আপডেট : ১৯ মার্চ, ২০১৬ ১২:০১

সংঘাত-সংঘর্ষেও উৎসবের আমেজ

বিডিটাইমস ডেস্ক
সংঘাত-সংঘর্ষেও উৎসবের আমেজ

এবারই প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। প্রথম পর্যায়ে ৩৬ জেলার ১০১ উপজেলায় ভোট গ্রহণ হতে যাচ্ছে আগামী ২২ মার্চ। এই নির্বাচনে বিভিন্ন ইউনিয়নে ব্যাপকসংখ্যক বিদ্রোহী প্রার্থী, প্রচারে বাধা, সংঘাত-সংঘর্ষের মাঝেও নির্বাচনী এলাকাগুলোতে এখন উৎসবের আমেজ।

সিলেট মহানগরীর শাহী ঈদগাহ থেকে পূর্বদিকে যেতে হাতের ডানের এলাকা সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত। সেনপাড়া কিংবা খরাদিপাড়া কোলাহলহীন। ব্যতিক্রম বাঁ পাশের এলাকা। আরামবাগ, বালুচর কিংবা আলুরতলের মতো শান্ত এলাকাগুলো ‘উত্তাপ’ ছড়াচ্ছে। মাথার ওপর সারি সারি পোস্টার ঝুলছে। উচ্চ শব্দ ভেসে আসছে মাইকে। চলছে লিফলেট হাতে প্রার্থীদের গণসংযোগ। বালুচরের ইজাজ মিয়ার কলোনির বাসিন্দা লাইলী বেগম হনহন করে বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। ফরিদপুর থেকে এসে বালুচরে থিতু হয়েছেন। দীর্ঘ ৩৭ বছরে সিলেটের ভাষা শিখে গেছেন। নির্বাচনের অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বালুচরে প্রথম যখন ইলেকশন হইছলো তখনো ভোট দিছিলাম। অত বছরের মইধ্যে ই-বার একটু অন্য রকম ভোট অইব। দেখরা নায়নি সব গরম অই গেছে।’

সিলেট সদর উপজেলার আটটি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হতে যাচ্ছে আগামী ২২ মার্চ। এর একটি টুলটিকর ইউনিয়ন। এর ওয়ার্ড ৯টি। ভোটার ১৩ হাজার ৩০০। চেয়ারম্যান পদে লড়ছেন চারজন প্রার্থী। আর সদস্য পদে প্রার্থী ৪৪ জন। চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুল মোছাব্বির। তাঁর প্রতীক নৌকা। আনারস প্রতীক নিয়ে নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী এস এম আলী হোসেন। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মাঠে বিএনপির প্রার্থী কাজী মুহিবুর রহমান। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর ওপর রাগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন লুত্ফুর রহমান।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে বালুচর নতুন বাজারের পাশে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুল মোছাব্বিরের নির্বাচনী কার্যালয়ে গেলে দেখা যায়, ১০-১২ জন কর্মী বসে আছে। সিএনজিচালিত দুটি অটোরিকশা নিয়ে মাইকিং করতে বেরিয়ে গেছে কয়েকজন। মোছাব্বির তখন বাসা থেকে গণসংযোগে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কার্যালয় থেকে গান ভেসে আসাছিল—আমরা টুলটিকরের সবাই মুছাব্বিরকে চাই...।

আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী এস এম আলী হোসেনের নির্বাচনী কার্যালয়ও পাশেই। মন্টু নামের একজন কর্মীকে কার্যালয়ে পাওয়া গেল। আলী হোসেন তখন আরামবাগে গণসংযোগে ব্যস্ত। তবে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীর বালুচর নতুন বাজার কার্যালয় ছিল বন্ধ।

