আপডেট : ৬ মার্চ, ২০১৬ ০৯:০৩

স্বপ্ন ছোঁয়ার অপেক্ষা

বিডিটাইমস ডেস্ক
স্বপ্ন ছোঁয়ার অপেক্ষা

আবেগের প্রচণ্ড সুনামির নিশ্চিত পূর্বাভাসে ভুল হওয়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই। অথচ সে ম্যাচের মাত্র ৩০ ঘণ্টা আগেই কিনা নেট থেকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন সাকিব আল হাসান। দৃশ্যটা ২০১২ এশিয়া কাপ ফাইনালের শেষ দুটি বল ‘ডট’ হতে দেখার মতো হৃদয়বিদারক! সেবার তবু শেষ বল পর্যন্ত ৩ রানের আশায় বুক বেঁধেছিল ১ কোটি। কিন্তু এ তো প্রথম বল হওয়ার আগেই দুমড়েমুচড়ে যাওয়া! অবশ্য অনেকক্ষণ অপেক্ষায় রেখে মৃদুভাষী ফিজিও জানিয়ে গেলেন, ‘সাকিব সেরে উঠবেন।’ দেশীয় মিডিয়াও তাৎক্ষণিক আবার গা ঝাড়া দিয়ে বুম হাতে লাইভে, ‘সাকিবের চোট গুরুতর নয়, তিনি খেলছেন।’ চট করে আবারও একই সমতায় শিরোপা সম্ভাবনা, সে যতই দুদল র্যাংকিংয়ের ১ আর ১০ নম্বর হোক না কেন। প্রচণ্ড আবেগ কি আর যুক্তি-তর্ক মানে!

অদ্ভুত একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ-ভারত আজকের ফাইনালকে ঘিরে। অবশ্য আগেই ফাইনালের দুই প্রতিপক্ষ নির্ধারিত হয়ে যাওয়ায় গত তিন দিন ধরেই এ পরিস্থিতি বহাল আছে। প্রত্যাশিতভাবেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে পরিস্থিতি ক্রমাগত উন্মাতাল হয়েছে, আবেগের ঢেউগুলো বড় হয়েছে আরো। সেসব দেখতে দেখতে আজ টসের পর কী হবে, ভাবতে গিয়ে পেশাদারি মনও চমকে চমকে উঠছে। আল-আমিন কিংবা তাসকিন আহমেদ নির্দ্বিধায় বলে দিচ্ছেন, ‘এমন অবস্থা আগে কখনো দেখিনি।’

টি-টোয়েন্টি ম্যাচটা ঘণ্টা তিনেকের। প্র্যাকটিস আর টিম মিটিং জুড়ে দিলে মাশরাফিদের ক্রিকেটীয় ব্যস্ততা বড়জোর ঘণ্টা পাঁচেকের। তাই খণ্ড খণ্ড আড্ডা তো হয়ই। সেসব আড্ডার সূত্রে জানা গেছে দেশের প্রধান ব্যক্তি থেকে শুরু করে চূড়ান্ত অধস্তনদেরও সমান আবেগের এক জোড়া কারণ বের করেছেন জাতীয় দলের সিনিয়র ব্রিগেড। এক. অনভ্যস্ত টি-টোয়েন্টিতেও দলের এমন নৈপুণ্যে বিমোহিত মানুষ এখন আরো বেশি ক্রিকেটমুখী হয়েছে। দুই. এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বটা অন্তত দ্বিতীয়বার হাতছাড়া হতে দেখতে চাচ্ছেন না কেউ। তাই বলে প্রত্যাশার ভারী বোঝা ক্রিকেটারদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন না কেউই। সমর্থনের এই বাঁক বদলটা সাধুবাদ পাওয়ারই যোগ্য। গত কিছুদিন ধরে হোটেল-মাঠ করে করে মাশরাফিরাও দেখেছেন যে, ট্রফির জন্য কেউ শপথ করাচ্ছেন না। এমনকি মিডিয়ার তরফ থেকেও প্রশ্নটা এমনভাবে করা হলো যেন চাপ ভুলে নির্ভার হয়ে খেলতে পারেন মাশরাফিরা, ‘আপনার কি মনে হয়  কাপ জিততে না পারলে বড় ক্ষতি হবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের?’ বরাবর স্টেটসম্যানসুলভ উত্তর দিয়ে অভ্যস্ত বাংলাদেশ অধিনায়কের প্রশ্নটাকে মৌন সমর্থনের সমাদরই দিয়েছেন, ‘কাল হারলেই বাংলাদেশের  ক্রিকেট থেমে পড়বে বলে মনে করি না।’ বরাবর অন্দরমহলে বইতে থাকা চাপের স্রোত মাটি খুঁড়ে বের করে আনা মিডিয়ার এ বিবর্তনও তো অভাবিতই।

