আপডেট : ২৯ জানুয়ারী, ২০১৬ ২০:৪৩

প্রতিবন্ধী নারীদের গণতন্ত্র চর্চা: কথিত মূলধারার শেখার আছে অনেক কিছুই

এ্যাড. রেজাউল করিম সিদ্দিকী, জ্যেষ্ঠ গবেষক, ব্লাস্ট
প্রতিবন্ধী নারীদের গণতন্ত্র চর্চা:  কথিত মূলধারার শেখার আছে অনেক কিছুই

২৭ জানুয়ারি ২০১৬, বুধবার। সময় সকাল ১০টা। নাটোর জেলা প্রতিবন্ধী সংস্থা  ‘নন্দন’ এর কার্যালয়ের সামনে একঝাঁক প্রতিবন্ধী নারীর জটলা। সকলের চেহারায় দারিদ্রের ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু মনে-মননে-ব্যক্তিত্বে অনন্য উচ্চতায় তাঁরা সকলেই। তীব্র শীতের মিষ্টি রোদে ছোট ছোট দলে তুমুল আলোচনা চলছে। সাদা-ছড়ি, হুইল-চেয়ার ব্যবহারকারীদের অবাধ বিচরন এদিক-ওদিক। কার্যালয়ের সামনে টাঙ্গিয়ে রাখা ব্যানারের লিখা পড়ে বোঝা গেল এই গণজমায়েতের কারণ। ডিজিটাল প্রিন্টেট ব্যানারে বড় বড় অক্ষরে লিখা ছিল “প্রতিবন্ধী নারীদের জাতীয় পরিষদ নির্বাচন-২০১৬”। হ্যাঁ, প্রতিবন্ধী নারীদের জাতীয় পরিষদের কার্যনির্বাহী পরিষদ নির্বাচনের ভোট গ্রহন উপলক্ষ্যে গোটা দেশের ২৩টি জেলা থেকে ৩৮ জন প্রতিবন্ধী নারী নেতৃবৃন্দ নাটোরে সমবেত হয়েছেন নিজেদের মধ্য থেকে সবচেয়ে যোগ্য ও জনপ্রিয় নেতৃদের বেছে নিতে, যারা প্রতিবন্ধী নারীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন আগামী তিন বছর।

এ নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছিল প্রায় দেড় মাস ধরে। আগের কার্যনির্বাহী পরিষদ পদত্যাগ করে ১২ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তিন সদস্যবিশিষ্ট তত্মাবধায়ক কমিটির নিকট। এ কমিটি তিন সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচন কমিশন গঠন করেন নির্বাচন পরিচালনার জন্য। প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় আমাকে। আমার সঙ্গে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এডিডি ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা আজিজ আহমেদ রোমেল এবং জাতীয় তৃণমূল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংস্থার আইন সম্পাদক মো. বশির আল হোসাইন। দায়িত্ব পেয়ে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫ তারিখ অনুষ্ঠিত হয় নির্বাচন কমিশনের প্রথম সভা। শুরুতেই আমরা সংস্থার গঠনতন্ত্রের সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরী করি বিস্তৃত নির্বাচনী নীতিমালা। এরপর প্রত্যেক জেলায় প্রতিবন্ধী নারীদের সংস্থা সমূহের তালিকা, এসকল সংস্থার সদস্যদের তালিকা, বাৎসরিক চাঁদা আদায় সহ বিভিন্ন তথ্যাদি হাল-নাগাদ করা হয়। গঠনতন্ত্র মোতাবেক একটি জেলায় মোট সদস্যের সংখ্যা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কোন জেলা থেকে কতজন কাউন্সিলর ভোট দিতে পারবেন তা নির্ভর করে এই সদস্য সংখ্যার উপর। সদস্য সংখ্যা ১৯৯ পর্যন্ত হলে একজন ২০০ থেকে ৪৯৯ পর্যন্ত হলে দু’জন এবং ৫০০ থেকে তদোর্ধ্ব হলে সর্বোচ্চ তিনজন কাউন্সিলর ভোট দিতে পারবেন জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে। জেলা ভিত্তিক কাউন্সিলর নির্বচনের পদ্ধতিও খুব ইন্টারেস্টিং! প্রথমে ইউনিয়নের প্রতিবন্ধী নারীগণ দু’জন প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। এই পর্যায়ে বিজয়ী না হলে জাতীয় পর্যায়ে ভোট দেবার বা ভোটে দাঁড়ানোর কোন সুযোগ নেই। তাই তৃণমূলের এই নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। এরপর ইউনিয়ন পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা জেলা কাউন্সিল নির্বাচনে অংশগ্রহন করেন। এ সময় তারা নিজ নিজ জেলার মোট সদস্য সংখ্যার আনুপাতিক হারে এক, দুই বা তিনজন কাউন্সিলর নির্বাচন করেন জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে জেলার প্রতিনিধি হিসেবে ভোট প্রদান বা ভোটপ্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণের জন্য। নির্বাচনী তফসিল অনুযায়ী ২০ থেকে ২৩ জানুয়ারি তারিখে ২৩ টি জেলায় ১১১টি প্রতিবন্ধী নারীদের সংগঠনের মোট ৬৬৯২ জন সদস্য ইউনিয়ন ও জেলা পর্যায়ে নির্বাচনের মাধ্যমে মোট ৩৯ জন কাউন্সিলর নির্বাচন করেন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এই ৩৯ জন হলেন সংস্থার সাধারন পরিষদের সদস্য। সাধারন পরিষদের এই ৩৯ জনের ৩৮ জন-ই নাটোরে সমবেত হয়েছিলেন সভাপতি-সেক্রেটারিসহ মোট নয় সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় নির্বাহী পরিষদ গঠনের নির্বাচনে অংশ নিতে। নীতিমালা অনুযায়ী বিভিন্ন জেলায় মোট ২৩ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এরা সবাই প্রতিবন্ধী নারী। এই রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সহায়তায় ধাপে ধাপে তৃণমূল পর্যায়ের নির্বাচনগুলো সম্পন্ন করা হয়।

