আপডেট : ১ জানুয়ারী, ২০১৯ ১৮:১১

ঐক্যফ্রন্টের পরিণতি এখন কী হবে?

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
ঐক্যফ্রন্টের পরিণতি এখন কী হবে?

দেশি-বিদেশি অনেক ষড়যন্ত্র, অনেক অপপ্রচারের পরও একটি সফল নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। ষড়যন্ত্র-অপপ্রচারের মধ্যে স্থিরবুদ্ধি ও সুবিবেচনা নিয়ে যে কোন কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ কথা নয়। কিন্তু সরকার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সকল প্রতিকূলতা মোকাবেলার মাধ্যমে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। বাংলাদেশের জন্য এটা শুধু একটা নির্বাচন ছিল না। এটা একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের চার দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে তোলা চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের বিষ দাঁত ভেঙে দেওয়ার সংগ্রাম ছিল।

৩০ ডিসেম্বরের ভোটে বিস্ময়কর জয় পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে দলটির হ্যাটট্রিক জয়। ২৬৬টি আসনেই জয় পেয়েছে নৌকা। জাতীয় পার্টি জিতেছে ২২টি আসনে। আর স্বাধীনতাবিরোধীদের পৃষ্টপোষকতায় গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট পেয়েছে মাত্র ৭ টি আসন! এই নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ইতিহাসে অনন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।

অনেক বাগড়ম্বর ও হুংকার দিয়ে গত ১৩ অক্টোবর গঠিত হয়েছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার মইনুল ইসলাম, মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, আ স ম আব্দুর রব, মোস্তফা মহসিন মন্টু এরাই মূলত নতুন এই জোটের নেতৃত্বে আছেন। তাদের এই জোটে যোগ দিয়েছে দেশের অন্যতম বিরোধীদল বিএনপি এবং স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াত।

ঐক্যফ্রন্টের দায়িত্ব নিয়ে ড.কামাল মূলত স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াতকে নতুন জীবন দেয়ার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যার হাত থেকে কথিত বন্দী গণতন্ত্র মুক্ত করে তিনি তা তুলে দিতে চেয়েছিলেন যারা একাত্তরে গণহত্যা চালিয়েছে, যারা ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়েছে; তাদের হাতে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দূরদর্শিতা, বিচক্ষণতা ও কৌশলের কাছে শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে কথিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের।

এ নির্বাচনে ড. কামালের জোট শোচনীয়ভাবে হেরেছে। তিনি নিজে নির্বাচনে দাঁড়ালেও হয়ত জয়ী হতেন না। জনমনে প্রশ্ন এখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ভবিষ্যত কী? ড. কামালের রাজনীতিই বা কোথ পথে এগুবে? ড.কামাল ব্যর্থতা মেনে নিয়ে রাজনীতি থেকে সম্মানের সঙ্গে বিদায় নেবেন, না পানি আরো ঘোলা করতে চাইবেন? তাঁর বর্তমান হাবভাব দেখে মনে হয়, তিনি পানি আরো ঘোলা করতে চাইবেন। এরই মধ্যে তিনি নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে আইনি লড়াইয়ে নামার ঘোষণা দিয়েছেন। তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচন দাবি করেছেন। বিএনপি জোটেরও এটা দাবি। তাদের নির্বাচিত সদস্যরা নতুন সংসদের এমপি হিসাবে শপথ গ্রহণ করবেন না বলে ইতোমধ্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল জানিয়েছেন।

ড. কামাল হোসেন নতুন নির্বাচন দাবি করেছেন। শেখ হাসিনা এ দাবি মানবেন কেন? নিশ্চিতভাবেই এই মামাবাড়ির আবদারে সাড়া দেবেন না। তখন কামাল হোসেন কী করবেন?

নির্বাচনে ভরাডুবি নিয়ে ইতোমধ্যে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে টানপোড়েন শুরু হয়েছে বিএনপি জোটের। গতকাল (৩১ ডিসেম্বর) ড. কামালের গণফোরাম নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে চরম হতাশ বিএনপি নেতাকর্মীরা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েছেন বলে খবর দিয়েছে ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকা। বিএনপির জয়ী প্রার্থীরা সাংসদ হিসেবে শপথ না-নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে শরিক ড. কামালের গণফোরামের দুই জয়ী প্রার্থী শপথ নেবেন বলে জানিয়েছেন।

এদিকে নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় বরণ করা বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী মেজর (অব.) মো. আখতারুজ্জামান, বিএনপির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে অবিলম্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। মঙ্গলবার (০১ জানুয়ারি) দুপুরে ফেসবুকে নিজের পেজে এক স্ট্যাটাসে তিনি এ দাবি জানান। স্ট্যাটাসে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের উদ্দেশে বিএনপির সাবেক এ এমপি বলেন, ‘আল্লাহর ওয়াস্তে এই অপকর্মটি করবেন না-জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের কাছে আমাদের বিনীত নিবেদন। আইন বা বিচার বিভাগও যে সরকারের শক্ত নিয়ন্ত্রণে তা যদি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা না বোঝেন তাহলে এও জাতির আরেকটি দুর্ভাগ্য।’

নির্বাচনের ফল মেনে নেয়ার আহবান জানিয়ে তিনি লিখেন, ‘যা হবার হয়ে গেছে। আপাতত তা পরিবর্তন করার বুদ্ধি বা ক্ষমতা কোনোটাই আমাদের নাই। এটি চরম বাস্তবতা। ভারত ও চীনসহ অনেক রাষ্ট্র প্রধানরা বাংলাদেশের নির্বাচন মেনে নিয়েছেন। অন্যরাও ধানাইপানাই করে মেনে নেবেন। আপনারা অযথা বাগাড়ম্বর করে বিএনপির নেতাকর্মীদের জীবন দুর্বিসহ করে দিয়েন না।’

বিএনপির জেষ্ঠ্য নেতাদের সমালোচনা করে আখতারুজ্জামান লেখেন, ‘এমনিতেই দলের ১০০ ভাগ নেতাকর্মী জেল জুলুমের শিকার। আর আপনাদের নেতাগিরি দেখাতে গিয়ে বিএনপির অস্তিত্ব বিলুপ্ত করে দিয়েন না।’

বিএনপির অনেক নেতা এখন বলতে শুরু করেছেন, ড. কামাল হোসেন আসলে সরকারের এজেন্ট। বিএনপিকে নির্বাচনে আনার দায়িত্ব নিয়েই ড. কামাল হোসেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেছিলেন। অনেকে আরেকটু আগ বাড়িয়ে বলছেন, এজেন্ট হিসেবেই ড. কামাল মিশনে নেমেছিলেন। তিনি নিজে নির্বাচন করলেন না। সারাটা সময় বললেন, ভোট বর্জন করবো না। এর অর্থ কী? বিএনপির একজন নেতা বলেন, ‘আওয়ামী লীগের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।’ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্যই তাঁরা ড. কামাল হোসেনকে ভাড়া করে। ড. কামাল হোসেনের একমাত্র দায়িত্ব ছিল বিএনপিকে নির্বাচনে আনা এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে রাখা। ড. কামালের এই দায়িত্ব গ্রহণের পিছনে কলকাঠি নেড়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভরাডুবির পর বিএনপিতে এখন জোরেসোরেই ড. কামাল হোসেনের ভূমিকা নিয়ে কথা হচ্ছে। বিএনপির অনেক নেতাই বলছেন, ‘ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে যাওয়ার সিদ্ধান্তটাই ছিল ভুল। জামায়াতের সঙ্গে যেমন কখনো আওয়ামী লীগের ঐক্য হবে না, ঠিক তেমনি সাবেক আওয়ামী লীগারদের সঙ্গেও বিএনপির কখনও ঐক্য হতে পারে না। ড. কামালের সঙ্গে ঐক্য তার সত্যতা প্রমাণ করল।

যদিও মুখ রক্ষা ও রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে এই নির্বাচন স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু হয়নি বলে ড. কামাল হোসেন ও বিএনপি নেতারা অভিযোগ তুলেছেন, নির্বাচন বাতিল করে নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন ড. কামাল-মির্জা ফখরুলদের এই অভিযোগ ও ফলাফল প্রত্যাখ্যান রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ। তাঁরা নিজেরাও জানে তাঁদের এই অভিযোগ ও প্রত্যাখ্যান আসলে ধোপে টিকবে না। এর চেয়ে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো দেশেই হয় না। এমনকি আমেরিকার বিগত দুটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও হয়নি। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মহল নির্বাচন মেনে নিয়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুভেচ্ছা জানাতে শুরু করেছে। চীন, ভারত, সৌদি আরব, নেপাল, শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপ্রধানরা শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। অন্যরাও অচিরেই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে শেখ হাসিনা সরকারকে অভিনন্দন জানাবেন এতে কোন সন্দেহ নেই।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে