আপডেট : ১১ জানুয়ারী, ২০১৯ ১৬:২২

এই নির্বাচনে আরও একধাপ এগিয়ে গেলে বাংলাদেশ

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
এই নির্বাচনে আরও একধাপ এগিয়ে গেলে বাংলাদেশ

টানা তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, সব মিলিয়ে চতুর্থবারের মতো স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তাঁর এই অর্জন শুধু বাংলাদেশেই নয়, উপমহাদেশ ছাড়িয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে এক অনন্য ইতিহাস। একাদশ সংসদ নির্বাচনে সরকারবিরোধী প্রধান রাজনৈতিক দল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে বিশাল বিজয় অর্জন করে নতুন ইতিহাস রচনা করেছেন দক্ষিণ এশিয়ার এই লৌহমানবী।

কার্ল মার্কসের চিরস্মরণীয় উক্তি ‘সর্বহারার হারাবার কিছু নেই, জয় করবার জন্য আছে গোটা বিশ্ব।’ মহান দার্শনিকের এই অমর বাণীকে একটু পাল্টে বলা যায় ‘শেখ হাসিনার হারাবার কিছু নেই, জয় করবার আছে গোটা বিশ্ব।’ তাঁর সাফল্য নিয়ে মহাকাব্য রচনা করা যাবে। একজন রাজনীতিবিদের যা স্বপ্ন, তাঁর সবই তিনি পূরণ করেছেন। জাতির পিতা হত্যার পর দিকভ্রান্ত একটি দলকে তিনি সংগঠিত করেছেন। ক্ষমতায় এনেছেন। পিতার হত্যার বদলা নেননি, করেছেন ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে শহিদদের রক্তের ঋণ শুধেছেন। বাংলাদেশকে নিয়েছেন অপ্রতিরোধ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতির ধারায়। মানুষের জীবন মান পাল্টে গেছে। জনসংখ্যায় ঠাসা এক দেশকে তিনি দিয়েছেন ঈর্ষণীয় উন্নতির ছোঁয়া। ৩৮ বছর ধরে একটি দলের অবিসংবিদিত নেতা। ৪৭ বছর বয়সী দেশে তিনিই শাসন করেছেন ১৫ বছর। নতুন করে আরও এক মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এর মাঝেও জনগণের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তার গ্রাফ সবসময়ই ঊর্ধ্বমুখী। একজন মানুষের জীবনে আর কি চাই। একজন রাজনীতিবিদের পূর্ণতার উপমা এখন শেখ হাসিনা।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় তার সরকারের বিদেশনীতির হাতকে আরও শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে নয়াদিল্লি ও বেইজিংয়ের সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক বিষয়গুলো পরিচালনায় শেখ হাসিনার অবস্থান আরও দৃঢ় হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের টানা তৃতীয়বার ও নিজের চতুর্থদফায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরপরই শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানাতে এতটুকু বিলম্ব করেননি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, সৌদি বাদশা, যুবরাজসহ বিশ্বের প্রায় সব প্রভাবশালী নেতারা। এমনকি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও অভিনন্দন জানাতে কুণ্ঠিত হননি।

শেখ হাসিনাকে লৌহমানবী অভিহিত করে জাপানের প্রভাবশালী সংবাদ মাধ্যম নিক্কেই এশিয়ান রিভিউ লিখেছে, “অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কঠোর কর্তৃত্ব দিয়ে নিজের দেশের বিরোধী পক্ষকে যেমন উড়িয়ে দিয়েছেন, তেমনি পূর্ব ও পশ্চিম—উভয় বিশ্বে তিনি নিজের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে নিয়েছেন। এশিয়ার পরস্পরবিরোধী প্রধান দুই শক্তি চীন ও ভারতের সঙ্গে যুগপৎ সুসম্পর্ক বজায় রেখে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য ছোট দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে সবচেয়ে মর্যাদার আসনে তুলে এনেছেন তিনি।”

নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের ক্ষেত্রে চীন ও ভারত রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে। সেখানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ এমন এক মধ্যমপন্থা নিয়ে এগুচ্ছে, যা ইন্দো-চীন ঠাণ্ডাযুদ্ধে  স্থিরতা এনে দিতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ আরও অনিশ্চয়তার মুখ দেখলেও শেখ হাসিনার এই বিপুল নির্বাচনি বিজয় নয়াদিল্লি ও বেইজিংকে হ্যান্ডল করার সক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দেবে।

