আপডেট : ২১ মে, ২০১৯ ১৯:৫২

বগুড়ার উপ-নির্বাচন নিয়ে বিএনপির 'রসিকতা'

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
বগুড়ার উপ-নির্বাচন নিয়ে বিএনপির 'রসিকতা'

বগুড়ায় জয়ী আসন ছেড়ে দিয়ে আবার সেই আসনেই উপ-নির্বাচনে অংশগ্রহণ। এবারও যদি ওই আসনে জিতে যায় তাহলেও কি সংসদে না যেয়ে আবার আসন শূন্য করে নির্বাচনের পথে হাঁটবে বিএনপি। এভাবে যদি আসন ছাড়া আর নির্বাচনের খেলা অনন্ত কাল ধরে চলে তাহলে কেমন হয়? বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে বিএনপির এ কেমন রসিকতা!

একটা নির্বাচন আয়োজন করতে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনে কমিশনের খরচ হয়েছে এক হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ আসন প্রতি খরচ হয়েছে কমবেশি ৬ কোটি টাকা। দশম সংসদ নির্বাচনে অঙ্কটা ছিল ১ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশের মতো দেশের পক্ষে বারবার এই ধরণের অনর্থক নির্বাচনের আয়োজন করা বিপুল অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। নির্বাচনে ব্যয় হওয়া টাকাগুলো এই দেশের খেটে খাওয়া জনগণের। এ বিষয়টাও নির্বাচনী রসিকতার সময় বিএনপি'র মাথায় থাকা উচিত।

নানা নাটকীয়তার পর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি তথা ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিতরা শপথ নিলেও শেষ অবধি দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ নেননি। তার শপথ না নেওয়াকে ‘রাজনৈতিক কৌশল’ হিসেবে অভিহিত করেন দলটির মহাসচিব নিজেই। নিয়মানুযায়ী নির্বাচন কমিশন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বগুড়া-৬ (সদর) আসন শূন্য ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি উপ-নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২৩ মে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষদিন, ২৭ মে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই, ৩ জুন প্রার্থিতা প্রত্যাহার ও ২৪ জুন ভোট অনুষ্ঠিত হবে।

রহস্যজনকভাবে নিজেদের ছেড়ে দেওয়া আসনে আবার নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। তবে আসন ছেড়ে দিয়ে আবার নির্বাচন করার ঘোষণাকে ভালো চোখে দেখছে না দলটির নেতাকর্মী ও সাধারণ জনগণ। দলের মধ্যে এমন কথাও হচ্ছে আসন ছেড়ে দিয়ে আবার সেই আসনে নির্বাচন করার যৌক্তিকতা কী?

বিএনপি এটাকে ‘রাজনৈতিক কৌশল’ দাবি করলেও দলটির এই সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী ও হাস্যকর বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। নির্বাচনে জয়ী হয়ে শপথ না নেওয়া, আবার একই আসনে উপ-নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত দেশের গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে ‘রসিকতা’। প্রশ্ন উঠছে বিএনপির মতো একটি বড় রাজনৈতিক দল একেরপর এক এমন হাস্যকর ও ভুল সিদ্ধান্ত কীভাবে নিচ্ছে?  এই সিদ্ধান্ত কী লন্ডন থেকে আসছে? মির্জা ফখরুল নিচ্ছেন? নাকি অন্যকেউ চাপিয়ে দিচ্ছেন, সেটা মির্জা ফখরুল বাস্তবায়ন করছেন?

