আপডেট : ২৬ মার্চ, ২০১৬ ১৩:২৮

মুক্তিযুদ্ধের রহস্যময় এক অকথিত অধ্যায়

বিডিটাইমস ডেস্ক
মুক্তিযুদ্ধের রহস্যময় এক অকথিত অধ্যায়

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ), যা মুজিব বাহিনী নামে সমধিক পরিচিত-আমাদের মুক্তিযুদ্ধে রহস্যময় এক অকথিত অধ্যায়। ইতিহাসের একটি বিশেষ সময়ে কেন, কি প্রেক্ষাপটে এই ‘গোপন’ বাহিনী গড়ে উঠেছিল, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কি আকারে প্রভাব বিস্তার করেছিল, প্রায় অর্ধশত বছর পরে এখনও অনেকটাই রহস্যময় এবং প্যান্ডোরার বাক্সে তালাচাবি দেয়া। মাঝে-মধ্যে গণমাধ্যম, জাতীয় সংসদসহ নানা টুকরো-টাকরা আলোচনায় এ নিয়ে বিতর্ক-উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও এই বাহিনীর ভূমিকা জনগনের কাছে এখনও রহস্যাবৃত। অতি সম্প্রতি কিছু লেখা-জোখায় প্রসঙ্গটি উঠে আসতে শুরু করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতীয় প্রশ্রয়ে এ বাহিনী এতটাই ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছিল যে, মুজিবনগর সরকারকে তারা প্রকাশ্যে অবজ্ঞা ও অগ্রাহ্য করতে পেরেছিল।ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা মুজিব বাহিনীর ওপর সে সময়ে অস্থায়ী সরকারের কোন নিয়ন্ত্রন তো ছিলই না, বরং বিভিন্ন সময়ে এ বাহিনী সরকারের বিরুদ্ধে বৈরী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। মুজিব বাহিনীর প্রধান চার নেতা এবং সংগঠক ছিলেন সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। ভারতীয়রা এই নেতাদের আদর-স্নেহের সম্বোধন করতেন ‘অবিচ্ছেদ্য চার’ বলে। মুক্তিযুদ্ধের চার বছরের মাথায় শেখ মনি ১৫ আগষ্ট ট্রাজেডির শিকার হয়ে নিহত হন। রাজ্জাক মারা যান ২০১১ সালের ২৩ ডিসেম্বর। জীবিত দু’জনের মধ্যে তোফায়েল আহমেদ বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নীতি নির্ধারক। অপরজন বাংলাদেশের রাজনীতির কথিত ‘রহস্য পুরুষ’ সিরাজুল আলম খান এখন অনেকটাই নিষ্ক্রিয়।ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সেনা কমান্ডোর আদলে গড়ে ওঠা র‌্যাডিক্যাল এই বাহিনীর সামগ্রিক দায়িত্বে ছিলেন একজন গেরিলা যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ শিখ সেনা কমান্ডার মেজর জেনারেল এস এস উবান সিং। কার্যত: তিনি ছিলেন এ বাহিনীর প্রশিক্ষক ও সর্বাধিনায়ক। তার লেখা ফ্যানটম অব চিটাগাং: ফিফথ আর্মি ইন বাংলাদেশ গ্রন্থে মুজিব বাহিনীর গড়ে ওঠা এবং এর সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। কেন বইয়ের শিরোনামে তিনি মুজিব বাহিনীকে ফিফথ আর্মি নামে উল্লেখ করেছেন, সেটি গভীর রহস্য ও বিষ্ময়ের বিষয়। কারন যুদ্ধের ইতিহাস বা ব্যবহারিক পরিমন্ডলে ফিফথ আর্মি শব্দদ্বয় দিয়ে সাধারন সেই ধারার ট্রেইটরদের বোঝানো হয় যারা নিজ রাষ্ট্রের বিপক্ষে বা রাষ্ট্রের শত্রুদের স্বার্থানুকূলে ভূমিকা রাখে।
প্রয়াত জাসদ নেতা ও মুজিব বাহিনীর সংগঠকদের একজন কাজী আরেফ আহমেদ লিখেছিলেন, পুর্ব বাংলাকে স্বাধীন করার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৬২ সাল থেকে সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগে গোপন একটি নিউক্লিয়াস কাজ করত।এই নিউক্লিয়াসের অপর সদস্যদ্বয় ছিলেন আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ নিজে। পরে অনেকে অন্তর্ভূক্ত হন। ঐ গোপন রাজনৈতিক নিউক্লিয়াসের পরিবর্ধিত সংস্করণ হচ্ছে বিএলএফ বা মুজিব বাহিনী, ১৯৬৫ সাল থেকে আবদুর রাজ্জাক যোগাযোগ রাখতেন শেখ মুজিবের সাথে (জনকন্ঠ ২৮ ও ২৯ মার্চ ১৯৯৫)। মুজিব বাহিনী বা বিএলএফ গঠিত হয়েছে ২৫ মার্চের আগে। কাজী আরেফের লেখায় স্পষ্ট না থাকলেও নানা উৎস ও সূত্রের দাবি, “স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ” সশস্ত্র শাখা গঠন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)। প্রতি রাতে হল সংলগ্ন মাঠে ডামি রাইফেল দিয়ে প্রশিক্ষণ হতো। এর অর্থ দাঁড়ায়, একাত্তরের অনেক আগেই স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ ছাত্রদের মাঝে সশস্ত্র কার্যক্রমের সূচনা ঘটিয়েছিল। দেশের অনেক জেলা ও মহকুমা সদরে ২৫ মার্র্চের আগেই এরকম প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রাগার লুন্ঠনের ঘটনা জানা যায়।

