। নেদারল্যান্ড ম্যাচের জয় দিয়ে বিশ্বকাপের শুভসূচনা হয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু ম্যাচের পরেই দলের সঙ্গী হলো অস্বস্তি, তাসকিন আহমেদ ও আরাফাত সানির বোলিংকে সন্দেহের চোখে দেখছেন আম্পায়াররা!

সারা বছরই ক্রিকেট হচ্ছে। কেউ হাত বাঁকা করে, কেউ হাত সোজা করে বল করছেন। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল-আইসিসি’র চোখে পড়ছে না। সারা বছর তারা যেন ঘুমিয়েই কাটিয়ে দেয়। একটা বিশ্বকাপ সামনে এলেই তাদের সেই ঘুম ভাঙে।

আর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় বোলারকে ‘সন্দেহজনক’ বলে ঘোষণা করেন তাদের আম্পায়াররা। এতে ওই বোলার সত্যি সত্যি অবৈধ বোলিং করুন আর নাই করুন; বিশ্বকাপটিতে তার পারফরম্যান্স পড়ে যায় সংশয়ের মুখে।

এবার এই ধারাবাহিকতার শিকার হলেন বাংলাদেশের তাসকিন আহমেদ ও আরাফাত সানি। আইসিসির এই আচরণকে ‘সন্দেহজনক’ না বলাটাই বিস্ময়কর।

যদিও মুখ ফুটে দায়িত্বশীল কেউ এতদিন কথাটা বলছিলেন না। শাস্তির ভয় না পেয়ে, তথাকথিত নিয়মের ধার না ধেরে এবার বাংলাদেশের কোচ হাতুরুসিংহেই কথাটা বলে ফেললেন, ‘তাদের যদি আমার বোলারদের নিয়ে সন্দেহ থাকে, আমারও তাদের (আইসিসির) অ্যাকশন নিয়ে সন্দেহ আছে।’

আইসিসির কার্যক্রম নিয়ে সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স। গত বছর দেড়েক ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেটে নতুন এক পরাশক্তি হয়ে উঠেছে। ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে সিরিজ হারানো বা এশিয়া কাপের ফাইনালে চলে আসার মতো ঘটনায় বদলে গেছে খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষা। সেই সাথে খেলোয়াড়দের এই পারফরম্যান্সেই বদলে যাচ্ছে বাণিজ্যেরও অনেক সমীকরণ। বাংলাদেশ শুধু ক্রিকেটে নয়, নিজেদের শক্তিতে এক ঈর্ষণীয় ক্রিকেট বাজারে পরিণত হয়েছে।

আইসিসির বিরুদ্ধে এই সন্দেহ একেবারে ঝড়ের আকার ধারণ করেছিল ২০১৫ আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে আগে। বিশ্বকাপকে সামনে রেখে পাকিস্তানের সাঈদ আজমল, বাংলাদেশের সোহাগ গাজী, শ্রীলঙ্কার সচিত্র সেনানায়েকে, নিউজিল্যান্ডের কেন উইলিয়ামসনের নিষিদ্ধ হওয়া এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের সুনীল নারিন ও পাকিস্তানের মোহাম্মদ হাফিজের বোলিং অ্যাকশন সন্দেহজনক বলে বিবেচিত হওয়ায় শুরু হয় ঝড়। অনেকের অভিযোগ, কোনো একটা ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এটা করা হয়েছে।

প্রথমত এই বোলাররা দীর্ঘদিন ধরে বল করলেও এমন সব সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে কোনো না কোনো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের আগে আগে; যাতে ওই বোলারের সংশ্লিষ্ট বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা কমে যায়। মজার ব্যাপার হলো, যেসব বোলারকে সন্দেহ করা হচ্ছে, তারা অনেকেই বৈধ বলে পরে স্বীকৃতিও পাচ্ছেন; কিন্তু বিশ্বকাপ মিস করছেন।

এছাড়া আইসিসির ‘বিগ থ্রি’ নামে পরিচিত তিনটি দেশ—ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের কোনো উল্লেখযোগ্য বোলার কখনোই পরীক্ষার জন্য সন্দেহের তালিকায় আসছেন না। ফলে মাঠের বাইরে খেলা হচ্ছে, এমন সন্দেহও তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি বোলিং অ্যাকশন নিয়ে আইসিসির ‘অবৈজ্ঞানিক’ অবস্থান নিয়েও আছে বিপুল অভিযোগ।