অদ্ভুত কিন্তু সতর্কভাবে শিরোপাজ্বরে আক্রান্ত বাংলাদেশ দলও। নিজেদের সেরাটা খেলতে পারলে যেকোনো দলকেই হারানোর ক্ষমতা আমাদের আছে—দীর্ঘদিন সরকারিভাবে জাতীয় দল থেকে বলে আসা এ উক্তিটা এমন হাইভোল্টেজ ফাইনালের সঙ্গে যায় না। বরং দলের ভেতরে ছড়িয়ে পড়া ‘এবার ভারতকে ধরব’ ঝাঁঝটাই চাটনির স্বাদ দেয়। মুশফিকুর রহিমকে এক ধাপ নিচে নামিয়ে সাকিব আল হাসানকে চার নম্বরে খেলানোর পেছনেও উদ্দেশ্য একটাই—সাকিব যেন কিছু বেশি বল খেলতে পারেন। সাকিবের ইনিংসের আয়ুর সঙ্গে তো জয়ের সম্ভাবনাও বাড়ে।

ভারতকে ধরার ছকটাও তো কম অদ্ভুতুরে নয়—সবুজ উইকেটে ভারতকে ফেলে গতির ঝড়ে উড়িয়ে দাও। ভারত উড়লে বাংলাদেশেরও উড়ে যাওয়ার কথা। সেটা বাংলাদেশ দলও জানে। জানে বলেই উড়িয়ে দেওয়ার রেসিপিতে কিছুটা নতুনত্ব এনেছেন কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে। সেটা এরকম—প্রথম ৬ ওভারে আক্রমণ করো, মাঝের ওভারগুলোতে শান্তির পতাকা উড়িয়ে ডেথ ওভারে ওয়াইড ইয়র্কারে ‘টাইট’ দাও ভারতকে। মুস্তাফিজুর রহমানের ‘কাটার’ নয়, তাসকিনের মাঝে প্রায় সমান কার্যকারিতা দেখছে টিম বাংলাদেশ। আর শুরুর আক্রমণ এবং ইনিংসের শেষভাগে রান আটকানোর বোলিংয়ের ছক ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে আল-আমিনকে। মাশরাফির তো এখন মধুচন্দ্রিমা চলছে, তাই তাঁকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা নেই। আর ভারতীয় দলে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের সংখ্যাধিক্য আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ফিরিয়ে আনছে আবু হায়দার রনিকে। বিপিএলের সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ডেথ ওভারে ভালো বোলিং করেন—এই যুক্তিতে ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেই এশিয়া কাপ অভিষেক হচ্ছে বাঁহাতি এ পেসারের। ভাবছেন কি দরকার ছিল এমন চাপের মুখে ছেলেটাকে ঠেলে দেওয়া? কিন্তু যুক্তি আবার সায় দিচ্ছে আবু হায়দারের অন্তর্ভুক্তির পক্ষেই। আজকের বাংলাদেশ একাদশে সম্ভাব্য দ্বিতীয় পরিবর্তনটি মোহাম্মদ মিথুনের জায়গায় নুরুল হাসানের অন্তর্ভুক্তি।

