আপডেট : ১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ১১:৩২

প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি সম্পন্ন, ফিরতে নাখোশ রোহিঙ্গারা

অনলাইন ডেস্ক
প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি সম্পন্ন, ফিরতে নাখোশ রোহিঙ্গারা

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার (১৫ নভেম্বর) থেকে।প্রথম দফায় উখিয়ার জামতলী ও টেকনাফের উনচিপ্রাং শরণার্থী শিবির থেকে ৪৮৫ পরিবারের ২ হাজার ২৬০ জন্য রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের কথা রয়েছে।

প্রত্যাবাসন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ক্যাম্প দুটিতে নিরাপত্তা জোরদারসহ সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হলেও মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি নন রোহিঙ্গারা। এমনকি  প্রত্যাবাসনের জন্য তালিকায় থাকা অনেক রোহিঙ্গা ঘর ছেড়ে বাইরে বাইরে লুকিয়ে বেড়াচ্ছেন। বরাবরের মতোই রোহিঙ্গারা বলছেন, দেশে ফেরার আগেই নাগরিকত্বসহ তাদের নানা দাবি-দাওয়া পূরণ না করলে তারা কিছুতেই মিয়ানমারে ফিরে যাবেন না।

উখিয়ার জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ ড. মো. শফিক উদ্দিন বাংলানিউজকে জানান, এই ক্যাম্প থেকে প্রথম দফায় ১২১ পরিবারের প্রায় পাঁচশো রোহিঙ্গার নাম তালিকায় রয়েছে। প্রত্যাবাসন কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ক্যাম্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

তালিকায় থাকা রোহিঙ্গাদের ঘরে ঘরে গিয়ে বোঝানো হচ্ছে। ক্যাম্পের ইমাম, মাঝি, স্বেচ্ছাসেবক, ব্লক উন্নয়ন কমিটির লোকজনকে নিয়ে উদ্বুদ্ধকরণ সভা করা হচ্ছে। টেকনাফের উনচিপ্রাং ক্যাম্পেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

শফিক উদ্দিন আরো বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য বান্দবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুনধুম ও টেকনাফের কেরুনতলী সীমান্তে দুটি ট্রানজিট ক্যাম্পও তৈরি করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৩ নভেম্বর) বিকেলে জামতলী ক্যাম্পে কথা হয় তালিকায় থাকা অনেকের সঙ্গে। তাদের সবার বক্তব্যই এক। নাগরিকত্বসহ সাতদফা দাবি আগে পূরণ করলেই তারা মিয়ানমারে যাবেন। প্রয়োজনের এখানে আত্মহত্যা করবেন,তবুও সেখানে যাবেন না।

তালিকায় নাম আছে জানিয়ে জামতলী ১৫ নম্বর ক্যাম্পের রহিম মোস্তফা (৫০) বলেন, আমরা সেখানে যাব না। আরাকানে যারা আছে তাদের এখনো নাগরিকত্ব দেওয়া হয়নি, এখন আমরা কিভাবে যাব? আগে তাদের নাগরিকত্ব দিয়ে দেখাতে হবে। বার্মা এর আগেও আমাদের এনভিসি কার্ড দিয়েছে। এই কার্ডের বদলে নাগরিকত্ব কার্ড দিবে বললেও দেয়নি।

‘এখানে মারা গেলে কিছু না হলেও জানাজা পড়া যাবে, ওখানে জানাজাও পড়া যাবে না। অনেক নির্যাতনের পর আমরা এখানে তোমাদের কাছে আশ্রয় নিয়েছি। এখানে আমাদের মেরে ফেললে মেরে ফেলো তবুও সেখানে যাব না।” বুক চাপড়ে কথাগুলো বললেন একই ক্যাম্পের ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা হাবিবা খাতুন।

মিয়ানমারের রাখাইনের বলিবাজার থেকে এসে আশ্রয় নেওয়া রহিম মোস্তফা বলেন, সেখানে নিয়ে গিয়ে আমাদের কাঁটাতারের বেড়ার ঘেরায় বন্দি করে রাখবে। আমাদের যদি বাড়ি-ঘর, ভিটে-মাটি ফিরিয়ে দিয়ে সেখানে নিয়ে যেত তাহলে যেতাম। এখন আমরা কোথায় যাব?

এ ক্যাম্পের হেড মাঝি মো. ওমর ফারুক মিয়ানমারে দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। থাকেন এ-১ সাবব্লকে। আটটি ব্লকের হেড মাঝি পরিচয় দিয়ে বাংলানিউজকে তিনি বলেন, প্রত্যাবাসনের তালিকার নাম থাকার বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকেই সবার মাঝে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। চলে যেতে হবে এই ভয়ে এরা কেউ এখন বাড়ি ঘরে থাকছে না, লুকিয়ে লুকিয়ে আছে। আগে বাড়ি-ঘরে কোন মানুষ গেলে এগিয়ে আসতো, এখন পালাচ্ছে।

তিনি বলেন, যাওয়ার আগেই সাতদফা দাবির বাস্তবায়ন চায় সবাই। না হলে কেউ যাবে না।

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য গঠিত টেকনিক্যাল কমিটির প্রধান মো. আবুল কালাম বুধবার সকালে বাংলানিউজকে বলেন, রোঙিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। মিয়ানমারও প্রস্তুত রয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে কাল থেকে প্রত্যাবাসন শুরু হবে।

উখিয়ার জামতলী ও টেকনাফের উনচিপ্রাং শরণার্থী শিবির থেকে ৪৮৫ পরিবারের ২ হাজার ২৬০ জন্য রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনের কথা রয়েছে বলে জানান তিনি।

এদিকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্থগিত করার জন্য এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিচেলি ব্যাচিলেট। এ মুহূর্তে প্রত্যাবাসন করা হলে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘিত হবে এবং রোহিঙ্গাদের জীবন ও স্বাধীনতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন তিনি।

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য গঠিত টেকনিক্যাল কমিটির প্রধান মো. আবুল কালাম বলেন, এ বিষয়ে সিদ্বান্ত নেবে সরকার। আমরা প্রত্যাবাসনের জন্য প্রস্তুত আছি।

মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে গত বছর ২৫ আগস্টের পর থেকে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। তাদের নিরাপদ ও মর্যাদার সাথে দেশে ফেরাতে গত বছর ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ-মিয়ানমার উভয় দেশের মধ্যে প্রত্যাবাসন চুক্তি সই হয়। 

চুক্তি অনুসারে ২২ জানুয়ারির মধ্যে প্রত্যাবাসন শুরুর কথা থাকলেও এক বছর পেরিয়ে গেলেও একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত নেয়নি মিয়ানমার। এ অবস্থায় প্রত্যাবাসনের জন্য গঠিত ওয়ার্কিং গ্রুপের তৃতীয় বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৫ নভেম্বর থেকে প্রথম দফা প্রত্যাবাসন শুরু হচ্ছে।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/রুমা

উপরে