আপডেট : ৫ মার্চ, ২০১৬ ১৬:০৪

মাশরাফিকে নিয়ে ডেভ হোয়াটমোরের অশ্রুসিক্ত বক্তব্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
মাশরাফিকে নিয়ে ডেভ হোয়াটমোরের অশ্রুসিক্ত বক্তব্য

ডেভ হোয়াটমোর বলেছিলেন, ‘মাশরাফির সাথে কোনো খেলোয়াড়ের তুলনা চলে না। যদি নিতান্তই তুলনায় যেতে হয় তবে তার তুলনা হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বী সে নিজেই।’ কারন :

এখনো প্রতিনিয়ত লড়ে যাচ্ছেন তিনি। একমাত্র ক্রিকেটার যিনি প্রতি ম্যাচ শেষে হাঁটুতে জমে যাওয়া নিঃসৃত বর্জ্য নিজ হাতে সিরিঞ্জ দিয়ে টেনে বের করে আনেন অসহ্য বেদনা সহ্য করে। হয়তো তিনিই একমাত্র ক্রিকেটের যার প্রতিদিন ঘুম ভাঙ্গার পর ১০/১৫ মিনিটের মতো সময় লেগে যায় হাঁটু ভাঁজ করে বিছানা থেকে নামতে। শুধু ক্রিকেটারই নন, তিনিই একমাত্র দেশপ্রেমিক যে ইঞ্জুরি বিধ্বস্ত শরীর নিয়েও মাঠে বোলিংয়ের কষ্টকে ভুলতে নিজেকে সান্ত্বনা দেয় এই বলে- মুক্তিযোদ্ধারা পায়ে গুলি লাগার পরও মরার আগ পর্যন্ত দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে যেতে পারলে আমি কেন সামান্য অপারশনের ব্যথা আর ঝুঁকি নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জয়ের জন্য খেলতে পারব না?

নিউজিল্যান্ডের গতিদানব ‘শেন বন্ড’ দুইবার সার্জারির পর পরই ভয়ে ক্রিকেট ছেড়ে দেন। বিশ্ব বিখ্যাত ইংলিশ অলরাউন্ডার ‘এন্ড্রু ফ্লিন্টপ’ মাত্র একটি সার্জারির কারণেই ক্রিকেটকে ‘গুড বাই’ বলে দিতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি। বিশ্বের কোনো ফার্স্ট বোলারই অতিরিক্ত রিস্কি সার্জারি দুইবারের বেশি করিয়ে আর খেলতে পারেননি। বলা চলে, খেলার রিস্ক নেননি নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। কিন্তু একমাত্র ক্রিকেটার যিনি পর পর সাতটি মারাত্মক সার্জারি করার পরও এখনো ক্রিকেট চালিয়ে যাচ্ছেন। হ্যাঁ, ম্যাশ- আমাদের মাশরাফি। যিনি এই অসাধ্য সাধন করে এখনো হিংস্র বাঘের মতো বোলিং করে যাচ্ছেন নিজের দেশপ্রেমের টানে।

ওজন বেড়ে যাচ্ছে; দেশের হয়ে আর মাঠে নামতে পারবেন না এই ভয়ে মাত্র এক মাসে ১২ কেজি ওজন কমিয়ে হতবাক করে দিয়েছিলেন তখনকার বিসিবির ফিজিও, ট্রেনারদের। বেশ কিছুদিন আগে শেষ সফল অস্ত্রোপচারের পর ফিজিও এবং ডক্টরের পরামর্শ ছিল খেলা ছেড়ে দেওয়ার এখনই মোক্ষম সময়- এরপরে আবার ইঞ্জুরিতে পড়ে পুরোনো আর্মেষ্ট্রিং এর ক্ষত বাড়লে বা লিগ্যামেন্ট পুনরায় ছিঁড়ে গেলে আর জোড়া লাগানো সম্ভব নয়। কারণ, মাশরাফির শরীরে অন্য কোথাও আর লিগ্যামেন্ট অবশিষ্ট নেই যেখান থেকে নিয়ে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে অস্ত্রোপচার সফল করা সম্ভব, পঙ্গু হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা তাই ৯৮ শতাংশেরও বেশি। এমন রিস্ক থাকা শর্তেও একমাত্র সাহসী মানব যে জীবনের বাজি ধরে প্রতিদিন দেশের হয়ে খেলতে নামতে পারাকে মানে জীবনের ধ্যানজ্ঞান হিসেবে।

