আপডেট : ২ জুন, ২০১৯ ১২:২৭

কোন পথে হাঁটছে জামায়াত?

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
কোন পথে হাঁটছে জামায়াত?

জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ, ইসলামী আদর্শ অনুযায়ী পরিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করার নীতিতে বিশ্বাসী একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল। বিশ শতকের ত্রিশের দশকের গোড়া থেকেই অবিভক্ত ভারতে ইসলামী আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদীর নেতৃত্বে একটি রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৪১ সালের ২৫ আগস্ট লাহোরে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর আত্মপ্রকাশ ঘটে। আবুল আ’লা মওদুদী এ দলের আমীর নির্বাচিত হন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে এবং পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনীর সাথে হাত মেলায় এবং তাদের সহযোগী শক্তি হিসেবে বিভিন্ন নামে বাহিনী গঠন করে বাংলাদেশে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৩৮ ধারা অনুসারে সাম্প্রদায়িকতা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ হলে রাজনৈতিক দল হিসাবে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়।

জামায়াতে ইসলামী নামের রাজনৈতিক দলটি নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল না। বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনীতিও করার কথা নয়। এই দলটি বাংলাদেশ চায়নি। তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। অস্ত্র হাতে পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে বাঙালির বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে। এরা ঘাতক, এরা দালাল।

পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর এরাও গর্তে লুকিয়েছিল। ছিল সময়ের, সুযোগের অপেক্ষায়। তারা সুযোগ পায় বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় বসার পর। জামায়াত নেতা গোলাম আযম মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের আগ মুহূর্তে পাকিস্তান চলে যান। পাকিস্তানে থেকেও তিনি বাংলাদেশবিরোধী প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রাখেন। জিয়া গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। জামায়াতকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন। আওয়ামী লীগকে জব্দ করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়েই জিয়া গোলাম আযম ও জামায়াত নিয়ে কৌশলের রাজনীতি করেছিলেন। কিন্তু তার এই অপকৌশল আত্মঘাতী হয়ে উঠেছে দেশের জন্য, রাজনীতির জন্য।

অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার হলো, একাত্তরের এই ঘাতক-দালালরা এখন অনেক শক্তিশালী। তারা দেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছে। তাদের আর্থিক মেরুদণ্ড অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল। তারা রাজনীতিতে আছে। তাদের নিয়ে রাজনীতি আছে।

সম্প্রতি জামায়াত থেকে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগ ও শুরা সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জুকে বহিষ্কার এবং পরবর্তীতে মঞ্জুর ‘জন আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ’ নামে নতুন দল গঠনের ঘোষণায় জামায়াতের রাজনীতি নিয়ে হঠাৎ তোলপাড় শুরু হয়েছে। সর্বত্রই এখন আলোচনায় জামায়াত। দলটি কি আবার নাম পরিবর্তন করছে; নাকি দুইভাগে বিভক্ত হচ্ছে? দলটি কী অতীত ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাইবে? নাকি রাজনীতিতে নতুন কিছু ঘটতে যাচ্ছে? দলটি নিয়ে চলছে এমন হাজারো প্রশ্ন, আলোচনা-বিতর্ক।

সংস্কারের দাবি জানিয়ে জামায়াত থেকে বহিষ্কার হওয়া ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মঞ্জুর নেতৃত্বে নতুন দল গঠনের উদ্যোগ প্রকাশ্যে আসায় বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়েছে জামায়াত। প্রশ্ন উঠেছে, সংস্কারপন্থিরা এ উদ্যোগে শামিল হবেন কি-না। ধারণা করা হচ্ছে জামায়াত-শিবিরের একটা বড় অংশ মঞ্জুর নতুন দলে যোগ দিতে পারেন। বিশেষ করে দলের যেসব তরুণ নেতা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের দায় নিতে চান না, তারা ও তাদের অনুসারীরা মঞ্জুর নতুন রাজনৈতিক দলে থাকছেন। এর মধ্যে একটি বড় অংশ থাকবেন ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা। এমনকি বিভিন্ন সময় আদর্শের দ্বন্দ্বে দল থেকে বহিষ্কার হওয়া ও দলে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় নেতাদের নতুন দলে যোগ দেওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

দলের অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে নতুন নামে যাত্রা? একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে সামগ্রিক পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে নতুন রাজনীতির সূচনা? নাকি বিদ্যমান অবস্থানে থেকেই পরিস্থিতি মোকাবেলা- এ নিয়ে দলটির নীতিনির্ধারকদের মতবিরোধ তীব্র হয়ে উঠে। এরই জের ধরে পদত্যাগ করেছেন ব্যারিস্টার রাজ্জাক- যা দলটির ভেতরে আলোচনায় নতুন মাত্রা পেয়েছে। জামায়াতের ভেতরে চলমান ঘটনাবলি দলটিকে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দেয়ার মধ্যেই সীমিত থাকবে, নাকি পুরো রাজনীতিতে ওলটপালট ঘটাবে। এ নিয়ে দলের ভেতের-বাইরে চলছে আলোচনা। কৌতুহলী নজর রাখছেন দেশের সচেতন মহলও।

দলের আমির মকবুল আহমেদের কাছে পাঠানো পদত্যাগ পত্রে ব্যারিস্টার রাজ্জাক দু'টি বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন৷ আর তা হলো, জামায়াতের সংস্কার এবং মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে তাদের অবস্থান৷ তিনি বলেছেন, “১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভূমিকা এবং পাকিস্তান সমর্থনের কারণ উল্লেখ করে জামায়াতকে জাতির কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া উচিত৷”

জামায়াতের সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা একটা দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে বসবাস করি৷ পশ্চিম বিশ্বে অনেক দেশেই আছে তিউনিসিয়া, তুরস্ক, মরক্কো- এইসব দেশে ইসলামি আন্দোলনের অনেক পরিবর্তন হয়েছে৷ ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার যে চিন্তা তার মধ্যে পরিবর্তন আনতে হবে৷ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ইসলামি মুভমেন্টের যে পরিবর্তন হয়েছে সেটাকেই জামায়াতের সামনে নিয়ে আসা উচিৎ বলে আমি মনে করি৷''

অপরদিকে জামায়াত থেকে বহিস্কৃত নেতা শিবিবের সাবেক সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জু জার্মান গণমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ এবং সংস্কার প্রশ্নে জামায়াতে বিভক্তি আছে৷ আমি মনে করি, তরুণসহ ৬০ ভাগ জামায়াত সদস্য মনে করে, একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতের ক্ষমা চাওয়া উচিৎ৷ তারা সংস্কারও চান৷ জামায়াত যদি এখন না করে তাহলে একসময়ে এটা করতে বাধ্য হবে৷”

যদিও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, মঞ্জুর নেতৃত্বে যে দল গঠন হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে তারা চিন্তিত নন। প্রত্যেকের দল গঠনের অধিকার রয়েছে। মঞ্জুর নতুন দলকে তিনি সেই দৃষ্টিতেই দেখছেন। জামায়াতে সংস্কারপন্থি বলে কিছু নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

১৯৭৯ সাল থেকেই জামায়াতে সংস্কারবাদী ও রক্ষণশীলদের বিরোধ। তবে রক্ষণশীলরা বরাবরই শক্তিশালী। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াতের ভরাডুবির পর ফের আলোচনায় আসে সংস্কার। কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী, আবদুর রাজ্জাকসহ তরুণ নেতারা সংস্কারের প্রস্তাব দেন। কিন্তু মতিউর রহমান নিজামীসহ রক্ষণশীল নেতাদের বাধায় তা কার্যকর হয়নি। ২০১১ সালে যুদ্ধাপরাধের বিচারে জামায়াত কোণঠাসা হয়ে পড়লে সংস্কারের আলোচনা আড়ালে চলে যায়। তবে সংবাদপত্রে কলাম লিখে সংস্কারের পক্ষে-বিপক্ষে লড়াই অব্যাহত থাকে। আবদুর রাজ্জাকসহ কয়েকজন ২০১৬ সালে প্রসঙ্গটি ফের তুললেও, তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পালে হাওয়া পায়নি।

গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর ফের আলোচনায় আসে জামায়াতে সংস্কার। ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত তিনবার নিষিদ্ধ হয় জামায়াত। এর মধ্যে ১৯৫৯ ও ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তানে এবং ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান প্রতিষ্ঠার পর অন্য সব ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে জামায়াতও নিষিদ্ধ হয়। সাত বছর পর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৯ সালের ২৫ মে আবার প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগ পায় জামায়াত।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে