আপডেট : ১৩ মার্চ, ২০১৬ ১১:৫৩

জীবনানন্দ দাশের ধানসিঁড়ি নদী আজ মরা খাল

বিডিটাইমস ডেস্ক
জীবনানন্দ দাশের ধানসিঁড়ি নদী আজ মরা খাল

‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে-এই বাংলায়/ হয়তো মানুষ নয়- হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে/ হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে,...। রূপসী বাংলার কবিখ্যাত জীবনানন্দ দাশের সেই ধানসিঁড়ি নদী আজ মরা খাল। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ধানসিঁড়ির যৌবন হারিয়েছে অনেক আগেই। এখন মৃতপ্রায়। খননের অভাবে ভরাট হয়ে গেছে অধিকাংশ স্থান। ভূমিদস্যুরা ইতোমধ্যে কোনো কোনো স্থান দখল করে চাষাবাদ করছে, এমনকি বাড়ি তুলে বাস করছে। আর পলি জমে শুকিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকা। শুকনো মওসুমে কোনো কোনো স্থানে জুতা পায়েই পার হওয়া যায় ধানসিঁড়ি।
রাজাপুর ডিগ্রি কলেজের প্রফেসর সোহরাব হোসেন বলেছেন, এই ধানসিঁড়ির তীরে বসেই এক সময় কবিতা লিখতেন জীবনানন্দ। জীবনানন্দের বিখ্যাত অনেক কবিতায়ই ধানসিঁড়ির কথা উল্লেখ রয়েছে।
ঝালকাঠি জেলা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটি হলো সুগন্ধা। উত্তর-দণি দিকে প্রবাহিত বিষখালী নদীটি দণি-পশ্চিমে কাঁঠালিয়া, বরগুনার দিকে বয়ে গেছে। আবার উত্তর-পশ্চিম দিকে কাউখালী, পিরোজপুরের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে গাবখান নদীটি। এই সুগন্ধা-বিষখালী আর গাবখানের মুখোমুখি সংযোগস্থল থেকেই ধানসিঁড়ি নদীর শুরু। ঝালকাঠি জেলার গাবখান ইউনিয়নের বৈদারাপুর গ্রাম থেকে ধানসিঁড়ির যাত্রা শুরু। বৈদারাপুর থেকে ধানসিঁড়ি বয়ে গেছে ছত্রকান্দা গ্রাম হয়ে পিংড়ি, হাইলাকাঠি ও মঠবাড়ী এবং শুক্তাগড় ইউনিয়নের কোল ঘেঁষে রাজাপুর থানা সদর হয়ে ধানসিঁড়ি মিশেছে জাঙ্গালিয়া নদীতে। বাঘড়িরহাট পর্যন্ত যার শেষ সীমানা। তিন দশক আগেও এই ধানসিঁড়িটিই ছিল রাজাপুরের সাথে ঝালকাঠির একমাত্র সংযোগসূত্র। এই নৌপথে রাজাপুরের লোকজন তখন ঝালকাঠি বা বরিশাল যেত।
বাঘড়ির বাসিন্দা কাজেম আলী বলেন, এক সময় এই নদী দিয়ে বড় বড় লঞ্চ চলত। দুই দশক আগেও ছোট লঞ্চ আর ট্রলার চলতে দেখেছেন তারা। অথচ এখন নৌকাও চলে না। তিনি বলেন, মানুষ এক সময় ঝালকাঠি যেত, বরিশাল যেত এই ধানসিঁড়ি হয়ে। বড়বড় গয়না নৌকায় চড়ে লোকজন যেত শহরে। সময়ের বিবর্তনে নদীপথের প্রয়োজনীয়তা অনেকটা যেমন কমেছে, তেমনি যাতায়াতের ক্ষেত্রে ধানসিঁড়িরও গুরুত্ব হারিয়েছে।
জীবনানন্দের কবিতার সূত্র ধরে এখনো অনেকের আগ্রহ একনজর এই নদীকে দেখার। দেশ-বিদেশের বহু মানুষ এখনো আসেন ধানসিঁড়িকে দেখতে। তারা হতাশ হয়ে ফিরে যান। কেন না নৌকা নিয়ে ঘুরে ধানসিঁড়ি দেখার কোনোই সুযোগ নেই।
ঝালকাঠির পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, সর্বশেষ ২০১০-১১ অর্থবছরে প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে ধানসিঁড়ি নদীর উৎস মুখ থেকে সাড়ে সাত কিলোমিটার পশ্চিমে খননের একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। ওই সময় সাড়ে চার কিলোমিটার খনন করা হয়েছিল। নিয়মিত বরাদ্দ না দেয়ায় পরের সাড়ে তিন কিলোমিটার আর খনন করা হয়নি। প্রায় আট কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ধানসিঁড়ি নদীর রাজাপুর অংশের অবস্থা বড়ই করুণ বলে পানি উন্নয়ন বোর্ডই স্বীকার করেছে। অনেকে দখল করে সেখানে স্থাপনা গড়ে তোলার বিষয়টিও পানি উন্নয়ন বোর্ড অবগত আছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে রাজাপুর অংশের পিংড়ি-বাঘড়ি-বাঁশতলার মোহনা পর্যন্ত খনন করা হয়েছিল। কিন্তু উৎস মুখ ভরাট হওয়ায় নদীর ওই অংশ আবারো ভরাট হয়ে গেছে। সর্বত্র কচুরিপানা আটকে আছে।
আর ওই সময় নদী খননের যে কাজ হয়েছে তাতেও কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ আছে। তৎকালীন ঠিকাদার শুধু নদীর দুই পাশ ছেঁটে টাকা তুলে নিয়েছেন। নদীর তলদেশে পড়ে থাকা পলি সরানোর কোনো কাজ হয়নি। সে সময় ভরা মওসুম হওয়ায় কারচুপি করাটাও সহজ হয়। স্থানীয় এক ইউপি চেয়ারম্যান বলেছেন, মঠবাড়ি ইউনিয়নের মধ্যে ধানসিঁড়ি নদীর প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এ নদীর অবস্থা এতটাই করুণ যে নৌকা চলাচলও করতে পারছে না। খননের সময় রাজাপুর অংশেরও অর্ধেক খননের কারণে খননকৃত অংশ দ্রুত ভরে গেছে।
এ দিকে নদীটি ভরাট হয়ে যাওয়ায় এলাকার যাতায়াত, কৃষি, মৎস্য আহরণ ও পরিবেশগত নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়ে চলছে। মোকাম্মেল নামে এক কৃষক বলেছেন, শীত মওসুমে একেবারেই পানিশূন্যতায় তারা সমস্যায় পড়েন। পানি স্বল্পতার কারণে নদীর পানি তারা ব্যবহার করতে পারেন না। জহির নামে এক মৎস্যজীবী বলেন, এক সময় এই নদীতে মাছ ধরেই তাদের জীবিকা নির্বাহ হতো। প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এখন আর মাছ নেই। সারা দিন মাছ ধরেও এক বেলার মাছও মেলে না।
বাঘড়ির বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম তোতা বলেন, নদী একেবারেই ভরে গেছে। তিনি বলেন, নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে নদী এখন নদী নেই। কোনো নৌযান এখন আর এই নদী দিয়ে চলে না। মাছ নেই বললেই চলে। অচিরেই দখলমুক্ত করে নদী খনন না করলে ধানসিঁড়ির কোনো অস্তিত্বই থাকবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গুচ্ছগ্রাম আর আশ্রয়ণ ধানসিঁড়ির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখা গেছে গুচ্ছগ্রাম ও আশ্রয়ণে একজন ভূমিহীনকে জমি বা ঘর দেয়া হয়েছে। সেই ভূমিহীন এখন আশপাশের নদীর জমি ভরাট করে নিজের মালিকানা বাড়িয়েছে। ফলে হুমকিতে পড়েছে ধানসিঁড়ি।
ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক মিজানুল হক চৌধুরী গতকাল বলেছেন, নদীটি খননের জন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দফতরকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমি নিজেও দেখে এসেছি, নদীটি ভরাট হয়ে গেছে।

‘হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে/ তুমি আর কেঁদোনাকো উড়ে উড়ে ধানসিঁড়ি নদীটির পাশে!/ তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে।’ নদীই যেখানে হারিয়ে যাচ্ছে সেখানে কোত্থেকে আসবে সোনালি ডানার চিল? স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন জীবনানন্দের এই ধানসিঁড়ি মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে নাতো? কবিতায় আর বইয়ের পাতায়ই কি টিকে থাকবে ধানসিঁড়ি, না বাস্তবেও বাঁচবে সে?

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

উপরে