ভারতের সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে সোনালি সুসম্পর্ক তার। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে বন্ধুত্বপূর্ণ, সহযোগিতার সম্পর্ক ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক চেতনার কারণে ভারতেও শেখ হাসিনা অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। ইসলামি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে অনিবার্য হিসেবে দেখে নয়াদিল্লি। বিশেষ করে, তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ খালেদা জিয়াকে কারাবন্দি করার পর ভারতকেও কিছু সন্ত্রাসী হামলার মুখে পড়তে হয়। যা পরিচালনায় ছিল বাংলাদেশভিত্তিক ও পাকিস্তান-সমর্থিত হরকাতুল-জিহাদ আল-ইসলামি (হুজি)’র মতো জঙ্গি সংগঠনগুলো। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের গোটা ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটারজুড়েই সন্ত্রাস শুরু করেছিল এই হুজি। এদের কঠোর হাতে দমন করেছেন শেখ হাসিনা। এছাড়া তার প্রচেষ্টায় ভারতবিরোধী অন্য বিদ্রোহী দলগুলোও দমন করা হয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে ভারতের মূল ভূ-খণ্ডের সরাসরি সংযোগ স্থাপনে বাংলাদেশের ভূ-খণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে ঝুলে থাকা স্থল ও জলসীমা বিরোধ মীমাংসায় নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সুসমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধান করেছেন।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর একসময় যে মৌলবাদীদের চাপ ও অত্যাচার ছিল, তা ধীরে ধীরে কমে এসেছে তারই নেতৃত্বে। আর সে কারণেও ভারতীয়দের প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছেন তিনি। ছোট ছোট জিহাদি দলগুলো এখনো বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে তাদের তৎপরতা বন্ধ করেনি বটে, তবে তারপরও ভারত মনে করে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি ও তাদের অন্যতম মিত্র মৌলবাদী ও সন্ত্রাসবাদী জামায়াতে ইসলামি ক্ষমতায় থাকলে পরিস্থিতি আরও বাজে রূপ নিতে পারতো। এবারের নির্বাচনে বিএনপি জোটের পরাজয়ের অন্যতম কারণ স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতের হাতে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দেওয়া।

ধানের শীষ প্রতীকে জামায়াতকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিএনপির মহাক্ষতি হয়েছে তো বটেই! আবার শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকল না জামায়াত। নির্বাচনের দিন সম্পূর্ণ একক সিদ্ধান্তে সবার আগে নির্বাচন বর্জন করেছে জামায়াতের প্রার্থীরা। এতে সামগ্রিকভাবে বিএনপি জোট তথা ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনের ফলাফলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে কোন সন্দেহ নেই।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে সোচ্চার ছিল বাংলাদেশের মানুষ৷ সেখানে বিএনপি জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন করেছে৷ এসবেরই প্রতিফলন ঘটেছে এবারের নির্বাচনে৷ জামায়াতকে ধানের শীষ দেওয়া ছিল বিএনপির ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ভুল। নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি হলো। আসলে জনগণ এই নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিএনপি ও জামায়াত উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের আঁচল থেকে বিএনপি বের হতে না পারলে তারা আর কখনই রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসতে পারবে না।

বাংলাদেশকে অসাম্প্রদায়িক দেখতে চায় ভারত। আর তাই কৌশলগত কারণে শেখ হাসিনার কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাবের বিষয়টি ছাপিয়ে তার সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী উদ্যোগগুলো ভারতের কাছে অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। বিরোধী পক্ষের ওপর শেখ হাসিনার রাজনৈতিক নিষ্পেষণে ভারত বিচলিত হলেও বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক চর্চার ব্যাপারে সবসময়ই আগ্রহী। সে কারণে ২০১৮ সালের নির্বাচনটি যেন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়, সে ব্যাপারে নয়াদিল্লি পর্দার আড়ালে থেকে চেষ্টা চালিয়েছে।

অন্যদিকে একনায়কতন্ত্রের চীন শেখ হাসিনার নেতৃত্ব নিয়ে অনেকাংশেই সন্তুষ্ট। বৈদেশিক অর্থসহায়তা অর্জনের ক্ষেত্রে দেশটি শেখ হাসিনার বাস্তবমুখী কঠোর নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেয়। এই মূহূর্তে বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়নে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনায় রয়েছে চীন।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের পর শেখ হাসিনা এখন জানেন, তাকে গুরুত্ব না দিয়ে কোনো উপায় নেই চীনের কাছে। ফলে অন্য যেকোনো উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে চীনের সঙ্গে এখন তার সম্পর্কটিই সবচেয়ে ভালো। সে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে অপেক্ষকৃত কম সুদে চীনা ঋণ যেমন পেয়েছেন, তেমনি বিআরআই প্রকল্পে চীনা নয় বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করবে সেটাও নিশ্চিত করেছেন।

চীন এমন একটি শক্তি যাকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয় দক্ষিণ এশিয়ার অন্য কোনো দেশের পক্ষেই। তাতে ভারত কতটুকু ভালোভাবে নিলো কি না, সেটা বড় কথা নয়। এ অবস্থায় ভারতকে সদামিত্র মেনে নেওয়া নেতৃত্ব শেখ হাসিনা যখন তার দরজা খুলে দেন, তখন বোঝা যায়, কতটা দূর পর্যন্ত এগিয়েছে চীন। কিন্তু পাশাপাশি ভারতের স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে যতটা যত্নশীলতা শেখ হাসিনা দেখিয়েছেন, তাতে এটা নিশ্চিত সুসম্পর্কে বেইজিং এখনো নয়াদিল্লিকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। সুতরং ভারতের জন্য শেখ হাসিনার মতো নেতৃত্বই প্রয়োজন যিনি সীমান্তে ইসলামপন্থীদের চাপে রাখবেন, আবার চীনকেও বেঁধে রাখবেন নিয়ন্ত্রিত সম্পর্কে।

এ অবস্থায় শেখ হাসিনা আবার যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন, ধরেই নেওয়া যায়, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কূটনীতিতে তিনিই এখন চালকের আসনে। নানা ঘটনা, সময়, পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জ জয়ে পারঙ্গমতা শেখ হাসিনাকে এই ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে এসেছে। রাজনীতিতে চমকের সঙ্গে ম্যাজিক প্রদর্শনেও তার সমকক্ষ এখন কেউ নেই।

লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে