আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৫ ১৬:১৭

সাফল্যে মোড়ানো বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটি বছর

এস আর সুলতানা, বিডিটাইমস৩৬৫ ডটকম
সাফল্যে মোড়ানো বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটি বছর

দুর্দান্ত একটি বছর পাড়ি দিলো বাংলাদেশের ক্রিকেট। যেখানে ব্যক্তিগত সাফল্যেকে ছাপিয়েছে দলগত নৈপুণ্য।

ক্রিকেট বিশ্বকে এখন তাক লাগিয়ে বাংলার দামাল ছেলেরা। মাঠে যেমন পারফরমেন্স দিয়ে বিশ্বের কাছে নিজেদের প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ, ঠিক তেমনি আবার ব্যক্তিগত কারণে হয়েছে নিন্দুকের কথার বুলি।

২০১৫ সাল- বাংলাদেশের ক্রিকেটের আকাশে রৌদ্রজ্জল একটি বছর। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৯ সালটিও প্রায় এমনই কেটেছিলো বাংলাদেশের।

টেস্ট আঙিনায় বাংলাদেশ পা রেখেছে ১৫ বছর হলো। ওয়ানডেতে পথচলা ৩০ বছরের। আর ১০ বছরের টি-টোয়েন্টির ক্যারিয়ার। এই হচ্ছে বাংলাদেশ। তারপরও সবকিছুকে ছাপিয়ে এ বছরটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বছরের শুরুতে বিশ্বকাপের আসরে বাংলাদেশকে দেখলে আশ্চর্যই হতে হয়। অচেনা উইকেট, অজানা কন্ডিশনকে পাড়ি দিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের টিকেট পায় লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। হারায় ইংল্যান্ডের মতো পরাশক্তিকে।

মাঠের লড়াইয়ে পুরোনো সৈনিক তামিম-সাকিব-মাশরাফি-মুশফিকদের সঙ্গে সামিল হয়েছিলেন নতুন যোদ্ধা সাব্বির-লিটন-সৌম্যরা। আটে ভারতের বিপক্ষে হারলেও তাতে ছিল বিতর্কের মেঘ।

আর সে বিতর্কই যেনো আগুনে ঘি ঢেলেছিলো। উসকে দিয়েছিলো বাংলার বাঘের বুকের ছাইচাপা আগুন। শুরু সাফল্যের এক বীরগাথার।

দেশের মাটিতে টানা তিন সিরিজ জয় করলো মাশরাফির দল। পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ, ভারতের বিপক্ষে প্রথম দুই ম্যাচ জিতে সিরিজ নিশ্চিত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে প্রথম ম্যাচ হেরেও সিরিজ জয়।

ধারাবাহিকতায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানের জয়; ততদিনে তা যেনো প্রত্যাশিত। সব মিলিয়ে এ বছর ১৮ ওয়ানডের মধ্যে ১৩টিতেই বিজয়ের উল্লাস বাংলাদেশের। জয়ের অনুপাত ০.৭২ শতাংশ।

তারপরও পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে একটু খটকা লাগে এই বছরটিকে সবচেয়ে সাফল্যের বছর বলতে।   

২০০৯ সালে ১৯ ওয়ানডে খেলে ১৪টিতে জয় ছিল টাইগারদের, জয়ের অনুপাত ০.৭৩%। সে বছর বাংলাদেশে ত্রিদেশীয় সিরিজে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে জেতে তিন-তিনটি সিরিজ । আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আরেকটি।

পরিসংখ্যান যাই বলুক ২০১৫ সালকেই বলা হচ্ছে সেরা বছর। কেননা ২০০৯ সালের পর বাংলাদেশের ক্রিকেটের আকাশে রৌদ্রজ্জল দিন খুব একটা আসেনি। আর তাই ক্রিকেটপেমীরা সেরা মানছেন এই বছরটিকেই।

এতো গেলো ওয়ানডে ফরমেটের কথা। টেস্ট কিংবা টি-টোয়েন্টি ফরমেটে খুব ভালো না করলেও, বছর শেষে মন্দ নয় ফলাফল।

এ বছর পাঁচ টেস্ট খেলে চারটিতেই ড্র, হার মাত্র একটিতে। ভারতের বিপক্ষে একটি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুটি ম্যাচে ব্যাট-বলের লড়াইয়ের চেয়ে বৃষ্টির রিমঝিম সুরের দাপটই ছিল বেশি।

পাকিস্তানের বিপক্ষে খুলনা টেস্টের আবারো ইতিহাস, যা ছাড়িয়ে গেলো ২০০৯ কেও। তিন টেস্টের মধ্যে দুটিতেই জয়, একটিতে হার। অন্যদিকে, তামিম ইকবাল-ইমরুল কায়েসের বীরত্বপূর্ণ ব্যাটিংয়ে খুলনা টেস্টের সৌজন্যে চলতি বছরটিও স্মরণীয়।

টি-টোয়েন্টিতে এখনও ততটা পরিণত নয় বাংলাদেশ। এ বছর পাঁচ ম্যাচ খেলে দুই জয়, তিন হার। এর মধ্যে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়টি আলাদা উল্লেখের দাবি রাখে।