স্থানীয় সূত্রে অভিযোগ মিলল, আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়নে এখানে স্বজনপ্রীতি হয়েছে। জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিরণ মাহমুদ নিপু মনোনয়ন চেয়েছিলেন চেয়ারম্যান পদে। নিয়ম অনুসারে, ৯টি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক এই তিনটি পদের ২৭ জনের মধ্যে ১২ জনের ভোট পেয়েছিলেন নিপু। মোছাব্বির পেয়েছিলেন তিনটি ভোট। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিপুকে বাদ দিয়ে মোছাব্বিরকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। মনোনয়ন না পেয়ে নিপু নীরবতা পালন করছেন। তবে বিদ্রোহী আলী হোসেনের পক্ষে তাঁর সব সমর্থন যাবে বলে স্থানীয়রা মনে করছে। এ ব্যাপারে মোচ্ছাব্বির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দল যোগ্য মনে করেই আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। যে দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় সে তো দলের পক্ষে কাজ করতে পারে না।’

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কাজী মুহিবুর রহমান বলেন, ‘আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত বিদ্রোহী প্রার্থী আলী হোসেন ও লুত্ফুর রহমানকে মাঠে দেখা যাচ্ছে না। আমি গণসংযোগে ব্যস্ত আছি।’

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে টুলটিকরসহ আটটি ইউনিয়নের চারটিতেই আওয়ামী লীগ বিদ্রোহের মধ্যে পড়েছে। বিদ্রোহীরা বলছেন, তৃণমূলের মতামতকে অগ্রাহ্য করে প্রার্থী দেওয়ায় তাঁরা মাঠ ছাড়ছেন না। দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের জন্য কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাটের প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এ দুই উপজেলায় আওয়ামী লীগের ৯ জন বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে আছেন। সিলেট, কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাটে আওয়ামী লীগের ১৩ জন বিদ্রোহী মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে সিলেট সদর উপজেলার টুলটিকর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আলী হোসেন, জালালাবাদ ইউনিয়নে মনফর আলী, খাদিমপাড়া ইউনিয়নে অ্যাডভোকেট আফসর আহমদ, মোগলগাঁও ইউনিয়নে শামছুল ইসলাম টুনকে গত বুধবার দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

এদিকে গোয়াইনঘাট উপজেলার তিনটি ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থীরা হলেন—রুস্তমপুর ইউনিয়নে আবদুল মতিন, পূর্ব জাফলং ইউনিয়নে লুত্ফুর রহমান লেবু ও আলীরগাঁও ইউনিয়নে আবুল কাশেম মো. আনোয়ার শাহাদত।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের ছয়জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। তাঁরা হলেন—পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নে গেদা মিয়া, পূর্ব ইসলামপুরে ইলিয়াছুর রহমান, তেলিখালে আবদুল হক ও কাজী আবদুল ওয়াদুদ আলফু, উত্তর রনিখাই ইউনিয়নে ফরিদ উদ্দিন এবং দক্ষিণ রনিখাইয়ে এম. হান্নান।

কেন্দ্রীয় সম্মেলনের কারণে বিএনপির বড় নেতারা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের প্রচারে অংশ নিতে পারছেন না। বলতে গেলে ব্যক্তিগত শক্তির জোরে তাঁরা চালাচ্ছেন প্রচারণা। আর অধিকাংশ ইউনিয়নেই তাঁরা আওয়ামী লীগে বিদ্রোহের সুযোগ নিতে চান।

আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিছবাহ উদ্দিন সিরাজ প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল মুহিত এই নির্বাচনের প্রচারণায় নেই। তবে তাঁর ভাই জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ড. এ কে আবদুল মোমেন গত বৃহস্পতিবার রাতে মোগলগাঁও ইউনিয়নের গোলাম শাহ বাজারসংলগ্ন পথসভায় বক্তব্য দেন। তিনি সেখানে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালান।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগে বিদ্রোহ দমন করতে হচ্ছে। আমাদের দলে এই বিদ্রোহ নেই। তবে সরকারি দলের নেতাদের আচরণ ও চাপে নির্বাচন প্রভাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। টুকের বাজার ইউনিয়নসহ সব কটিতেই আমাদের প্রার্থীরা যথেষ্ট যোগ্য। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বেশির ভাগ ইউনিয়নে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা জয়ী হবেন।

সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরীর প্রত্যাশা, এখানে বেশির ভাগ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জয় ঘরে তুলবেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সদরের বিদ্রোহী প্রার্থীদের বহিষ্কার করা হয়েছে। কোম্পানীগঞ্জ ও গোয়াইনঘাটে বিদ্রোহীদের তালিকা করা হয়েছে। তাঁদের জেলা কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হবে। বিদ্রোহীদের সহযোগিতাকারীদের বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাগেরহাট প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকায় ক্ষুব্ধ ভোটাররা

‘ইলেকশন হলি তো ভালো হতো, যা হোক একজনকে ভোট দিতি পারতাম। এখন তো আর চেয়ারম্যান পদে ভোট দিতি পারব না। মেম্বর পদে ভোট দিতি যাব কি না ভাবছি।’ ক্ষোভের সঙ্গে কথাগুলো বলেন বাগেরহাট সদর উপজেলার গোটাপাড়া ইউনিয়নের দিনমজুর মো. আহম্মেদ আলী (৫৪)। এই ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ

মনোনীত প্রার্থী শেখ শমসের আলী। ফলে সেখানে নির্বাচনী প্রচার কম। সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা প্রচার চালালেও তা নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহ কম বলে জানান স্থানীয় ভোটার আহম্মেদ আলী।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাটের ৭৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ৩২টিতে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করেছেন। বাগেরহাট জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানান, এর মধ্যে ১৯টি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বাইরে কেউ মনোনয়ন জমা দেয়নি। বাকিগুলোতে জমা দিলেও পরে তা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এ ছাড়া রামপাল উপজেলার পেড়িখালী ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বাবুল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হলেও আপিলে বিএনপির মো. রফিকুল ইসলাম প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ায় সেখানে নির্বাচন হচ্ছে। আর ফকিরহাটের মূলঘর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হলেও আদালতের নির্দেশে সেই নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান নির্বাচন কর্মকর্তা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর থেকেই মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন নৌকা মার্কার প্রার্থীরা। ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দোয়া ও আশীর্বাদ চাইছেন তাঁরা। তাঁদের কর্মী-সমর্থকরা মিছিল ও পথসভায় মুখর করে রেখেছে এলাকা। অন্যদিকে যেসব ইউনিয়নে বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থী আছে, সেখানেও তাঁদের তেমন একটা জনসংযোগ করতে দেখা যাচ্ছে না। বেশির ভাগ ইউনিয়নে তাঁদের পোস্টার-লিফলেট দেখা যায়নি। স্থানীয় বিএনপির অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা বাধা দেওয়ায় বিরোধী কোনো দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেননি। শুধু তাই নয়, যাঁরা প্রার্থী হয়েছেন, তাঁরাও প্রচার চালাতে পারছেন না। তাঁদের নির্বাচনী অফিস, এমনকি বাড়িতে হামলা করা হচ্ছে। অনেকেই ভয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

বাগেরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ সালাম অভিযোগ করেন, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দুই দিন আগে থেকেই আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকরা বিএনপির প্রার্থীদের নানাভাবে হুমকি দিয়েছে। এতে দলীয় প্রার্থী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। এমনকি বাগেরহাট সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর, গোটাপাড়া ও কচুয়া উপজেলার গজালিয়া থেকে তাদের প্রার্থীর মনোনয়নপত্র ছিনতাই হয়ে যায়। এ কারণে ২৭টি ইউনিয়নে তাদের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পারেননি। আর এখন প্রচার চালাতে পারছেন না। বিএনপির প্রার্থী ও কর্মীরা প্রতিনিয়ত হামলা-মামলার শিকার হচ্ছে।

তবে এই অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন বাগেরহাট সদর আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মীর শওকাত আলী বাদশা। তিনি বলেন, ‘ঢাকার শিল্পপতি সালাম সাহেব তো নিজেই এলাকায় থাকেন না। এলাকার খোঁজখবর রাখেন না। দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। তাঁদের দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরমে। তাঁরা প্রার্থী দেবেন কিভাবে?’ তিনি আরো বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতির কারণে জনগণের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা নেই। আর জনবিচ্ছিন্ন এই দলের প্রার্থী হলে জামানত বাজেয়াপ্ত হবে—এ কারণে অনেক ইউনিয়নে তারা প্রার্থী খুঁজে পায়নি।’

