আপডেট : ৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১৩:৫৭

বিপর্যয়ে দায়ী হবেন ড. কামাল

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
বিপর্যয়ে দায়ী হবেন ড. কামাল

বিএনপির রাজনীতিতে কোনটা মুখ, কোনটা মুখোশ— ফারাক করা খুবই কঠিন। তারা মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক নিয়ে, মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নিয়ে, শহীদের সংখ্যা নিয়ে–সময়ে সময়ে বিতর্ক সৃষ্টির বহু চেষ্টা করেছে। এবার তাদের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, জামায়াতেও নাকি মুক্তিযোদ্ধা আছে। নজরুল ইসলাম খান আমার সমবয়সী হবেন। সুতরাং আমরা উভয়ে নিশ্চয়ই মুক্তিযুদ্ধ দেখেছি, মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনে ভূমিকা রেখেছি, অথবা মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছি।

সুতরাং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে কোন সংগঠনের কী ভূমিকা, তা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। সাক্ষী হিসেবে আমাদের মতো হাজার হাজার লোক এখনও জীবিত। তাই মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা, শহীদের সংখ্যা নিয়ে কল্পকাহিনি না বলাই উত্তম। মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা নাকি মেজর জিয়া দিয়েছিলেন, তার ঘোষণা শুনে নাকি সারাদেশে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল। আর লাখ লাখ লোক মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল! তাহলে মেজর জিয়া, অলি, শওকত কার ঘোষণা শুনে কালুরঘাট ব্রিজের নিচে পাক-বাহিনীর মোকাবিলায় অবস্থান নিয়েছিলেন?

মেজর জিয়া কালুরঘাট রেডিও থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে একটা ঘোষণা দিয়েছিলেন। চট্টগ্রামের বেতার কেন্দ্রটি ছিল খুবই ছোট, ৩৩ বর্গমাইলের মধ্যে শোনা যেতো। এমনকি ফেনী পর্যন্তও শোনা যেতো না। তাহলে সারাদেশে লোক তার বেতার ভাষণ শুনে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে, এ কাহিনিটা সত্য হয় কীভাবে? অলি আহাদ তার বইয়ে লিখেছেন, তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় তার বেতার ভাষণ শুনেছেন আর একজন সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন, তিনি উত্তরবঙ্গে বসে শুনেছেন। অথচ চট্টগ্রাম বেতারের ফ্রিকোয়েন্সি ৩৩ বর্গমাইলের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল। তাদের কথা সত্য না বিজ্ঞান সত্য?

পুরনো চাল ভাতে বাড়ে। এ বিতর্কে শাহ মোয়াজ্জেম একটা সমাধান দিয়েছিলেন। তিনি বলতেন, জিয়া স্বাধীনতার ‘ঘোষক নন’ তিনি স্বাধীনতার ‘পাঠক’। এ বেতার ভাষণটিতে মেজর জিয়া নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করায় তাকে মুক্তিবাহিনীর প্রধান কর্নেল ওসমানি  কোর্ট মার্শালে দিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নেতাদের হস্তক্ষেপে কর্নেল ওসমানি তা থেকে বিরত হয়েছিলেন। আর কারও ঘোষণায় স্বাধীনতার যুদ্ধ হয়নি দীর্ঘ ২৩ বছরব্যাপী বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি গ্রহণের মধ্য দিয়েই সমগ্র বাঙালি জাতিকে মানসিকভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যাডওয়ার্ড হিথ বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন ‘আপনার একটা ভাষণ একটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে দীর্ঘ ৯ মাস স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেরণা জুগিয়েছিল। বিশ্ব ইতিহাসে এটি এক বিরল ঘটনা।’