যুদ্ধকালে সরকার প্রধান এবং সামরিক প্রধানের প্রতি উপেক্ষা ও আনুগত্যহীনতা চরম বিরোধিতাতুল্য হলেও মুজিব বাহিনী সংগঠকদের এজন্য কখনই জবাবদিহি করতে হয়নি। তারা প্রকাশ্যেই বলছিলেন, শেখ মুজিবের নির্দেশ ছিল, তাঁর অনুপস্থিতিতে চার যুবনেতা সামরিক কাঠামোর নেতৃত্ব দেবেন এবং তাজউদ্দিন রাজনৈতিক কাঠামোর নেতৃত্ব দেবেন। ২৫ মার্চ কালরাতে শেখ মুজিবের গ্রেফতারের পরে তাজউদ্দিন আহমেদ গঠিত প্রবাসী সরকারের প্রধান হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কাঠামো মুক্তিবাহিনী গঠনে উদ্যোগী হলে চার যুবনেতা, বিশেষভাবে শেখ ফজলুল হক মনি তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি সরকার গঠন ও তাজউদ্দিনের প্রধানমন্ত্রী হওয়াকে ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করা হয়।তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে ঘিরে ভারত যে রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিল ২৫ মার্চ শেখ মুজিবের গ্রেফতার সেটিকে অনিশ্চয়তায় নিক্ষেপ করে। এ প্রসঙ্গে ড. আহমেদ কামাল জানাচ্ছেন (প্রাগুক্ত), “শেখ মুজিবের পাক সেনানায়কদের হাতে ধরা পড়ার বিষয়টি ভারতের রাজনৈতিক পরিকল্পনার বিরাট ব্যর্থতা। তার মত জনপ্রিয় নেতা, যিনি তখন জাতির কন্ঠস্বরে পরিনত, ভারতের আয়ত্তে না থাকাতে তাদের স্বার্থে বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক মীমাংসার পথে একটি অনিশ্চয়তা বিরাজ করতে থাকে। …শেখ মুজিবের অনুপস্থিতি ও পাক শাসকের হাতে তার অবস্থান ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে নিয়ে … ভারতের স্বপ্নের জন্য সেটি ছিল বিরাট অনিশ্চয়তা”। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের এরকম ‘অনিশ্চয়তা’ সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল তাজউদ্দিন আহমেদ নেতৃত্বাধীন সরকার ও মুক্তিবাহিনীর ওপর। ভারতীয় নিয়ন্ত্রনে গঠিত হয়েছিল বিএলএফ বা মুজিব বাহিনী।

উপরে