আপডেট : ২৯ মার্চ, ২০১৯ ১৫:৫৭

আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ পাকিস্তানেরই সৃষ্টি

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ পাকিস্তানেরই সৃষ্টি

বিশ্বে সামরিকভাবে ব্যাপক গুরুত্ব পাওয়া অঞ্চলগুলোর একটি কাশ্মীর- এবং একই সাথে ভারত ও পাকিস্তানের মতো দু'টি পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন দেশের সবচেয়ে অস্থিতিশীল সীমান্তবর্তী এলাকা।

সম্প্রতি জম্মু-কাশ্মীরের পুলাওয়ামায় ভারতের আধাসামরিক বাহিনীর কনভয়ে পাকিস্তান ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইস-ই মোহাম্মদের ভয়াবহ আত্মঘাতি হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঐ অঞ্চলে আবারো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

পুলাওয়ামায় গত ১৪ ফেব্রুয়ারি হওয়া হামলাটি ছিল কয়েক দশকের মধ্যে ভারতীয় বাহিনীর উপর হওয়া সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী আক্রমণ, যেখানে কয়েক দফা বোমা বিস্ফোরণে এবং গোলাগুলিতে প্রায় ৫০ জনের মত ভারতীয় আধা-সামরিক পুলিশ বাহিনীর (সিআরপিএফ) সদস্য নিহত হয়েছে।

পুলাওয়ামা হামলার জবাব দিতেই (২৬ ফেব্রুয়ারি) ভোররাতে পাকিস্তানের ভেতরে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালায় ভারতীয় বিমানবাহিনী। ভারতীয় কর্মকর্তাদের দাবি তারা খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের বালাকোটে জঙ্গি সংগঠন জয়শ-ই মহম্মদের ঘাটিতে হামলা চালিয়ে প্রায় ৩০০ জঙ্গিকে খতম করেছে। তবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে হামলার কথা স্বীকার করা হলেও কেউ নিহত কিংবা আহত হয়নি বলে দাবি করা হয়।

ভারতের প্রতিশোধমূলক এই হামলার পরেই পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন দেশ দুটির মাঝে বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। পরদিন নিয়ন্ত্রণরেখা অতিক্রম করে ভারতে হামলা চালায় পাকিস্তানি বিমানবাহিনী। তাদের হামলায় বিধ্বস্ত হয় ভারতের একটি মিগ-২১ যুদ্ধ বিমান। পাক সেনাদের হাতে আটক হন বিধ্বস্ত বিমানের ভারতীয় পাইলট অভিনন্দন বর্তমান। যদিও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে একদিন বাদেই অভিনন্দকে ভারতের কাছে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান।

গত কয়েক দশক ধরে পাক সন্ত্রাসের শিকার ভারত। পাকিস্তানের মদদপুষ্ট জঙ্গি গ্রুপ জইশ-ই মহাম্মদ (জেইএম), লস্কর-ই-তৈয়বার (এলইটি) মতো জঙ্গি সংগঠনগুলো বেসামরিক নাগরিক, সামরিক সদস্য ও সামরিক স্থাপনায় একের পর এক হামলা চালিয়ে আসছে। যদিও প্রতিটি সন্ত্রাসী হামলার পরে ভারতের অভিযোগ বারবার অস্বীকার করে আসছে পাকিস্তান। কিন্তু পাকিস্তানপন্থী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘জইশ-ই-মহম্মদ’ যখন হামলার দায় স্বীকার করে নেয়, তখন কোনোভাবেই পাকিস্তান এই হামলার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না।

ভারতের অনেকবারই সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে তবে বলার মতো বড় সন্ত্রাসী হামলার শুরু ১৯৮০ সালে। অবশ্য সেই দশকের সন্ত্রাসী হামলাগুলোর বেশিরভাগই ছিল শিখদের স্বাধীন খালিস্তান দাবির প্রেক্ষিতে। এছাড়া বিচ্ছিন্নতাবাদী তামিল জঙ্গি গোষ্ঠীর হামলাও আছে কয়েকটি। তবে ২০০০ সালে ডিসেম্বর থেকে পরিস্থিতি বদলে যায়। ২২ ডিসেম্বর দিল্লির বিখ্যাত লাল কেল্লায় হামলা চালায় পাকিস্তানের লস্কর-ই-তৈয়বা। নিরাপত্তার জন্য মোতায়েন তিন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। সেটাই প্রথম পাকিস্তানের অভ্যন্তরের কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সরাসরি ভারতে হামলায় নিজেদের সম্পৃক্ত করে। যথারীতি পাকিস্তান কোনো দায় স্বীকার করেনি। তবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় সন্ত্রাসী দলটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভারত থেকে বারবার বলা হলেও পাকিস্তান সেই সংগঠনটির ‍বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

ভারতের মাটিতে পাকিস্তান ভূ-খণ্ডে আশ্রিত উগ্রবাদী সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী হামলার সূচনা হয় মূলত ১৯৯৩ সালের মুম্বাই হামলার মধ্য দিয়ে।  সন্ত্রাসী হামলায় পাকিস্তানের নামও সর্বপ্রথম শোনা যায় এই বোমা হামলায়। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দায়ে ১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ ভারতের ব্যস্ততম নগরী মুম্বাইসহ মোট ১৩টি স্থানে একযোগে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয় এ হামলায়। ভয়াবহ এই সিরিজ বোমা হামলায় কমপক্ষে ২৫৭ জন নিহত ও প্রায় সহস্রাধিক ব্যক্তি আহত হন। এই হামলার সাথে সম্পৃক্ততা ও ভারতে অবৈধ মাদকের সাম্রাজ্য গড়ে তোলার দায়ে প্রকাশিত দেশটির মোস্ট ওয়ান্টেড জঙ্গি তালিকায় তখন উঠে আসে হামলার মূল হোতা দাউদ ইব্রাহিমের নাম। ভারতের দাবি, পাকিস্তানের নিরাপদ আশ্রয়ে থেকে এই এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন দাউদ। আর তার সহযোগী হিসেবে নাম আসে টাইগার মেমন ও ইয়াকুব মেমনের।

দ্বিতীয় দফায় উগ্রবাদী জঙ্গি হামলার স্বীকার হয় ভারতীয় সংসদ ভবন। ২০০১ সালের এই হামলার মধ্য দিয়েই দেশটির বিরুদ্ধে একযোগে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় পাক-অধ্যুষিত ভূ-খণ্ডে লালিত সাম্প্রদায়িক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বা এবং জ্ইশ-ই-মহম্মদ। সংগঠন দুটি যৌথভাবে আলোচিত এই হামলা চালায় যাতে একজন সাধারণ নাগরিকসহ ১২ জনের মৃত্যু হয়। মূলত এই হামলার মধ্য দিয়েই দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ভেঙে পড়ে। হামলার মূল হোতা ছিলেন সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠন জ্ইশ-ই-মহম্মদের প্রধান মাওলানা মাসুদ আজহার। যদিও আফগানিস্তানের কান্দাহারে ভারতীয় বিমান অপহরণের ঘটনায় তাকে গ্রেফতারের পরও পাকিস্তানের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয় তৎকালীন ভারত সরকার। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবেই স্বীকৃত এই জঙ্গি নেতাকে সাজা দিতে ব্যর্থ হয় সেদেশের সরকার। সম্প্রতি সেই জ্ইশ নেতার হাত ধরে পুলওয়ামায় জঙ্গি হামলায় জওয়ানদের রক্তে ফের রক্তাত্ত হলো ভারতের মাটি!