নির্বাচনে বাগেরহাটবাসীর নজর জেলার প্রাণকেন্দ্রের ঐতিহ্যবাহী ষাটগম্বুজ ইউনিয়নের দিকে। সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে একমাত্র এই ইউনিয়নে নির্বাচন হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের মতো নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা। গতকাল শুক্রবার দুপুরে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আক্তারুজ্জামান বাচ্চুকে প্রচার চালাতে দেখা গেলেও বিএনপির প্রার্থী ফকির তৌহিদুল ইসলামের দেখা মেলেনি। তিনি টেলিফোনে জানান, সরকারি দলের হুমকির কারণে তিনি প্রচার চালাতে পারছেন না। তবে সাধারণ ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারলে তাঁকেই ভোট দেবেন। ষাটগম্বুজ মসজিদের সামনে কথা হয় আওয়ামী লীগের প্রার্থী আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর সঙ্গে। জনগণ আবারও তাঁকে নির্বাচিত করবে দাবি করে তিনি বলেন, ‘বিএনপির প্রার্থী তো একাধিক মামলার আসামি। সে প্রচারণা চালাবে কিভাবে? আর বিএনপির কর্মী-সমর্থক নেই। বর্তমান সরকারের উন্নয়নে সাধারণ ভোটাররা এখন নৌকার পক্ষে। তাই বিএনপি অপপ্রচারে লিপ্ত।’

শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দা ইউনিয়নেও একক প্রচার চালাচ্ছেন নৌকা মার্কার প্রার্থী আসাদুজ্জামান মিলন। বর্তমান চেয়ারম্যান মিলন আবারও নির্বাচিত হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন। তবে তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষের প্রার্থী ফরিদ উদ্দিন মানিকও জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, বাগেরহাটেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। মোরেলগঞ্জ উপজেলার জিউধরা ইউনিয়নে পাঁচবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা মো. হাবিবুর রহমান দলীয় মনোনয়ন পাননি। তাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। তিনি অভিযোগ করেন, নৌকা মার্কার প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম বাদশা তাঁকে হুমকি দিচ্ছেন। তার প্রচারে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় তাঁর পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।

সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার বেশির ভাগ ইউনিয়নে নৌকা মার্কার প্রার্থীরা দাপিয়ে বেড়ালেও কোথাও কোথাও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। মংলা উপজেলার চাঁদপাই ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. শাহ আলম নৌকা মার্কার প্রার্থী ও কর্মীদের ঘুম কেড়ে নিয়েছেন। আওয়ামী লীগের মোল্লা মো. তারিকুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। জেলার আটটি ইউনিয়নে জামায়াতের নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিলেও কেউ সুবিধাজনক অবস্থানে নেই।

বাগেরহাটে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতরা হলেন সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নে অ্যাডভোকেট শংকর কুমার চক্রবর্তী, খানপুরে ফকির ফাইম উদ্দিন, গোটাপাড়ায় শেখ শমসের আলী, রাখালগাছিতে শেখ আবু শামিম আসনু, বাড়ইপাড়ায় মো. সরোয়ার হোসেন, যাত্রাপুরে এম এ মতিন, ডেমায় মো. মনি মল্লিক, বেমরতায় মনোয়ার হোসেন টগর, কাড়াপাড়ায় শেখ বশিরুল ইসলাম, কচুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নে শিকদার হাদিউজ্জামান, বাঁধালে নকিব ফয়সাল ওহিদ, গজালিয়ায় এস এম নাসির উদ্দিন, মোরেলগঞ্জের পঞ্চকরণে রাজ্জাক মজুমদার, তেলিগাথীতে মোরশেদা আক্তার, চিংড়িখালীতে আলী আক্কাস, রামপালের মল্লিকেরবেড় ইউনিয়নে তালুকদার নাজমুল কবির ঝিলাম, মংলার সোনাইলতলা ইউনিয়নে নাজিনা বেগম, চিতলমারী সদর ইউনিয়নে মো. নিজাম উদ্দিন, বড়বাড়িয়ায় মাসুদ সরদার, কলাতলায় মতিয়ার রহমান শিকদার, হিজলায় আজমীর কাজী, শিবপুরে ওহিদুজ্জামান, চরবানিয়ারিতে অশোক কুমার বড়াল, সন্তোষপুরে বিউটি আক্তার, মোল্লাহাটের আটজুড়ি ইউনিয়নে মো. মশিউর রহমান, কোদালিয়ায় ডি এস এম বি সাইফুল, চুনখোলায় মুন্সি তানজিল হোসেন, গাওলায় শেখ রেজাউল কবির, কুলিয়ায় বাবলু মোল্যা, উদয়পুরে এস কে হায়দার মামুন এবং ফকিরহাট সদর ইউনিয়নে শিরিনা আক্তার কিসলু।