ঐতিহাসিক ঘটনার ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিত পর্যালোচনা করে সত্যে উপনীত হতে হয়। মনগড়া কথায় ইতিহাস হয় না। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়েও বহু বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামের জহুর আহম্মদ চৌধুরীকে স্বাধীনতা ঘোষণার ম্যাসেজ দিয়েছিলেন। এ কথা নিয়েও বহুজন বহু কথা লিখেছেন। বিমান বাহিনী প্রধান একে খন্দকার তার লেখা বইয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে কথাটা শেষপর্যন্ত নাকচ করে দিয়েছিলেন। অথচ ওইদিন রাতে জহুর আহম্মদ চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার কথা প্রচারের জন্য মাইক বের করে দিয়েছিলেন। আমরা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা রাত ২টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহরে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার কথা মাইকে প্রচার করেছি।

২টার পর চট্টগ্রাম শহরের ওপর পাকিস্তান নৌ-বাহিনীর শেলিংয়ের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় মাইকিং বন্ধ হয়েছিল। আমরা যারা মাইকিং করেছিলাম, তাদের মাঝে বহু কর্মী এখনও বেঁচে আছেন। এটা আমাদের মাঠকর্মীদের কথা। পণ্ডিতেরা এরপরে কী বলেন, কী জানি। আমরা আমাদের বিশ্বাস করবো, নাকি তাদের কথা?

তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুর একটা ঘোষণা টেপ রেকর্ডে ধারণ করতে চেয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু তা দেননি। তিনি ম্যাসেজ আকারে ঘোষণাটি জহুর আহাম্মদ চৌধুরীর কাছে পাঠিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। সেই থেকে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত তার কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, তার কোনও কাজেই অসামঞ্জস্য ছিল না। সব কর্মকাণ্ডের গতিমুখ ছিল স্বাধীনতা অভিমুখী এবং তিনি তাতে সফল হয়েছিলেন।

যা হোক, লিখতে বসেছিলাম নজরুল ইসলাম খান যে বলেছেন,  জামায়াতে  মুক্তিযোদ্ধা আছে তার প্রতিবাদ জানানোর জন্য। কারণ, নীলক্ষেত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ পর্যন্ত পাওয়া যায় মুক্তিযোদ্ধার সনদ তো জল ভাত। সুতরাং যে মুক্তিযাদ্ধা জামায়াতে আছে তা যে নীলক্ষেতের সনদধারী মুক্তিযোদ্ধা, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। জামায়াতে এখন যারা নেতৃত্বে আছেন, তারা ৭১ সালের আল-বদর গ্রুপের সদস্য। আল-বদর গ্রুপের কর্মকাণ্ডে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তারা এতই সন্তুষ্ট ছিলেন যে, শেষপর্যন্ত তাদের পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর অংশ হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছিল।

এই রাজাকার–আল-বদররা পরাজিত হয়েছে সত্য কিন্তু তারা সে পরাজয় থেকে কোনও শিক্ষা গ্রহণ করেনি। এখনও তারা মনে প্রাণে পাকিস্তানি। তারা মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা সব কিছুইকে ঘৃণা করে। তারা কোনও প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে গ্রহণ করবে এই কথা কল্পনা করাও যায় না। অবশ্য রাজনীতির স্বার্থে হয়তোবা কিছু ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সৃষ্টি করে তাদের সঙ্গে রাখতে পারে।

মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তাদের ঘৃণা অনেক গুণ বেড়ে গেছে। সেই জামায়াতকে এবার বিএনপি আরও কাছে টেনে ২৫ জনকে ধানের শীষ ধরিয়ে দিয়ে বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তামাশা করলো। তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে আবার মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগও আছে।

আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ড. কামাল হোসেন, আ স ম রব, কাদের সিদ্দিকী বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত আগে থেকেই জোটবদ্ধ। তাদের বন্ধন এত শক্ত যে, দেশি-বিদেশি কোনও চাপই তাদের বন্ধন ছিন্ন করতে পারেনি। কর্নেল অলি আর মেজর জেনারেল ইব্রাহিম একসময় তীব্র জামায়াতবিরোধী ছিলেন। এখন অলি তো তাদের ইফতার পার্টিতে প্রধান অতিথি হন। শাহাজাহান সিরাজ যেমন বোরকা বদলানোর পর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার অনিবার্য অংশ বলতে আরম্ভ করেছিলেন, এরাও অনুরূপ কোনও ফতোয়া দেন কিনা তা নিয়েই সংশয়ে আছি। ভক্ত বৈকুণ্ঠ লাভ করার জন্য বহু লীলাই তো প্রদর্শন করেন।

ড. কামাল সাহেবের গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আছে জানি। মানুষের বিশেষ কোনও উপকার করতে না পারলেও মানুষের ক্ষতি তো কখনও করেননি। কিন্তু তিনি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে পরিত্যাগ করে একা একা বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে এখন যেভাবে কাজ করছেন তাতে তিনি যদি সফল হন তবে মানুষের, রাষ্ট্রের, কোনও কল্যাণ হবে বলে মনে হয় না। বরং তারা যদি ক্ষমতায় আসতে পারে তবে হত্যাযজ্ঞের রাস খুলে যাবে। যারা যাত্রীবোঝাই বাসে পেট্রোলবোমা মেরে নিরীহ যাত্রী হত্যা করতে পারে, যারা ট্রাক ড্রাইভারকে ট্রাক থেকে নামিয়ে রাস্তার ওপর মাথা রেখে ইট দিয়ে মাথা থেঁতলা করে হত্যা করতে পারে। মানুষগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার কোনও অস্ত্র হাতে না রেখে ড. কামাল হোসেন যে এদের ক্ষমতার সিঁড়িতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তার শেষ পরিণতিতে রাষ্ট্রের অবস্থা কী হবে?

অভিজ্ঞতা থেকে উপলব্ধিতে উপনীত হয়ে এ কথাগুলো বলছি। শেখ হাসিনার সরকার কর্তৃত্ববাদী বলে কামালসহ সুশীলদের অভিযোগ। গার্মেন্টসের প্রস্তুত করা পোশাকের বোঝাই করা ৭০০ ট্রাক যদি মিলিটারি পাহারায় শিপমেন্টের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠাতে হয়, তবে কিছুটা কর্তৃত্ববাদী না হয়ে উপায় কী? এই ৭০০ ট্রাক মালামালে আগুন দিতে পারলে দেশের কত হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হতো বা এলসির সময়সীমার মাঝে শিপমেন্ট করতে না পারলে এবং এলসি সময় উত্তীর্ণ হয়ে কাপড়গুলো স্টক লট হয়ে গেলে গার্মেন্টস সেক্টরে কেয়ামতের নমুনা দেখা দিতো।

বিরোধী দল নিয়মতান্ত্রিক না হলে সরকারি দলকে কর্তৃত্ববাদী হতে হয়। আমাদের দুর্ভাগ্য যে ড. কামাল হোসেন একটা সুসংগঠিত নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী দল সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার একমাত্র জীবিত মন্ত্রী, তার কাছে মামার বাড়ির গল্প বলে লাভ নেই। ১৯৭২ সালে সিরাজুল আলম খানের দাদাগিরিতে, শত শত পাটের গুদাম আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কি কর্তৃত্ববাদী বাকশাল সৃষ্টি হয়নি?

বিএনপি ২০১৩ ও ২০১৫ সালে রাজনীতির নামে যে পেট্রোল বোমার যজ্ঞ করলেন সেটা বানচাল করা কি সরকারের জন্য অপরিহার্য ছিল না? সেদিন সরকার নির্বিকার থাকলে তো  খালেদা জিয়ার পোড়ামাটি নীতির আঘাতে দেশ ছারখার হয়ে যেতো। সুতরাং আমরা ড. কামালকে অনুরোধ করবো তিনি যখন নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণের কোনও কিছুই রাখলেন না তখন তার এখন পাগলা ঘোড়াকে সহায়তা করার প্রচেষ্টা বন্ধ করাই মনে হয় উত্তম হবে। অন্যথায় নির্বাচন পরবর্তী রক্তক্ষয়ের জন্য জাতি তাকেই দায়ী করবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

সূত্র-বাংলা ট্রিবিউন

উপরে