আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১২:৩২

মাওলানাদের চাপে ভাস্কর্যের নারী মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাচ্ছে ‘পুরুষ’

অনলাইন ডেস্ক
মাওলানাদের চাপে ভাস্কর্যের নারী মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যাচ্ছে ‘পুরুষ’

কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ভাস্কর্যের কাজ চলছে। এ ভাস্কর্যের ডিজাইনে তিনজন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি ছিল।

ডিজাইনে একজন নারী মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতিও ছিল; কিন্তু একটি মহলের চাপ ও নির্দেশে ওই নারী মুক্তিযোদ্ধার আকৃতি বদলে সেখানে পুরুষ মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি স্থাপনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই ডিজাইনের আরেকটি ভাস্কর্য করিমগঞ্জে স্থাপন করা হলেও সেখানে কোনো সমস্যা হয়নি। ওই ভাস্কর্যে নারী মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতি অবিকল রাখা হয়েছে। দুটি ভাস্কর্যের কাজই শেষের দিকে। জানা গেছে, তাড়াইল উপজেলা পরিষদের সামনে একটি খোলা জায়গায় ২০১৬ সালে ভাস্কর্যটি স্থাপনের কাজ শুরু হয়। একই ধরনের আরেকটি ভাস্কর্যের কাজ করিমগঞ্জেও শুরু হয়। কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদ ভাস্কর্য দুটির কাজ বাস্তবায়ন করছে।

মেসার্স পারুল এন্টারপ্রাইজ করিমগঞ্জ ও মেসার্স স্বর্ণা এন্টারপ্রাইজ তাড়াইলে ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ দুটি পায়। দুটি ভাস্কর্য নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৯৯ লাখ টাকা।

ভাস্কর সুশেন আচার্য ও শ্যামল আচার্য ভাস্কর্য দুটি তৈরি করছেন। সরেজমিন তাড়াইল ঘুরে জানা গেছে, যেখানে ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হচ্ছে তার সমানেই তাড়াইল-সাচাইল দারুল হুদা কাছিমুল উলুম মাদরাসা। তার পাশে একটি মসজিদও রয়েছে। এ দুই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ভাস্কর্য স্থাপনে আপত্তি ওঠায় তাড়াইলের ভাস্কর্যটিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাড়াইল সদরের এক ব্যক্তি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান ও ত্যাগ অবিস্মরণীয়। নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে সবার চেষ্টা ও বহু রক্তক্ষয়ের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। এই ভাস্কর্যে সেই ত্যাগী নারীর স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু ভাস্কর্যটি থেকে নারীকে সরিয়ে দিয়ে মূলত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করা হলো। ’

এ ব্যাপারে তাড়াইল-সাচাইল দারুল হুদা কাছিমুল উলুম মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা ফয়েজ উদ্দিন বলেন, ‘এখানে ভাস্কর্যের নামে যে মূর্তি বানানো হচ্ছে, তা আমাদের মাদরাসা থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। বিশেষ করে নারী মূর্তিটি মাদরসার দিকে ফেরানো। আমাদের দাবি ছিল ভাস্কর্যটিই যেন এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু সেটি না করে প্রশাসন শুধু নারী মূর্তিটিকে পুরুষ বানানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এতে আমাদের দাবি কিছুটা হলেও পূরণ হয়েছে। ’ জানা গেছে, ভাস্কর্যের শিল্পীকে ভাস্কর্য থেকে নারী মুক্তিযোদ্ধাকে পুরুষ মুক্তিযোদ্ধা বানানোর কোনো লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তাড়াইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, উপজেলা চেয়ারম্যান ও প্রশাসনের চাপে ভাস্কর্যে প্রথমে যে নারী প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়েছিল, সেটি ভেঙে পুরুষ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে তাড়াইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা আক্তার জানান, আপত্তিটা বড় হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ভাস্কর্যের শিল্পী সুশেন আচার্য বলেন, নারীকে পুরুষে রূপান্তর করার বিষয়ে জেলা পরিষদ থেকে কোনো লিখিত নির্দেশ দেওয়া হয়নি, যা হয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের নির্দেশেই হয়েছে। কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শিবির বিচিত্র বড়ুয়া বলেন, জেলা পরিষদ ডিজাইন পরিবর্তন করে ভাস্কর্যের কাজ করতে শিল্পীকে কোনো চিঠি বা নির্দেশ দেয়নি।

তবে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমান জানান, প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে করিমগঞ্জ ও তাড়াইলে দুটি ভাস্কর্যের কাজ প্রায় শেষের পথে। কিন্তু তাড়াইলে স্থানীয়ভাবে কিছু সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় নারী প্রতিকৃতিটি বদলে পুরুষ করা হয়েছে।

তাড়াইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আজিজুল হক ভূঁইয়া মোতাহার নারী প্রতিকৃতিকে পুরুষ বনানোর নির্দেশের কথা অস্বীকার করে বলেন, ‘নারী মুক্তিযোদ্ধার প্রতিকৃতিটি মাদরাসার দিকে ফেরানো ছিল। আমরা শুধু বলেছি সেটি ঘুরিয়ে স্থাপন করতে। ’

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

উপরে