ভারতীয় একাদশে পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা আপাতত নেই। সেই টুর্নামেন্ট শুরুর একাদশ নিয়ে নামার কথা টি-টোয়েন্টিতে ফর্মের তুঙ্গে থাকা মহেন্দ্র সিং ধোনির দলের। লক্ষ্যেও কোনো পরিবর্তন ঘটেনি ভারতের। রবি শাস্ত্রী তো বলেও গেছেন, ‘এটা আমাদের কাছে আর দশটা ম্যাচের মতোই একটা ম্যাচ।’ হাইপ্রোফাইল ব্যাটিং অর্ডার আর কার্যকর বোলিং আক্রমণে এ টুর্নামেন্টে শতভাগ সাফল্য নিয়ে ফাইনালে ওঠা ভারতের সাম্প্রতিক অতীতও সাফল্যের পালকে মোড়ানো। তাই অবধারিতভাবে এ ম্যাচে ভারতই ফেভারিট।

তবে মাশরাফি বিন মর্তুজার চোখ শিরোপাতেই, ‘এটা আরেকটা ম্যাচ মনে করেই খেলব। তবে ফাইনাল যেহেতু, অন্য রকম একটা ফ্লেভার তো থাকবেই। তবে আমাদের চেষ্টা থাকবে নিজেদের সেরাটা যেন খেলতে পারি। আগের তিনটি ম্যাচ যেভাবে খেলেছি, সেটা যেন অব্যাহত রাখতে পারি।’ মাশরাফির সেই ‘আগের তিনটি ম্যাচ’ জিতেছে বাংলাদেশই। তাহলে সব মিলে গেলে চতুর্থ ম্যাচেও জয় নয় কেন?

এ প্রশ্নেই লুকিয়ে হাজার ভোল্টের রোমাঞ্চ, কোটি হৃদয়ের আবেগ। আবেগের সুনামি কতটা উন্মাতাল হতে পারে অনুমান করতে আজ টিভিতে চোখ রাখুন। ব্যাট-বলের লড়াই কতটা সংহারী হতে পারে দেখতে আজ টিভিতে চোখ রাখুন। দুই মহানায়কের কোন জনের মাথায় সাফল্যের মুকুট ওঠে—তা জানতেও টিভিতেই চোখ রাখুন। ১১০০ ভোল্টের এশিয়া কাপ ফাইনাল চাক্ষুষ করবেন গ্যালারির হাজার পঁচিশেক দর্শক, সে দলে তো আর ঠাঁই হওয়ার উপায় নেই দুই বাংলার ২৫ কোটিরও বেশি মানুষের। পূর্ব-পশ্চিম মিলিয়ে আদমশুমারি করলে সংখ্যাটা এমনই দাঁড়ানোর কথা।

নামটা এশিয়া কাপ। কিন্তু টুর্নামেন্ট যতই এগিয়েছে, ততই কাপটার গায়ে লেগে গেছে বাঙালিয়ানা। মহেন্দ্র সিং ধোনি বৈবাহিক সূত্রে কলকাতার জামাই, তাই তাঁর জন্য পশ্চিমবঙ্গের আবেগ আছে। অন্যদিকে মাশরাফি বিন মর্তুজা দীর্ঘদিন ধরেই পাশের বাড়ির ছেলেটি, এবারের এশিয়া কাপ উপলক্ষে প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গেরও প্রিয় তিনি।

প্রকাশ্য বিরোধিতা থাকলেও ধোনির সততার প্রশংসা করেন তাঁর প্রবল সমালোচকও। মাশরাফির প্রকাশ্য সমালোচক অবশ্য বাংলাদেশে আপাতত নেই। সম্প্রতি তাঁর ভক্তকুলে নাম লিখিয়েছেন এশিয়া কাপের জন্য আগত ভারতীয় সংবাদকর্মীরাও। সে ভক্তি এমনই উচ্চগ্রামের যে, ধোনির বদলে মাশরাফির হাতে শিরোপা উঠতে দেখলে বেজার হবেন না তাঁদের কেউই, বরং খুশিই হবেন অনেকে!

শিরোপা লড়াইয়ের কোন ম্যাচ এমন অদ্ভুত আবহে শুরু হয়েছে? সূত্র-কালের কণ্ঠ

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

 

উপরে