খুলনায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে গুলি

জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার সুরখালি ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ও খুলনা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মুশফিকুর রহমান সাগরকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার গভীর রাতে উপজেলার পার্সেমারি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় তিনি রক্ষা পেলেও জাহাঙ্গীর হোসেন নামে তাঁর এক কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। বটিয়াঘাটা থানার ওসি মামুন-অর-রশীদ জানান, নির্বাচনী প্রচার শেষে সাগর তাঁর কর্মীদের নিয়ে পারসেমারি এলাকা দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় কে বা কারা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করে। সাগরের শরীরে গুলি না লাগলেও তাঁর কর্মী জাহাঙ্গীরের হাতে গুলি লেগেছে বলে শুনেছেন তিনি।

শক্ত অবস্থানে বিএনপি, অশান্তি আওয়ামী লীগে

বরিশাল সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে চলছে শেষ মুহূর্তের নির্বাচনী প্রচারণা। চারদিকে উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। বিশেষ করে নতুন ভোটারদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। ভোটাররা বলছেন, প্রাথমিক পরিসংখ্যানে এই ১০ ইউনিয়নে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা রয়েছেন কিছুটা বেকায়দায়। তবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইটা হবে নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যে। গতকাল শুক্রবার সরেজমিন ঘুরে প্রার্থী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

গতকাল সকাল থেকে সদর উপজেলার ইউনিয়নগুলো ঘুরে দেখা যায়, সবখানেই নৌকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মাথার ওপর উড়ছে ধানের শীষের পোস্টার। বাবুগঞ্জের মাধবপাশা, রহমতপুর ইউনিয়নে চোখে পড়েছে বিএনপির নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার দাপট। তবে প্রার্থীরা প্রকাশ্যে প্রচারণায় নামতে পারছেন না—বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের এমন বক্তব্য মানতে রাজি নন ভোটাররা। তাঁরা বলছেন, বিএনপির প্রার্থীরা প্রতিদিন প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। শুধু চেয়ারম্যান প্রার্থীরাই নন, বিএনপি সমর্থক মেম্বার প্রার্থীরও প্রচারণা চালাচ্ছেন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরাও প্রচারণায় সমান সক্রিয়।

সরেজমিনে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চরবাড়িয়া ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী জিয়াউল ইসলাম সাবু, সাস্তেবাদে মামুন-অর-রশীদ ওরফে খোকন মাস্টার, কাশিপুরে মোহাম্মদ হোসেন সিকদার শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। এ ছাড়া কড়াপুর, জাগুয়া, চরমোনাই, টুঙ্গিবাড়িয়া, চাঁদপুরা, চন্দ্রমোহন ও চরকাউয়া ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থীদের অবস্থান তুলনামূলক ভালো; যদিও কোনো কোনো ইউনিয়নে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। পক্ষান্তরে দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা তুলনামূলক পিছিয়ে রয়েছেন।