আইসিসির বিপক্ষে অভিযোগকে আরো উস্কে দেয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২০ বছর ধরে আইসিসির বোলিং অ্যাকশন বিষয়ক ব্যাপারাদি দেখভাল করা প্রতিষ্ঠান ইউডব্লিউএ। এই প্রতিষ্ঠানের একাধিক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, আইসিসি বর্তমানে যে পদ্ধতিতে ও যে রকম অস্বচ্ছতার সঙ্গে বিভিন্ন পরীক্ষাগারে পরীক্ষাগুলো করছে তা হাস্যকর, সন্দেহজনক ও ত্রুটিপূর্ণ!

এ নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বেশ কিছুদিন ধরেই আইসিসির টানাপড়েন চলছিল। তারই চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে গত বছরের মার্চে। যখন ইউডব্লিউএ দাবি করে যে তারা আইসিসির পাশ থেকে সরে যাচ্ছে। এই টানাপড়েনের এক পর্যায়ে পরস্পরের বিপক্ষে আইনজীবী নিয়োগের মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়েছিল।

এরপর থেকে আইসিসি বোলিং অ্যাকশন পরীক্ষার দায়িত্ব দেয় কার্ডিফ, ব্রিসবেন ও চেন্নাইয়ের তিনটি ল্যাবরেটরিকে। ইউডব্লিউএ দাবি করেছে, এই তিনটি পরীক্ষাগারে তাদের পুরানো পদ্ধতি নিয়ে যেভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে, তাতে কিছুতেই সঠিক ফলাফল পাওয়া সম্ভব না।

ইউডব্লিউএ মূলত চারটি পয়েন্টে আইসিসির বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক সমালোচনা করেছে—১. বল ছাড়ার মুহূর্তটি বর্তমানে ভুলভাবে নির্ধারণ করা হচ্ছে; যার ফলে স্পিনারদের ফলাফল আমুল বদলে যাচ্ছে, ২. অ্যাকশন পরীক্ষার মার্কার ভুল জায়গায় লাগানো হচ্ছে, ৩. কনুইয়ের বাঁকা হওয়া ও সোজা হওয়া দুটোরই ভূমিকা বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না এবং ৪. ত্রিমাত্রিকের বদলে এখনও দ্বিমাত্রিক ফুটেজ ও ছবিই ব্যবহার করা হচ্ছে।

পাশাপাশি ইউডব্লিউএ-এর গবেষকরা দাবি করছেন, নতুন এই পরীক্ষাগারগুলোতে অনভিজ্ঞ ও স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী দ্বারা যেসব পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে, তাতে ভুল থেকে যাওয়ার আশঙ্কাই প্রবল। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় ও বোর্ডকে যে অল্প সংখ্যক ফুটেজ ও ছবি সরবরাহ করা হচ্ছে, তাতে কিছুতেই স্বচ্ছতা প্রকাশ পাচ্ছে না বলে গবেষকদের ধারণা।

ইউডব্লিউএ-এর এই দাবির পর অবশ্য নিজেদের ওয়েবসাইটে দেয়া এক বিবৃতিতে বোলিং অ্যাকশন পরীক্ষার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে আইসিসি দাবি করেছে, তারা কোনো বোলারকে আঞ্চলিকতার কারণে লক্ষ্যে পরিণত করছে না। একই সঙ্গে যে তিনটি পরীক্ষাগারে বর্তমানে পরীক্ষা চলছে তাদের যথেষ্ট যোগ্য বলে দাবি করেছে আইসিসি।

তবে বিশ্বের অনেক শীর্ষস্থানীয় বোলারদের বিরুদ্ধে ‘অবৈধ অ্যাকশনে’র খড়গ চাপিয়ে ক্যারিয়ার শেষ করে দেয়া হলেও আইসিসির ‘বিগ থ্রির’ কোনো বোলারকে নিষিদ্ধ হতে হয়নি। বিশেষ করে ভারতের বর্তমান দলেরও ২-৩ জন বোলার প্রশ্নবিদ্ধ বোলিং অ্যাকশন নিয়েও স্বদর্পে বল করে যাচ্ছেন। কিন্তু ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি ‘বিষ্ময়করভাবে’ তাদের ব্যাপারে নীরব।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/এসএম

উপরে