নির্বাচনের জন্য কোন বড় বাজেট নেই নারী পরিষদের। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কেবল ফোন বা স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের জন্য জেলার সদস্য সংখ্যার অনুপাতে সর্বনিন্ম ৩৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৯৫০ টাকা দিতে পেরেছিল নির্বাচন কমিশন, যদিও এই টাকার চেয়ে অনেক বেশি টাকা নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয়েছিল প্রত্যেক রিটার্নিং কর্মকর্তাকে। একইভাবে যারা দুরদুরান্ত থেকে নাটোরে ভোট দিতে এসেছিলেন তাঁদের জন প্রতি ৩৫০ টাকা করে টোকেন মানি দেয়া হয়েছিল। এই টাকা দিয়ে হয়তো নিজেদের খাবার খরচ হয়েছিল কাউন্সিলরদেরও, যাতায়াত ও থাকার খরচ নিজেদের গাঁট থেকে দিতে হয়েছে। টাকা বাঁচাতে কনকনে শীতে নাটোর প্রতিবন্ধী সংস্থার কার্যালয়ের মেঝেতে অনেক কষ্টে জড়াজড়ি করে রাত কাটিয়েছেন অনেকে।

২৭ তারিখ সকাল ১১টার মধ্যে মনোনয়ন জমা, গ্রহণ ও বাছাই শেষ করা হল। অর্থ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক এবং এ্যাডভোকেসি ও মিডিয়া সম্পাদক পদে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় বিজয়ী হলেন রেবেকা আক্তার রিতা (বগুড়া), সোহানা পারভীন টিপি (কুষ্টিয়া) ও রাত্রী সুলতানা (রাজবাড়ী)। এঁরা তিনজনই শারীরীক প্রতিবন্ধী নারী। দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ করা হল লটারির মাধ্যমে। জাতীয় কার্যনির্বাহী পরিষদে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী এবং বুদ্ধি প্রতিবন্ধীদের  প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে কার্যনির্বাহী পরিষদের নির্বাহী সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে বিশেষ প্রক্রিয়ায় লটারির মাধ্যমে বেছে নেয়া হল তিনজন বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী এবং তিনজন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী নারীকে। প্রচারনার সময় মাত্র ঘন্টা তিনেক। এর মধ্যেই প্রার্থীরা পোস্টার ছাপিয়ে প্রচারনা চালালেন। সেকি উৎসাহ তাঁদের। আগেই বলেছি ভোটারদের কারোর আর্থিক অবস্থাই ভাল না। দু’বেলা খাবার যোগাতেই অনেকে হিমশিম খান। কিন্তু তাতে কি? অধিকার আদায়ের আন্দোলনের রসদ যোগাতে কি আর বসে থাকা যায়? ইতিমধ্যে নাটোর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান নির্বাচনী কার্যক্রম পরিদর্শন করলেন দু’দফা। তাঁর আগ্রহের শেষ নেই। নিজের স্টেশনে দেশের এক তৃতীয়াংশ জেলা থেকে আগত নারী প্রতিবন্ধীদের গণতান্ত্রিক চর্চা দেখে তিনি অভিভূত! ভোটারদের সাথে নিজের ক্যামেরায় ছবি তুলে নিলেন। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুবিধার্থে নাটোর জেলা প্রতিবন্ধী কার্যালয়ে একটি ক্যাম্প স্থাপন করে দেবার প্রতিশ্রুতিও দিয়ে গেলেন। স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর, উপজেলা প্রকৌশলী, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাসহ অনেকেই আসলেন। একজন কলেজ শিক্ষক ও একজন স্কুল শিক্ষক নামমাত্র সম্মানিতে পালন করলেন প্রিজাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তার দায়িত্ব। কাউন্সিলরদের মধ্যেই কয়েকজন হয়ে গেলেন পোলিং এজেন্ট। চারদিকে নির্বাচনী আমেজ ও টানটান উত্তেজনায় ভোট গ্রহণ শেষ হল। রুদ্ধদ্বার কক্ষে প্রার্থীদের এজেন্টদের সামনে ভোট গণনা করা হল। নিয়মানুযায়ী তৈরী করা হল রেজাল্ট শিট। ফলাফলের জন্য বাইরে প্রবল উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছিলেন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকবৃন্দ। অবশেষে এল নেই মাহেন্দ্রক্ষণ!