দেখানো দেশপ্রেমতো অনেক দেখেছি। তবে দেশপ্রেম কী, তা বোধহয় বুঝেছি যেদিন মাশরাফির একমাত্র আদরের ৫ মাস বয়সী ছেলেকে এপ্যোলো হাসপাতালে টাইফয়েডের সঙ্গে মূত্রাশয়ের সংক্রামন রোগে জরুরী অবস্থায় অপারেশনের টেবিলে নিয়ে যাওয়া হয়, তার কিছুক্ষণ পরই বাংলাদেশের হয়ে মাঠে নামে আমাদের ম্যাশ। বিসিবি তাকে পরিবারে কাছে থাকতে সেদিনের ম্যাচ থেকে নৈতিক ছুটি গ্রহণ করে দেশে ফিরে আসতে বললে ম্যাশ বলেছিল, ‘আমি নামাজ পড়ে তার জন্য দোয়া চেয়েছি রাব্বুল আলামিনের কাছে। বাকিটা এখন তাঁর হাতে। এই মুহূর্তে আমার দায়িত্ব দেশের জন্য লড়াই করা।’

তিনি কেবল একজন বাংলাদেশ জাতীয় দলের অধিনায়ক কিংবা সিনিয়র প্লেয়ার নন, তিনি একজন জীবন্ত কিংবদন্তী যে বিসিবির দেওয়া গাড়ি থাকা সত্ত্বেও এখনো বাসা থেকে অনুশীলনের জন্য ক্যাম্পে যেতে ভালোবাসেন রিক্সায় চড়ে। নড়াইল এক্সপ্রেস খ্যাত এই মানুষটি এখনো গ্রামে গেলে গ্রামের কিশোরদের সাথে ক্রিকেট খেলায় মেতে উঠে শিশুর মতো। খুব সাদাসিধে জীবন যাপন করা এই অসাধারণ মানুষটি সম্পর্কে জানলেই কেবল বুঝা যাবে দেশ কী? দেশের প্রতি মায়া কী জিনিস? কীভাবে দেশকে ভালোবাসতে হয় কিংবা কেন জীবন থেকে দেশ বড়?

দেশপ্রেমিক হতে হয় না দেশকে ভালোবাসতে। একজন মাশরাফি হলেই দেশপ্রেমিক হওয়া যায়। আসুন, মাশরাফি দ্যা ওয়ান ম্যান আর্মি ‘ম্যাশ’ সম্পর্কে জানি, দেশকে ভালোবাসতে শিখি। ম্যাশের জীবন কাহিনী সংবলিত দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের লেখা প্রায় পাঁচশ পাতার ‘মাশরাফি’ বইটি যেখানেই পাবেন সংগ্রহে নিতে ভুল করবেন না। এটা শুধুই একটা বই নয় একটা জীবন বদলে দেয়া জিয়ন কাঠি হতে পারে আপনার জীবনে। উদ্দীপনায় অনন্য ম্যাশ, ভালোবাসার মাশরাফি দীর্ঘজীবী হও দেশের প্রয়োজনে। বাঙ্গালী তোমায় ভালোবাসে, তুমিই বাংলার গর্ব। আমাদের পাগলা।

বিন্দুমাত্র ভুল বলেননি ডেভ হোয়াটমোর। কেন? এতক্ষণ মাশরাফির সম্পর্কে পড়ে এই প্রশ্নের উত্তরটা নিশ্চয়ই পেয়ে গেছেন।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/এসএম

উপরে