বরিশালে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রবীণ নেতা বলছেন, কেবল বরিশাল সদর নয়, বিভাগজুড়েই আওয়ামী লীগে রয়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। কেন্দ্রীয় কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার ভিন্ন ভিন্ন মতের কারণে তৃণমূলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় নেতাদের একেকজন একেক প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন। আবার স্থানীয় সংসদ সদস্যদের ইন্ধনে সবখানেই রয়েছেন বিদ্রোহী প্রার্থী। ফলে সংঘাতের পাশাপাশি দলের ভোটব্যাংক ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জানা যায়, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলার ৪২টি উপজেলার ৩৫৭টি ইউনিয়নের মধ্যে আগামী ২২ মার্চ প্রথম ধাপে ভোটগ্রহণ হবে ২৭২টিতে। এতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন ১৭৫ জন। অন্যদিকে বিএনপিরও বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন কেবল বরিশাল ও বরগুনায় মোট চারজন। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীদের মধ্যে ঝালকাঠির চারটি উপজেলার ৩১ ইউনিয়নে ৩৫ জন, পটুয়াখালীর ৫০ ইউনিয়নে ৪৪ জন, পিরোজপুরের সাতটি উপজেলার ৪০টি ইউনিয়নে ১২ জন, বরগুনার পাঁচটি উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়নে ২০ জন ও ভোলার সাত উপজেলার ৪৩ ইউনিয়নের মধ্যে সাতটিতে ৯ জন বিদ্রোহী  প্রার্থী রয়েছেন আওয়ামী লীগে।

এমন পরিস্থিতিতে কেবল বিদ্রোহীদের বহিষ্কার করেই হাত-পা গুটিয়ে স্বস্তিতে বসে থাকতে পারছেন না আওয়ামী লীগ নেতারা। বরং তাঁরা দিনরাত এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় ছুটছেন। গতকালও বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ,  সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুসসহ জেলা পর্যায়ের নেতারা মেহেন্দীগঞ্জ ও মুলাদী গিয়েছিলেন। তাঁরা ওই দুই উপজেলা সদরে গিয়ে মতবিনিময় করেছেন দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে।

সাংগঠনিক তৎপরতা সম্পর্কে জানতে চাইলে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মো. ইউনুস বলেন, ‘যারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কোনো তৎপরতা চালাবে তাদেরই বহিষ্কার করা হচ্ছে এবং আরো হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এবার দলীয় পরিচয়ে নির্বাচন হওয়ায় তৃণমূলের অনেক নেতাই মনোনয়ন চাইছেন। কিন্তু সবাইকে তো সুযোগ দেওয়া যায় না। এতে অনেকে সংক্ষুব্ধ হতে পারেন। আমরা সাংগঠনিকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছি পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ করার।’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনীত আর বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যেই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মুখে ভোটের পরিবেশ নিয়ে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী ইউনিয়ন এলাকাগুলোতে মানুষের মধ্যে শঙ্কা ও উদ্বেগের তৈরি হয়েছে; যদিও পরিস্থিতি উপলব্ধিতে নিয়েই সাংগঠনিকভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে আওয়ামী লীগ।

তবে সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে যে সহিংসতা চলছে সে তুলনায় বরিশাল সদরের চিত্র ভিন্ন। তবে কিছুটা উল্টো পরিস্থিতি বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জে। এ উপজেলার ভাসানচর ইউনিয়নে সহিংসতায় একজন কর্মী নিহত হয়েছেন। একইভাবে পাশের জেলা পটুয়াখালীর বাউফলে একজন খুন হয়েছে। এসব ঘটনা ঘটেছে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জের ধরে।

বরিশাল সদরের জাগুয়া ইউনিয়নের হোগলা গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আব্দুর রব মল্লিক বলেন, ‘খবরে দেখি বরিশালেই নাকি মারামারি-হানাহানি-খুনাখুনি চলছে। কিন্তু বরিশাল সদর উপজেলার কোনো ইউনিয়নে এমন কিছু দেখছি না। যা হচ্ছে বিভাগের অন্য জেলা ও উপজেলায়। এখানে যে যার মতো ভোট চাইছে। দুই দলই মাঠে আছে।’

এ ব্যাপারে জেলা বিএনপির সভাপতি এবায়েদুল হক বলেন, ‘আমাদের অবস্থা ভালোই আছে। প্রশাসনের লোকজন আমাদের বেশি সক্রিয় কর্মীদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করে। তা আমরা ওভারকাম করেই আমাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’

তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস বলেন, ‘কারো কোনো ভয়ভীতির কারণ নেই। ভোটাররা যাকে ভোট দিয়ে জেতাবেন তারাই জিতবে।’