এক ম্যাচে শতভাগ জয়ের সুবাদে টি-টোয়েন্টিতে অভিষেকের সেই ২০০৬ সাল সফলতম হিসেবে দাবিদার। তবে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের কারণেই মনে রাখতে হবে ২০১৫ কে।

এতকিছুর পরও তিন ফরম্যাট মিলিয়েও সাফল্যের হিসাবে ২০১৫-কে সবার ওপরে স্থান দিচ্ছে না পরিসংখ্যান। সেখানেও সবচেয়ে জ্বলজ্বলে ২০০৯।

২৫ ম্যাচের মধ্যে ১৬ জয়ে ০.৬৪ জয়ের অনুপাতে। ৩৩ ম্যাচে ১৯ জয়ে ০.৫৭ অনুপাত নিয়ে ২০০৬ রয়েছে এরপর। তৃতীয়তে এই ২০১৫। ২৮ ম্যাচে ১৫ জয়ে ০.৫৩ জয়ের অনুপাতে।

এতো গেলো মাঠের লড়াইয়ের কথা। একটু পেছন ফিরলেই দেখা মিলবে মাঠের বাইরে নেতিবাচক আচার-আচরণ।

শঙ্কা আর অনিশ্চয়তা নিয়ে শুরু হওয়া ২০১৪ সালের জুলাইয়ে বিশ্বসেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে সবধরনের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করে বিসিবি। নভেম্বরে জিম্বাবুয়ে সিরিজ দিযে মাঠে ফেরেন এই অলরাউন্ডার।

সে বছরই ক্রিকেটপাড়ায় নতুন বিতর্কের জন্ম দেন পেসার রুবেল হোসেন।

অভিনেত্রী হ্যাপি তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের গায়ে লাগে কলঙ্ক। তবে ২০১৫ সালে অনুষ্ঠেয় ওয়ানডে বিশ্বকাপে নিজের পারফরমেন্স দিয়ে সব বিতর্ককে চাপা দিয়ে দেন এই পেসার।

এরপর শুরু আল-আমিন অধ্যায়। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মাটিতে আয়োজিত বিশ্বকাপে ঝড় তোলার প্রত্যয় নিয়ে দলের সঙ্গে যান এই পেসার । টিম কারফিউ ভঙ্গ করে তিনি রাতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে টিম হোটেল থেকে বাইরে বের হন। ফলশ্রুতিতে আল আমিনকে বিশ্বকাপ দল থেকে বহিষ্কার করে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

এ বছর ক্রিকেটাররা নেতিবাচক কারণে সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন আরও একবার। গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের অভিযোগে সস্ত্রীক শাহাদাত হোসেনের কারাগারে যাওয়া এক লজ্জার জন্ম দিয়েছে।

একটি সাফল্যের পেছনে ইতিবাচক-নেতিবাচক দুটো শব্দই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নেতিবাচক দিকগুলোকে দূরে সরিয়ে সাফল্যের জয়গাথা নিয়ে শুরু হবে আগামী বছর, এমনই প্রত্যাশা ক্রিকেটপ্রেমীদের। আর তাইতো অধিনায়কের কথায় আগামীর সাফল্য।

মাশরাফি বিন মর্তুজার ভাষায়, “এই বছরে ছেলেরা ভীষণ পরিশ্রম করেছে। আমি সত্যি ওদের প্রতি কৃতজ্ঞ। সেই সঙ্গে কৃতজ্ঞতা কোচিং স্টাফদের প্রতিও। বছরটা আমাদের জন্য সত্যি অনেক বড় ব্যাপার ছিল। ২০১৫ সালের সাফল্য নিয়ে আমি গর্ববোধ করি। আশা করি, ২০১৬ আরো ভালো ক্রিকেট খেলব।”

কোচ চন্দিকা হাতুড়েসিংহে দ্বিধাহীনভাবেই এই বছরকে সবচেয়ে সফল বলছেন।তার ভাষায়, “টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর খুব সম্ভবত বাংলাদেশ সেরা বছর কাটাল এবং আমাদের বর্তমান দলটিও হয়তো বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা। এই বছরে ক্রিকেটারদের উন্নতির যে ক্রম, তাতে আমি খুব খুশি।

“টানা পাঁচটি সিরিজ জেতা সহজ নয়। কারণ কখনো কখনো এক-দুটি ম্যাচ খারাপ যেতেই পারে। কিন্তু আমরা ছিলাম খুব ধারাবাহিক।”

বিদায়ের পথে আরও একটি বছর। ২০১৫ সালকে বিদায় দিয়ে ২০১৬ সালকে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় সারাবিশ্ব। পরিসংখ্যান তাই যে সাক্ষ্যই দিক না কেন, ২০১৫ সাল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় খোদাই থাকবে সফলতম বছর হিসেবেই এবং সেটি কোনো রকম সন্দেহ ছাড়াই!

বিডিটাইমস৩৬৫ ডটকম/এসআর/একে

 

উপরে