এর আগে বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ নিয়েও অনেক নাটক করেছে দলটি। অল্প সময়ের ব্যবধানে শপথ নিয়ে তিন ধরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।  গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে মাত্র ছয়টি আসনে জয়লাভ করে বিএনপি। নির্বাচনকে প্রহসন উল্লেখ করে দলটি সিদ্ধান্ত নেয়, তারা সংসদে যাবে না। সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁদের নির্বাচিত ছয়জনের কেউই শপথ নেবেন না। কিন্তু চার মাসের মধ্যে সবকিছু ওলট–পালট হয়ে গেল। শপথ ইস্যুতে আগের অবস্থানের একেবারেই উল্টো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল দলটি। তবে রাজনীতিবিদ ও রাজনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই; এটা ঠিক। কিন্তু একটি ইস্যুতে তিন ধরনের সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে রহস্যের সৃষ্টি করেছে। কেউ কেউ একে অভিনব বলেও মত দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, বিএনপি তাদের নির্বাচিত ছয়জনের জন্য তিন ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটা আসলেই রাজনৈতিকভাবে দূরদর্শিতা না খামখেয়ালিপনা, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতদৃষ্টিতে বোঝা যাচ্ছে, নেতা-কর্মীদের ওপর বিএনপির নিয়ন্ত্রণ কম থাকার কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

শপথ ইস্যুতে নির্বাচিত ছয়জনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন তিনটি সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে বিএনপি। সিদ্ধান্ত তিনটি হলো প্রথম শপথ নেওয়া দলীয় সাংসদ জাহিদুর রহমানকে দল থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। চার সাংসদ হারুনুর রশীদ, আমিনুল ইসলাম, উকিল আবদুস সাত্তার ও মোশাররফের জন্য দলীয় সিদ্ধান্ত হলো তাঁরা সংসদে যাবেন। আর দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত শপথ নেবেন না। অর্থাৎ মির্জা ফখরুল সংসদ সদস্য হবেন না।

দলীয় কোনো পদে না থাকলেও বিএনপির রাজনীতির প্রতি সহানুভূতিশীল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি চিকিৎসক জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘আমি সংসদে গিয়ে কথা বলার পক্ষেই ছিলাম। তবে যে পদ্ধতিতে বিএনপি গেল, সেই যাওয়াটা ভুল। সিদ্ধান্ত সঠিক কিন্তু পথটা ভুল। বিএনপির স্থায়ী কমিটি এবং সবাইকে জানিয়েই করতে পারত।’ তিনি মনে করেন, একটাই সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত ছিল।

গত ২৫ এপ্রিল সাংসদ হিসেবে শপথ নেন ঠাকুরগাঁও থেকে নির্বাচিত জাহিদুর রহমান। এর দুদিন পর জাহিদকে দল থেকে বহিষ্কার করে বিএনপি। কিন্তু দুদিন পরেই চার সাংসদের বেলায় ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। কিন্তু চার সাংসদের বেলায় সংসদে যাওয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিলেও মির্জা ফখরুল এই সিদ্ধান্তের বাইরে থাকেন।

আপাত দৃষ্টিতে সংসদে যাওয়ার ব্যাপারে বিএনপি পানি ঘোলা করে তা খেয়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই। তবে সিদ্ধান্ত একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হওয়াটা ঠিক হয়নি। এটা বিভ্রান্তিকর।

বগুড়া-৬ আসনের উপ-নির্বাচনের প্রার্থী নিয়ে নতুন নাটক শুরু হয়েছে। নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি। কিন্তু মান্না সে প্রস্তাবে রাজি হননি। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াএই আসনে নির্বাচন করতেন। এবার তিনি করতে না পারায় দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নির্বাচন করে জিতেছেন। তিনি শপথ না নেওয়ায় আসনটি শূন্য হয়েছে। তাই এ আসনে আবার কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হলে দলের জ্যেষ্ঠ কোনো নেতাকেই মনোনয়ন দেওয়া উচিত।

তা ছাড়া এখন বিএনপির যে ৫ জন সাংসদ আছেন তাদের নেতৃত্ব দিতে পারবেন, সরকারদলীয় জ্যেষ্ঠ নেতাদের কথার পিঠে কথা বলতে পারবেন এমন কাউকে এই আসনে মনোনয়ন দেওয়া উচিত বলেও মত আসছে। আবার কারও কারও প্রস্তাব মান্নাকে জোটের প্রার্থী করার।

বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য নাম না প্রকাশের শর্তে বলেছেন, বিএনপি বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচন করতে চায়। এখন পর্যন্ত এটাই সিদ্ধান্ত। তবে প্রার্থী এখনো চূড়ান্ত হয়নি। মাহমুদুর রহমান মান্না বিএনপির প্রস্তাবে রাজি হলে প্রার্থী নিয়ে আর সমস্যা হতো না। তবে এখন কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ও যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং স্থানীয়দের মধ্যে জি এম সিরাজের নাম আলোচনায় আসছে। বিএনপির নেতারা চান কেন্দ্রীয় নেতাদের কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হোক। তাহলে বিএনপির যারা সংসদে আছেন তাদের ওপর নেতৃত্ব দিতে পারবেন।

বগুড়া-৬ আসনে বিএনপি শেষ পর্যন্ত কি করবে তা এখনো নিশ্চিত নয়। লন্ডন থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির নেতৃত্ব নিয়ে হ য ব র ল অবস্থা বিরাজ করছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকে বিএনপির সাংগঠনিক অব্যবস্থাপনার বেহাল দশা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। আর এ অবস্থা আরও মহামারি আকার ধারণ করে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ভরাডুবি ও তৎপরবর্তী হাস্যকর সব সিদ্ধান্ত নিয়ে। অবস্থাদৃষ্টে কে বা কারা বিএনপি চালাচ্ছে সেই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে উচ্চারিত হচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।  ‘বিএনপি আসলে কে চালায় বা চালাচ্ছেন’ প্রশ্নটি আরও জোরালো হতে থাকে। প্রশ্নটি শুধু সাধারণের নয়, প্রশ্নটি বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মনেও দেখা দিয়েছে। বিএনপি আসলে কার নির্দেশে চলছে? কে নেতৃত্ব দিচ্ছে বিএনপির? দলের স্থায়ী কমিটি, কারাবন্দি খালেদা জিয়া, নাকি লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমান?

প্রশ্নটি এখন শুধু তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের নয়, এ বিষয়ে দলের সিনিয়র অনেক নেতারাও অন্ধকারে আছেন। যদিও খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ার পর দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা ও পরামর্শে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা দল পরিচালনা করবেন। কিন্তু গত ২৯ এপ্রিল বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে তারেক রহমানকে দলের যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে একক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।

দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির বর্তমান দুরবস্থা অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগিয়েছে, কেন দলটির এ অবস্থা। দলটি যেন কিছুতেই সঠিক পথে চলতে পারছে না। সাংগঠনিক দুর্বলতা, শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে অনতিক্রম্য দূরত্ব, একশ্রেণির নেতার নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড দলটিকে যেন পর্যুদস্ত করে ফেলেছে।

অনেকে অনেক কথা বললেও একটি বিষয়ে সবাই একমত যে, নেতৃত্বের ভুলের কারণেই বিএনপির এ দশা। শত সমালোচনার পরও এটা স্বীকার করতেই হবে যে, দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের একটি বিএনপি। গত তিন দশক ধরে পালাক্রমে দেশ পরিচালনা করে আসছে দল দুটি। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিপরীতে এখনো মানুষ বিএনপিকেই তাদের ভাবনায় স্থান দিয়ে থাকে।

সাংগঠনিক বিস্তারে বিএনপি-আওয়ামী লীগ প্রায় সমকক্ষ। শক্তিমত্তায়ও তারা ‘কেউ কারে নাহি ছাড় সমানে সমান’ অবস্থায়ই ছিল। তবে বর্তমানে বিএনপি যেন একটি ক্ষয়িষ্ণু দলে পরিণত হয়েছে। ভুল রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি, সিদ্ধান্ত নিতে দৃঢ়তার অভাব এবং অভ্যন্তীরণ কোন্দলে বিলুপ্তির পথে হাঁটছে বিএনপি।

লেখক- সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

উপরে