কার্যনির্বাহী পরিষদের সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক পদে পুন:নির্বাচিত হলেন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী নাছিমা আক্তার (রংপুর) এবং শারীরীক প্রতিবন্ধী সাজেদা আখতার (ফরিদপুর)। সহ-সভাপতি ও আইন সম্পাদক হিসেবে বিজয়ী হলেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সামিরা খাতুন (রাজশাহী) এবং হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী জুলেখা আক্তার জলি (নাটোর)। সংরক্ষিত আসন থেকে নির্বাহী সদস্য হিসেবে বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী রিতু (জয়পুরহাট) এবং বুদ্ধী প্রতিবন্ধী মনোয়ারা (জয়পুরহাট) বিজয়ী হলেন।

উল্লেখ্য প্রতিবন্ধী নারীদের জাতীয় পরিষদ প্রতিবন্ধী নারীদের দ্বারা গঠিত ও পরিচালিত সংস্থা সমূহের জাতীয় মোর্চা। এটি প্রতিবন্ধী নারীদের অধিকার বাস্তবায়নের জন্য ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন কার্যাবলী পরিচালনা করে আসছে। তৃণমূল থেকে প্রতিবন্ধী নারীদের সংগঠিত করা, অধিকার সচেতন করা, প্রতিবন্ধী নারীদের ক্ষমতায়ন, সেলাই সহ নানান প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান, আইনী সেবা প্রদান, জনস্বার্থ মামলা করা, সরকারের সাথে লবিং ও এ্যাডভোকেসি সহ বিভিন্ন কাজে সংস্থাটি সম্পৃক্ত রয়েছে। সদস্যদের চাঁদা, স্থানীয় দাতাদের দান ও অল্প-স্বল্প বিদেশী ডোনেশনে সংস্থার ব্যয় নির্বাহ করা হয়।

প্রতিবন্ধী নারীদের এ নির্বাচন থেকে আমাদের জাতীয় রাজনীতিকসহ মূলধারার জনগোষ্ঠীর শেখার আছে অনেক কিছুই। আমাদের জাতীয় নির্বাচনে কত টাকার লেনদেন হয়, ভোটার ও পদপ্রার্থী কেনা-বেচার কত কথাই না আমরা শুনি। অথচ দেখুন নাটোরের নির্বাচন আমাদের কি শিক্ষা দিয়ে গেল? যে মানুষরা দিনে দু’বেলা খাবার সংস্থান করতে হিমশিম খান, সেই মানুষরা কেবল অধিকার আদায়ের আন্দেলনকে বেগবান করতে নিজের গাঁটের পয়সা ভেঙ্গে কত কষ্ট করে নির্বাচন করে পেলেন নিজেদের ভবিষ্যত নেতৃত্ব। সংস্থার সোনার খণি নেই, তাই ভাগ-বাটোয়ারা করে খাবার লক্ষ্যে কেউ এখানে নির্বাচিত হন না। এখানে সবাই একাট্টা প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে।

বিনা স্বার্থে প্রো-বোনো সার্ভিস হিসেবে এই প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য কিছু করতে পেরে আমি আনন্দিত। ঈদের সময়ও আমি সাধারনত ছুটি নেই না, কিন্তু ওনাদের জন্য সারাদিন অফিস করে, রাত ও ছুটির দিনগুলো উৎসর্গ করেছি দেড় মাসেরও বেশি সময়, ঢাকা থেকে নাটোর গিয়ে নির্বাচনী কার্য সম্পাদন করতে দু’দিন ছুটি কাটিয়েছি।প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এভাবেই জড়িয়ে থাকতে চাই বাকি জীবন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে প্রথমবারেরমত একটি নির্বাচন পরিচালনার কাজ সম্পাদনে আমার উপর আস্থা রাখায় সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ। এটি ছিল উত্তেজনাকর ও শ্বাসরুদ্ধকর এক নতুন অভিজ্ঞতা!

 

উপরে