রংপুরের সংঘাতের বদলে সংহতি, উৎসবের আমেজে প্রচার

রংপুর বিভাগীয় শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার পূর্বদিকে পীরগাছা উপজেলার একটি ইউনিয়ন কল্যাণী। নামের মতোই অর্থবহ এলাকা। নির্বাচনী হাওয়ার দোলা লেগেছে এখানকার প্রায় ১৭ হাজার ভোটারের প্রাণে। তবে কোনো সহিংসতা নেই, বরং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে চলছে সব দলের প্রচার। ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের সময় এ জনপদ জনবিস্ফোরণে উদ্বেলিত হয়েছিল।

যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পীরগাছা মন্থনার জমিদার দেবী চৌধুরানী ও ভবানী পাঠক। সেই জনপদে আজ চলছে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী প্রচার।

২২ মার্চ প্রথম পর্বের নির্বাচনে রংপুর জেলার একটিমাত্র ইউনিয়নেই ভোটগ্রহণ হবে। প্রায় ১৪ বছর পর এই ইউনিয়নে নির্বাচন হওয়ায় এলাকায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। দলীয় প্রতীকে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের চারজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটাররা বলছেন লড়াই হবে মূলত তিন প্রার্থীর মধ্যে।

কল্যাণী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদের প্রার্থীরা হলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত কল্যাণী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুর আলম, বিএনপি মনোনীত ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি জিকরুল আমিন, জাতীয় পার্টি মনোনীত ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল জলিল সরকার ও ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের আবু তাহের।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রার্থীদের মধ্যেও কোনো প্রতিহিংসা কিংবা কুৎসা রটনার মানসিকতা নেই। কর্মী-সমর্থকরা একসঙ্গে নিজেদের প্রার্থীদের জন্য ভোট প্রার্থনা করছে। হেঁটে, সাইকেল কিংবা মোটরসাইকেলে করে কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইছে। এই শান্তিপূর্ণ অবস্থার জন্য ভোটাররা স্থানীয় সংসদ সদস্য টিপু মুনশী ও উপজেলা চেয়ারম্যান আফছার আলীকে কৃতিত্ব দিতে চান। এ দুজনই এলাকাবাসীকে বলেছেন, ‘ভোটাররা যাঁকে চাইবে তিনিই ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন। এখানে সহিংসতা কিংবা ভোট কারচুপি হবে না।’     

গতকাল শুক্রবার কল্যাণী ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, ইউনিয়নের তালুক কল্যাণী, ছোট কল্যাণী, ফকিরা, তৈয়ব, স্বচাষ, বিহারী, বড় হাজরা, তালুক উপাসু, তালুক কচুয়া, ফতা, আবু হাজরা, হরগোবিন্দ, তালুক পশুয়া, খামার উপাসু এলাকায় উৎসবের আমেজ চলছে। প্রচারের শেষ বেলায় এসে প্রার্থীদের দম ফেলার সময় নেই। কর্মী-সমর্থকরা নিজেদের প্রার্থীর পক্ষে ভোট চেয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরছে।

কর্মী-সমর্থক ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে মূলত আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। তবে প্রার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটাররা বলছেন, সারা দেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণে কল্যাণীই হবে একটি মডেল। নিজেদের মধ্যে তো নয়ই, বহিরাগত কেউ সহিংসতার ঘটনা ঘটালে সংঘবদ্ধ এলাকাবাসী তা প্রতিহত করবে। এখন পর্যন্ত কোনো প্রার্থীরই দলীয় প্রভাব নেই উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, ভোটাররা যাঁকে চাইবেন তিনিই হবেন কল্যাণী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান।

একাধিক ভোটার জানান, উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচার চলছে। তবে এলাকায় বর্তমানে কৃষিকাজের মৌসুম হওয়ায় আলু তোলা এবং বোরো ধানের চাষ নিয়ে অধিকাংশ মানুষ ব্যস্ত। এ ব্যস্ততার মধ্যেও ইউনিয়নবাসী দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে খুব গুরুত্ব দিচ্ছে। সবাই কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেবে।

স্বচাষ এলাকার পল্লী চিকিৎসক কর্ণধর বর্ম্মণের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বড় দরগা বাজারে। তিনি জানান, রংপুর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সীমানা নির্ধারণ জটিলতার কারণে ১৪ বছর পর এই ইউনিয়নে নির্বাচন হচ্ছে। সে কারণে ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ বিরাজ করছে। ১৭ হাজার ভোটারের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন হাজার হিন্দু ভোটার আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখানে রাজনৈতিক বিষয়ের চেয়ে আঞ্চলিকতার বিষয়টি বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। এখানে স্থানীয়, ভাটিয়া (যাদের আদিনিবাস পাবনা, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ ও বগুড়া) ও নোয়াখালী (যাদের আদিনিবাস নোয়াখালী অঞ্চলে) গ্রুপ আছে। বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী স্থানীয় গ্রুপের হলেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী নোয়াখালী গ্রুপের। তবে তিন প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলেও জানান তিনি।

নব্দীগঞ্জ বাজারে মদন মোহন্তের চায়ের দোকানে কথা হয় কয়েকজন ভোটারের সঙ্গে। ১ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার শাহ আলম, মোফাজ্জল হোসেন ও আব্দুল জলিল বলেন, ‘ভোটের আর দুই দিন বাকি। এ্যালাও (এখনো) আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির তিন প্রার্থী সমানে সমান। কায় (কে) হইবে বলা মুশকিল।’ তবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হলেও তাদের নিজেদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই। প্রতিদিন প্রচার শেষে নব্দীগঞ্জ বাজারে তিন প্রার্থীই কুশল বিনিময় করেন বলে জানান সেখানকার ভোটাররা। বিএনপি প্রার্থী জিকরুল আমিন বুধবার রাতে প্রচারকালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে রংপুর মেডিক্যালে আছেন বলে জানা গেছে। তবে তাঁর কর্মী-সমর্থকরা রাত-দিন মাঠে রয়েছে।

ছোট কল্যাণী এলাকার আজাদ খান বলেন, ‘এখানে ভোট নিয়ে সহিংসতার আশঙ্কা নেই। বিগত ভোটের সময়ও এ ধরনের নজির চোখে পড়েনি। যার কারণে এলাকাবাসী এ ধরনের ঘটনা ঘটলে নিজেরা ঠেকাবে।’ নির্বাচনে প্রশাসনের কোনো হস্তক্ষেপ নেই উল্লেখ করে তিনি জানান, বিএনপির পীরগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান আফছার আলী ও আওয়ামী লীগের এমপি (পীরগাছা-কাউনিয়া) টিপু মুনশী ঘোষণা দিয়েছেন এখানে কোনো বল প্রয়োগ হবে না। ভোটাররা যাঁকে ভোট দেবেন তিনিই নির্বাচিত হবেন। জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী আব্দুল জলিল সরকার বলেন, ‘বিভিন্ন দলের প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করলেও আমাদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ মনোভাব রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনে এখানে কোনো সহিংস ঘটনা ঘটেনি। এবারও ঘটবে না। ভোটারের ভোটে যে প্রার্থীই জয়লাভ করুক, তাতে আমার কোনো আপত্তি থাকবে না।’

আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী নূর আলম বলেন, ‘কল্যাণী ইউনিয়নে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হবে। এখানে নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ নেই। কালো টাকা কিংবা সন্ত্রাসীদের কোনো স্থান নেই। এখানে সব দলের প্রার্থী চান সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচন হোক।’

বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জিকরুল আমিন বলেন, ‘এই ইউনিয়নে প্রায় ১৪ বছর পর নির্বাচন হচ্ছে। সাধারণ মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো চাপ পাওয়া যাচ্ছে না। আশা করি, কল্যাণী ইউনিয়নের নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে হবে।’

জেলা নির্বাচন অফিসার জি এম সাহাতাব উদ্দিন বলেন, ‘কল্যাণী ইউনিয়নের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ ইউনিয়নের মানুষ অত্যন্ত শান্তিপ্রিয়। অতীতের মতো এবারও সেখানে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে না বলে আমরা আশা করছি।

সূত্র- কালের কণ্ঠ

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

 

 

 

উপরে