আপডেট : ১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ১৭:১১

ক্ষমতাসীনরা সাবধান, পেছনের দরজায় জামায়াত!

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
ক্ষমতাসীনরা সাবধান, পেছনের দরজায় জামায়াত!

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার পর একে একে বেরিয়ে আসছে অনেক অজানা তথ্য। এই হত্যাকাণ্ডে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বেশ কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন মাদরাসা ছাত্রলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম ও সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সদ্য বহিষ্কৃত ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম। জড়িতদের তালিকায় রয়েছে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনের নামও।

ন্যাক্কারজনক এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সন্দেহভাজন কয়েকজনের সাথে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা থাকা নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা বিতর্ক হচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন দল থেকে আওয়ামী লীগে যোগদানকারীদের তালিকা তৈরি করে যাচাই-বাছাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ফেনী আওয়ামী লীগে শুদ্ধি অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন।

রাফি হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার বহিষ্কৃত অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা একসময় জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি করতেন। তিনি উপজেলা জামায়াতের শূরা সদস্য। তবে জামায়াত তাকে বহিষ্কার করেছে এমন দাবি করলেও তার সপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।

অধ্যক্ষ সিরাজ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর খোলস পাল্টে হয়ে যান আওয়ামী লীগের সমর্থক। এরই ধারাবাহিকতায় মাদ্রাসায় একটি স্বঘোষিত ছাত্রলীগ কমিটিও গঠন করেন তিনি। অন্যদিকে সুবিধা পেতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতিকে মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করেন অধ্যক্ষ সিরাজ। বিভিন্ন কৌশলে অর্থ ব্যয় করে সোনাগাজী আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী কয়েক নেতার সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। এর মধ্যে তিনি শিবির কর্মীদের দিয়ে মাদ্রাসায় ছাত্রলীগের একটি কমিটি দাঁড় করান। তারা মাদ্রাসায় সিরাজের ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করে।

ফেনীর সোনাগাজীর মতো একই চিত্র সারা দেশে। ২০১৪ সাল থেকে আওয়ামী লীগে অন্তত এক লাখ জামায়াত-বিএনপির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে দলটির হাইকমান্ড বিভিন্ন সময়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বললেও অজানা কারণে সফল হতে পারেনি। দেশজুড়ে এই অনুপ্রবেশকারীরা নানা অপকর্ম করছে। আর তার দায়ভার এসে পড়ছে ক্ষমতাসীন দলটির ওপর। সুধু এখানেই শেষ নয় বিগত বছরগুলোতে সব ক্ষমতাসীন দলগুলোকে ব্যবহার করে  শক্তিশালি হয়েছে জামায়াত। যখন যাকে প্রয়োজন তার সঙ্গেই সখ্যতা গড়ে তুলেছে দলটি।

প্রায় ১১ বছর হতে চললো টানা ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ, এই সময়ে বানের পানির মতো দলটিতে অনুপ্রবেশ ঘটেছে। কত সংখ্যক বিএনপি-জামায়াতের লোক এখন ‘আওয়ামী লীগ’ এর হিসাব মেলানো কঠিন। ২০০৯ সাল থেকেই বিভিন্ন দল থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান শুরু হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াতের ব্যাপক সংখ্যক নেতা-কর্মী ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেয়। এটা অব্যাহত আছে ২০১৯ সালেও। তাদের  প্রধান লক্ষ্যবস্তু তৃণমূলে ত্যাগী ও পরিশ্রমী, দলের প্রতি নিবেদিত কর্মীদের কোনঠাসা করা। তারা এক্ষেত্রে সফলও হয়েছে।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিচার শুরুর প্রাথমিক পর্যায় ২০১১ সাল থেকে পুলিশের ওপর হামলা, গাড়ি পোড়ানো, পেট্রোল বোমা হামলাসহ দেশজুড়ে ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি পালন শুরু করেছিল জামায়াত-শিবির। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকানো এবং ২০১৫ সালে লাগাতার অবরোধের সময়ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায় দলটি।

তবে জামায়াত-শিবিরের সহিংসতার বিরুদ্ধে পাঁচ বছর তাদের মোকাবিলায় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও ছিল মাঠে সক্রিয়। জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারদের ধরতে নিয়মিত চালানো হতো অভিযান। ২০১৫ সালে জামায়াত-শিবির রাজপথ থেকে সরে যায়। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসসহ কয়েকটি দিবসভিত্তিক কর্মসূচি ছাড়া তাদের আর রাজপথে দেখা যায়নি।

এ সময় কৌশল পাল্টে ফেলে জামায়াত-শিবির। স্থানীয় নেতাদের হাত ধরে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশের কৌশল নেয় দলটি। এই কৌশলে তাঁরা দারুণভাবে সফলও হয়।

জামায়াতে ইসলামী নামের রাজনৈতিক দলটি নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল না। বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনীতিও করার কথা নয়। এই দলটি বাংলাদেশ চায়নি। তারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। অস্ত্র হাতে পাকিস্তানি বাহিনীর পক্ষে বাঙালির বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে।

এরা ঘাতক, এরা দালাল। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর এরাও গর্তে লুকিয়েছিল। ছিল সময়ের, সুযোগের অপেক্ষায়। তারা সুযোগ পায় বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় বসার পর। জামায়াত নেতা গোলাম আযম মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের আগ মুহূর্তে পাকিস্তান চলে যান। পাকিস্তানে থেকেও তিনি বাংলাদেশবিরোধী প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রাখেন। জিয়া গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। জামায়াতকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন।

আওয়ামী লীগকে জব্দ করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়েই জিয়া গোলাম আযম ও জামায়াত নিয়ে কৌশলের রাজনীতি করেছিলেন। কিন্তু তার এই অপকৌশল আত্মঘাতী হয়ে উঠেছে দেশের জন্য, রাজনীতির জন্য। অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার হলো, একাত্তরের এই ঘাতক-দালালরা এখন অনেক শক্তিশালী। তারা দেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছে। তাদের আর্থিক মেরুদণ্ড অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা সুসংগঠিত, সুশৃঙ্খল। তারা রাজনীতিতে আছে। তাদের নিয়ে রাজনীতি আছে।

জামায়াত দেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা করে ৯০ এর দশকে। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর জামায়াত-শিবির দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের আধিপত্য গড়ে তোলে। সেসময় বিভিন্ন সাংষ্কৃতিক গোষ্ঠী গড়ে তোলে তারা। ছাত্রশিবির রাজনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক তৎপরতা শুরু করে। ছাত্রশিবিরের মুখপত্র কিশোর কণ্ঠ, ছাত্রসংবাদ,যুভ্যেনাল ভয়েস, নতুন কলম, রাজনৈতিক মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক নয়া দিগন্ত, সাপ্তাহিক সোনার বাংলাসহ অনেক ম্যাগাজিন ও পত্রিকা প্রকাশ করে তারা। এছাড়া সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী, দিশারী শিল্পীগোষ্ঠী, টাইফুন শিল্পীগোষ্ঠী,ফুলকুঁড়িসহ দেশজুড়ে অসংখ্য শিল্পীগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন শিবির। যেগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে তাদের মতাদর্শ ঢুকিয়ে দেওয়াই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।

রাজনৈতিক অঙ্গনে অশুভ জাল বোনার পাশাপাশি বাংলা ও বাঙালির হাজার বছরের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও অন্ধকারের জাল বুনছে যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন জামায়াতে ইসলামী ও যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থকগোষ্ঠী ছাত্রশিবির। সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক কালো হাতের আঁচড়ে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে আমাদের সাহিত্য, আমাদের সাংস্কৃতিক দেহ। 

একাত্তরের হায়েনা গোষ্ঠী যুদ্ধাপরাধীদের সংগঠন জামায়াত-শিবির এতটা পথ এসেও বলছে, তারা প্রাথমিক স্তরে আছে। তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে, অনতিবিলম্বে ওরা আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিকে দখল করে নেবে। এমতাবস্থায় স্বাধীনতার সপক্ষের সবাইকে হতে হবে আরও সোচ্চার, আরও সচেতন। তা না হলে যেকোনো মূল্যের বিনিময়ে জামায়াত-শিবির তাদের অন্ধকারে ঢেকে দেবে আমাদের সাহিত্য, আমাদের সংস্কৃতি।

বিএনপির ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভুতের মতো সওয়ার হয়ে বিষবৃক্ষ থেকে আজকের মহিরুহে পরিনত হয়েছে জামায়াত-শিবির। বিএনপির নিজস্বতা বলে এখন আর কিছুই অবশিষ্ঠ নেই। জামায়াতি আদর্শ-দর্শনের সঙ্গে জিয়ার আদর্শ মিলেমিশে একাকার। এবার তাদের টার্গেট দেশের স্বাধীনতার ধারক-বাহক আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করা। সেটা করতে পারলেই তাদের ষোলকলা পূর্ণ হয়। আর এই উদ্দেশ্যেই বানের পানির মতো আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করছে দলটির নেতাকর্মীরা।

কেন্দ্রীয় নেতা ও এমপি-মন্ত্রীদের হাত ধরে নৌকায় ওঠা ‘পরগাছাদের’ নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি ছিল তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের। কিন্তু নিজের আধিপত্য ধরে রাখা এবং ‘বিশেষ সুবিধা’র জন্য বন্ধ হয়নি দলের অনুপ্রবেশ। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের অন্যতম কারণ এই অনুপ্রবেশকারী। তাদের কারণেই দলে ত্যাগী ও দুঃসময়ের নেতারা কোণঠাসা হয়ে পড়েন।

সারা দেশে আওয়ামী লীগ পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে, বিগত দিনে যারা আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হত্যা করেছে, আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে, সেসব মামলা থেকে বাঁচতে তারাই আওয়ামী লীগে ভিড়ছে। দল ভারী করার জন্য স্থানীয় নেতারা কেউ কেউ তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন।

এখনই এই অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সামনে ভয়াবহ দুর্দিন অপেক্ষা করছে। ফেনীর সোনাগাজীর মতো ঘটনা তারা সারাদেশে ঘটাতেই থাকবে। সুযোগ পেলেই বিভিন্ন অপকর্ম করে সরকারকে বিপদে ফেলতে চেষ্টা করবে। সারাদেশেই আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠবে আওয়ামী লীগ। তখন আর করার কিছুই থাকবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে