আপডেট : ২৮ নভেম্বর, ২০১৬ ১০:৪৭

খোদ হাসপাতালই যখন কঠিন রোগে আক্রান্ত!

অনলাইন ডেস্ক
খোদ হাসপাতালই যখন কঠিন রোগে আক্রান্ত!

আট বছর ধরে প্রসূতিসেবা বন্ধ। এক্স-রে, ইসিজি ও আল্ট্রাসনোগ্রাম নষ্ট হয়ে গেছে। কোটি টাকায় নির্মিত অস্ত্রোপচার কক্ষ ও যন্ত্রপাতি দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দন্ত বিভাগের কম্প্রেসার অকেজো। সব মিলিয়ে কঠিন রোগে আক্রান্ত খোদ হাসপাতালটিই।

প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া আর কিছুই মেলে না। একটু জটিল কিছু হলেই তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় জেলা হাসপাতালে। এ জন্য স্থানীয়রা কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ‘সর্দি-জ্বরের হাসপাতাল’ নামে ডাকে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচও) থাকেন জেলা শহরে। আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তার ঠিকানাও একই জায়গায়। আর অন্য চিকিৎসক যাঁরা আছেন, তাঁদের বেশির ভাগ উপজেলার বাইরে ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করেন। প্রতিদিন দুপুর ১টার পর থেকে চিকিৎসকশূন্য হয়ে পড়ে। আর রাতে জরুরি বিভাগের দায়িত্বে যিনি থাকেন, সেই চিকিৎসকের ওপর থাকে পুরো হাসপাতালের ভার। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতালের ইউএইচও ডা. রমজান মাহমুদ দুপুর ১২টার আগে হাসপাতালে যান না। তাঁর অদক্ষতা ও আন্তরিকতার অভাবে পুরো উপজেলার সরকারি চিকিৎসাসেবা মুখথুবড়ে পড়েছে। যেসব চিকিৎসক দিনের পর দিন অনুপস্থিত থেকে মাস শেষে বেতন নিতে যান, তাঁদের কাছ থেকে ইউএইচও অনৈতিক সুবিধা নিয়ে থাকেন।

হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, গত ২১ ও ২২ নভেম্বর হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীরা কোনো চিকিৎসকের দেখা পায়নি। এ দুই দিন তাদের কোনো চিকিৎসা হয়নি। গেজের সমস্যা নিয়ে ভর্তি হওয়া এক রোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মাঝেমধ্যে এ ধরনের ঘটনার শিকার হচ্ছেন তাঁরা।

গত শনিবার সকাল পৌনে ১০টায় হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জামেনা খাতুন (৬০) নামে এক নারী শুয়ে আছেন বহির্বিভাগের একটি বেঞ্চে। তাঁর পায়ে ঘা হয়েছে। তখনো কোনো চিকিৎসক বহির্বিভাগে রোগী দেখা শুরু করেননি। পৌনে ১১টার দিকে দুই-তিনজন চিকিৎসক গিয়ে তাঁদের চেম্বারে বসেন। বসতে না বসতেই তাঁদের ঘিরে ধরে বিভিন্ন ওষুধ কম্পানির প্রতিনিধিরা।

হাসপাতালের একজন কর্মচারী জানান, রোগীদের কোনো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা থাকে না। ওষুধ কম্পানির প্রতিনিধিদের সামনে চলে চিকিৎসা। বিশেষ করে নারী রোগীরা মন খুলে চিকিৎসকদের কাছে সমস্যার কথা বলতে পারে না। হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ৩ সেপ্টেম্বর হাসপাতালটি পরিদর্শনে গিয়ে ক্ষুব্ধ হন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (জনস্বাস্থ্য ও বিশ্বস্বাস্থ্য) রোকসানা কাদের। তিনি হাসপাতাল পরিদর্শন করে গত ১৬ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দেন। এতে উল্লেখ করা হয়, ‘ইউএইচও ডা. রমজান মাহমুদ কর্তব্য ও কর্মে আন্তরিক নন। অফিস চলাকালে হাসপাতালে বসে প্রাইভেট প্র্যাকটিসের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বেশির ভাগ সময় চার-পাঁচজনের বেশি চিকিৎসক হাসপাতালে উপস্থিত থাকেন না। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাও হয় না।’ এ প্রতিবেদনের অনুলিপি দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে। প্রতিবেদনে জনবল সংকট, চিকিৎসকদের আন্তরিকতার অভাবসহ হাসপাতালের ১৫টি সমস্যা চিহ্নিত করে এগুলো দ্রুত সমাধানের সুপারিশ করা হয়েছে।

ওই সূত্র আরো জানায়, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে প্রায় সোয়া কোটি টাকা ব্যয় করে প্রসূতি বিভাগে আধুনিক একটি অস্ত্রোপচার কক্ষ ও যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা করা হয়। শল্যবিদ (সার্জন) ও অবেদনবিদসহ জনবল নিয়োগ দেওয়ার পর ২০০৭ সালের শেষ দিকে হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার চালু হয়। কিন্তু ২০০৮ সালের জুনে শল্যবিদ বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর থেকে ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার বন্ধ হয়ে যায়।

ওই সূত্রে আরো জানা গেছে, হাসপাতালটিতে বিশেষজ্ঞসহ মোট ২১ জন চিকিৎসক থাকার কথা। ৯টি পদই শূন্য রয়েছে। যে ১২ জন কর্মরত রয়েছেন তাঁদেরও একসঙ্গে পাওয়া যায় না। ২২ জন নার্স থাকার কথা থাকলেও আছেন ১১ জন। এর মধ্যে পাঁচজন আবার প্রেষণে অন্য হাসপাতালে কাজ করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তাঁরা ছাড়াও উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে যেসব চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের কেউ ইউনিয়নে যান না। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন আবার প্রেষণে কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে কাজ করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালের অচলাবস্থার সুযোগ নিয়ে বেসরকারি রোগ নির্ণয় কেন্দ্রের লোকজন প্রতিদিন রোগীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা রোগীদের ওই সব কেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। তা ছাড়া দুপুর ১টার আগে ওষুধ কম্পানির প্রতিনিধিদের হাসপাতালে প্রবেশের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এ নিয়ম কার্যকর হচ্ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রশাসনের অদক্ষতা ও দুর্বলতার কারণে হাসপাতালটির চিকিৎসা কার্যক্রমে গতি আসছে না।’

এ বিষয়ে করিমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রমজান মাহমুদ বলেন, ‘অনেক সময় জেলায় প্রশাসনিক কাজ থাকে, এ কারণে মাঝেমধ্যে দেরি হয়ে যায়। চিকিৎসকদের আবাসনব্যবস্থা ভালো না থাকায় তাঁরা এখানে রাতে থাকতে চান না। যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য সংশ্লিষ্টদের চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আবদুল গনি বলেন, ‘করিমগঞ্জ হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি আমার জানা আছে। আমি সব সমস্যা নিয়ে ইউএইচওর সঙ্গে বসব। আর যন্ত্রপাতির সমস্যাগুলো অচিরেই সমাধানের চেষ্টা করব।’

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/বুলা

উপরে