২০০৬ সালে ১১ জুলাই মহারাষ্ট্রের রাজধানী মুম্বাই-এর সুবরবন রেলওয়ে স্টেশনে পরিচালিত জঙ্গি হামলাটি সুদীর্ঘ সময়ের জন্য এক জীবন্ত আতংকের মতো মানুষের মনে ঠাঁই করে নেয়। এদিন মাত্র ১১ মিনিট সময়ের মধ্যে ৭টি ভয়াবহ বিস্ফোরণে প্রকম্পিত হয় মুম্বাই শহর। জঙ্গি সংগঠন ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের সদস্য, ভারতের বিন লাদেন হিসেবে পরিচিত আবদুল সুবাহান কুরেশি এই হামলার বোমা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। এই হামলায় অন্তত ২০৯ জন নিহত ও প্রায় ৭০০ মানুষ বীভৎসভাবে আহত হন।

তবে ভারতের বুকে স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ জঙ্গি হামলাটি হয় ফের সেই যেখান থেকে শুরু সেখানেই। ঘটনাস্থল এবারও সেই মুম্বাই, সাল ২০০৮। পাক মদদপুষ্ট লস্কর-ই-তৈয়বা নামের জঙ্গি সংগঠনের প্রশিক্ষিত ১০ জন সশস্ত্র সদস্য জলপথে ভারতে প্রবেশ করে এই হামলা পরিচালনার কাজে। টানা ৪ দিন ধরে চলে জঙ্গিদের নৃশংস তাণ্ডব! জঙ্গিরা নগরীর হোটেল ওবেরয় ও হোটেল তাজের ভেতর প্রবেশ করে বিদেশি পর্যটকসহ সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পাশাপাশি তারা নগরীর 'নরিম্যান হাউজ' নামের একটি ইহুদি কলোনি, 'ছত্রপতি শিবাজী' টার্মোলেন, মুম্বাই মেট্রো সিনেমা হল, সেন্ট জাভিয়ার স্কুল লেনসহ পৃথক পৃথক ৮টি স্থানে বোমা বিস্ফোরন ঘটায় ও নির্বিচারে মানুষের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এ হামলায় বিদেশিসহ কমপক্ষে ১৭৪ জন এই হত্যাকাণ্ডে শিকার হন। জঙ্গিদের প্রধান হাফিজ মোহাম্মদ সাঈদের পরিকল্পনায় পরিচালিত হয় ভারতের ইতিহাসে ২৬/১১ মুম্বাই ট্র্যাজেডি হিসেবে আখ্যায়িত এই ভয়াবহ জঙ্গি হামলা। জঙ্গি সংগঠনটির অন্যতম নেতা জাকি-উর-রেহমান লাখভি, বর্তমানে সংগঠনটির কাশ্মীরের সুপ্রিম কমান্ডার হিসাবে কাজ করছেন। ২০০৮ সালের নভেম্বরে মুম্বাই হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনিও।

ভারতের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী হামলায় পাকিস্তান ভিত্তিক জঙ্গিদের জড়িত থাকার উপর্যুক্ত তথ্য- প্রমাণসহ পাক সরকারকে এই দলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ভারতের পক্ষ থেকে বারবার বলা হলেও তাতে কর্ণপাত করেনি পাকিস্তান সরকার। ফলে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলি পাকিস্তানে তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল থেকে নির্বিচারে ভারতের বিরুদ্ধে হামলা চালানো অব্যাহত রেখেছে।

এই মুহুর্তে, যখন বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ সন্ত্রাসের হুমকির মুখে, তখন ভারতের পুলাওয়ামায় এই ভয়াবহ হামলা চালায় পাকিস্তানের মদদপুষ্ট জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই মহম্মদ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অনেক দেশ, উভয় পক্ষকে সংযত হওয়ার কথা বললেও পাশাপাশি তাঁরা স্পষ্টভাবেই পাকিস্তানকে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ পাকিস্তানেরই সৃষ্টি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পাকিস্তানকে তাঁর সন্ত্রাসের কারখানা বন্ধে চাপ প্রয়োগ করার এটাই উপর্যুক্ত সময়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

উপরে