আপডেট : ৬ মার্চ, ২০১৬ ১৬:০৫

বাংলাদেশের উত্থানকে ভয় পাচ্ছেন ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিকরা

স্পোর্টস ডেস্ক
বাংলাদেশের উত্থানকে ভয় পাচ্ছেন ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিকরা

সন্ধ্যায় শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ ভারত ফাইনাল যুদ্ধ। আজকের এই ফাইনাল নিয়ে কী ভাবছেন ভারতীয় ক্রিকেট সাংবাদিকরা? ‘এইসময়’ এ প্রকাশিত রণদেব বসুর লেখাটি বিডিটাইমস পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো……

প্রথমে একটা কথা পরিষ্কার করে দিতে চাই, এশিয়া কাপের ফাইনালে ফেভারিট ভারতই৷ সব বিভাগেই ধোনির টিম এগিয়ে৷ একশো বারে একশো বার বাজি ধরতে বললে ভারতের উপর ধরব৷ তবু এই লেখাটা লিখতে বসেছি দুটো কারণে৷ এক, খেলাটা চূড়ান্ত অশ্চিয়তার৷ দুই, দিনকে দিন বাংলাদেশের অবিশ্বাস্য উত্থান৷
বাংলাদেশ ক্রিকেটের জুনিয়র টিমের বোলিং কোচ হিসেবে কাজ করার জন্য চোখের সামনে দেখেছি, দেশটা ক্রিকেটে কী ভাবে এগোচ্ছে৷ ওয়ান ডে-তে অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশ চমকে দেওয়া একটা টিম৷ কিন্তু টি-টোয়েন্টিতে সে ভাবে খাপ খুলতে পারছিল না৷ সেই ধারনা মাশরাফি অ্যান্ড কোম্পানি ভেঙে দিল এবারের এশিয়া কাপে৷

রবিবার ফাইনালে যাই হোক, বাংলাদেশ যে টি-টোয়েন্টি স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে, না বললে মিথ্যে বলা হবে৷ পরপর শ্রীলঙ্কা আর পাকিস্তানকে হারানো আর যাই হোক, ফ্লুক হতে পারে না৷
আমরা ক্রিকেটে বলে থাকি ম্যাচ জেতার মানসিকতাই আসল৷ মানে যারা বিগ টিম, তারা যে কোনও পরিস্থিতিতে ম্যাচ বের করে নিতে জানে৷ ম্যাচ জেতা একটা আর্ট৷ এতদিন বাংলাদেশ সব করত৷ ওদের ট্যালেন্ট ছিল৷ শুধু বড় ম্যাচ জিততে পারত না৷
টি-টোয়েন্টিতে এই সাবলীল হয়ে ওঠা কোনও ম্যাজিক নয়৷ ওখানে থাকতেই দেখেছি, ওদের দেশের ক্রিকেটের ভিত আমাদের মতো ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট নির্ভর নয়৷ বরং বাংলাদেশে ক্লাব ক্রিকেট খুব শক্তিশালী৷ ওই ক্লাব ক্রিকেটে আবার শর্টার ফর্ম্যাট খুব জনপ্রিয়৷ সুযোগ থাকলে সব নামী ক্রিকেটার ওখানে খেলে৷ খেলে বেশ কিছু নামী বিদেশি ক্রিকেটারও৷ নতুনরাও উঠে আসছে এই সিস্টেম থেকে৷ তাই টি-টোয়েন্টি নিয়ে কারও মধ্যে কোনও হীনমন্যতা নেই৷
দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় কারণ অবশ্যই বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ বা বিপিএল৷ ক্রিস গেইল থেকে শাহিদ আফ্রিদি, এখানে বিশ্বের বেশির ভাগ টি-টোয়েন্টি তারকারা খেলে৷ ওদের সঙ্গে ড্রেসিংরুম শেয়ার করার সুফলের সঙ্গে এই সব ওয়ার্ল্ড ক্লাস ক্রিকেটারদের সঙ্গে মাঠে আমনে-সামনে টক্কর দেয় বাংলাদেশিরা৷ ফলে ভীতিটা চলে গিয়েছে৷ সে জন্য সাব্বির রহমান যেমন আমেরকে স্টেপ আউট করতে ভয় পায় না, তেমন আরাফত সানির মতো তরুণ স্পিনারও বিরাটের মোকাবিলায় তৈরি৷
কাজ করার সূত্রে বাংলাদেশের বেশ কয়েক জনের সঙ্গে আমার রীতিমতো বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছে৷ তাদের এক জন ফোনে বলছিল, তোমরাই ফেভারিট৷ ওদের বলিনি, কিন্তু এখানে বলছি, ফাইনালে অঘটন ঘটানোর পুরো ক্ষমতা রয়েছে বাংলাদেশের৷
বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড বা তারপর নিজেদের দেশে ভারতকে ওয়ান ডে সিরিজে হারানোর কথা কে ভেবেছিলেন? অতীতেও বেশ কিছু অঘটন ঘটিয়েছে এই দেশ৷ তাই কোনও মতেই হাল্কা ভাবে নেওয়া যাবে না ওদের৷ ক্রিকেট ইতিহাস কিন্তু অঘটন প্রচুর দেখেছে৷
তা ছাড়া বাংলাদেশের এই টিম অভিজ্ঞতায় কারও থেকে পিছিয়ে নেই৷ সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞতা অবশ্যই মাশরাফি আর সাকিবের৷ কিন্তু তামিম, মুশফিকুরদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা হেলাফেলা করার মতো নয়৷ তবে টিমের রিমোট মাশরাফির হাতে৷ ওর ক্যাপ্টেন্সি সাফল্যের বড় কারণ৷
মুস্তাফিজুরের পরিণত হয়ে ওঠা দেখেছি বলে জানি, ও কী কোয়ালিটির বোলার! তাই মুস্তাফিজুরের না থাকা বাংলাদেশের বড় ক্ষতি৷ তবে অপূরণীয় ক্ষতি নয়৷ কারণ আল আমিন এবং তাসকিন রয়েছে৷ এমনিতে শের-ই-বাংলার উইকেট পেসারদের সাহায্য করছে৷ ভারত আগে ব্যাট করলে এই দুই পেসারকে নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে৷ রোহিত, বিরাট, ধাওয়ানদের নিয়ে তৈরি ভারতের ব্যাটিং লাইন আপকে মাথায় রেখেই বলছি, যে কোনও টিমের ব্যাটিং বিপর্যয় ঘটানোর ক্ষমতা আছে তাসকিন, আল আমিনদের৷
এটাও বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটা পজিটিভ দিক৷ কাউকে হারিয়ে যেতে দেয় না৷ কেউ চোট পেলে বা অফ ফর্মে থেকে টিমের বাইরে গেলে, তাঁকে ফেরানোর নির্দিষ্ট প্রসেস রয়েছে৷ বিশ্বকাপের সময় শৃঙ্খলাজনিত কারণে বাদ পড়েছিল আল আমিন৷ দেখুন, আবার ফিরে এসেছে৷ এটাই প্রসেসের অঙ্গ৷ ওদের অ্যাকাডেমি রয়েছে৷ জাতীয় টিমের বাইরে থাকা ক্রিকেটারদের নার্চার করে কী ভাবে ফিরিয়ে আনতে হয়, সেটা ওরা জানে৷ সেই পরিকাঠামো ওদের আছে৷
অস্ট্রেলিয়া এমনকী ভারতের মতো দেশে এই পরিকাঠামো রয়েছে৷ কিন্ত্ত বাংলাদেশ শেষ কয়েক বছরের মধ্যে ক্রিকেটে যে পেশাদারিত্বে ঢেলে সাজিয়েছে, তার জন্য হ্যাটস অফ৷ সেই সঙ্গে আলাদা করে বলব, কোচ হাতুরাসিংহে, বোলিং কোচ হিথ স্ট্রিক-সহ কোচিং স্টাফদের কথা৷ ক্রিকেটারদের থেকে সেরাটা বের করে আনছে ওরা৷ এটাই তো কোচেদের কাজ৷
খেয়াল করে দেখুন বাংলাদেশ টিমটাকে৷ ব্যাটিং, বোলিং প্রত্যেকটা বিভাগে আলাদা করে ভালো ক্রিকেটার রয়েছে৷ যারা ম্যাচ উইনারও বটে৷ এতেই শেষ নয়৷ বাংলাদেশ একটা দুর্দান্ত ফিল্ডিং সাইড৷ সৌম্য সরকার, তাসকিন, সাব্বিরের মতো তরুণরা জান লড়িয়ে ফিল্ডিং করছে৷
শেষ করব, বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের আবেগের কথা বলে৷ জানি, আমার কোনও বাংলাদেশি বন্ধু হলে বলত, এটাই তো আসল৷ আবেগের সঙ্গে মিশেছে ক্রিকেট প্রতিভা আর পেশাদারিত্ব৷ তাই বাংলাদেশকে ছোট দল ভাবার কোনও কারণ নেই৷

সত্যি বলতে, একটা ভালো ফাইনাল দেখার অপেক্ষায় বসে আছি৷

উপরে