আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ২৩:১৬

বিএনপির দশ ঐতিহাসিক ভুল

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
বিএনপির দশ ঐতিহাসিক ভুল

জিয়াউর রহমান যখন বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন তখন তিনি ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। অস্ত্রের মুখে ক্ষমতা দখল করা অবৈধ সেনাশাসক পরিচয় মুছে ফেলে ইতিহাসে জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত হওয়ার অভিপ্রায় থেকেই তিনি বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন।

কিন্তু বিএনপি এমন একটি দল যার জন্ম হয়েছে সেনা ছাউনি থেকে। সাধারণত সেনা ছাউনি থেকে জন্ম নেওয়া দলগুলো খুব বেশিদিন জাতীয় রাজনীতিতে অবস্থান ধরে রাখতে পারে না। এদিক থেকে বিএনপি ব্যতিক্রম। এই দলটি কালের বিবর্তনে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছে।

বিএনপির জন্মের ইতিহাস বলে, গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্গে দলটির মেলবন্ধন কোন কালেই ছিল না। সময়ের চক্রে বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে সত্যি কিন্তু তাদের আদর্শিক দেউলিয়াপনা সবসময়ই রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনার বিষয় হয়েছে।

মেজর জিয়াউর রহমান একবার বলেছিলেন, ‘আই উইল মেইক পলিটিক্স ডিফিকাল্ট ফর দ্য পলিটিশিয়ান।’ অর্থ্যাৎ ‘আমি রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতিকে কঠিন করে তুলবো।’ কিন্তু কালের কী অদ্ভুত বিচার। প্রতিষ্ঠার ৪০ তম বার্ষিকীতে এসে বিএনপি দেখতে পাচ্ছে, অন্যদের জন্য রাজনীতি কঠিন করতে গিয়ে তাঁদের নিজেদের জন্যই রাজনীতিটা এখন কঠিন হয়ে গেছে। নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাসে এত সঙ্কটময় কাল বিএনপির জন্য আর আসেনি। এই সঙ্কটের জন্য মোটা দাগে বিএনপির ১০টা ভুল সিদ্ধান্তকে দায়ী করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।

১) জিয়াউর রহমান যখন বিএনপি গঠন করেন তখন তিনি জামায়াতে ইসলামী, স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। বিএনপির প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান। এই শাহ আজিজ ছিলেন একজন স্বীকৃত রাজাকার। এই থেকেই স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গে জিয়ার দহরম-মহরম কেমন তা বোঝা যায়। জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রচিত যে সংবিধান সে সংবিধান কাটাছেড়া করে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র বাদ দিয়েছিলেন এবং গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে প্রথমেই স্বাধীনতা বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির পৃষ্ঠপোষক দল হিসেবে এই দলটির একটি চরিত্র দাঁড়িয়ে যায়। স্বাধীনতাবিরোধী রাজনীতির যে ধারা বিএনপি চালু করেছিল, বিএনপিকে আজকে তার মূল্য দিতে হচ্ছে।

২) বিএনপি বাংলাদেশে টাকা দিয়ে কেনাবেচার রাজনীতি চালু করে। দল কেনাবেচা, দল ভাঙা, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভেঙে নিজেদের দল ভারী করার ধারার প্রবর্তন করে বিএনপি। আওয়ামী লীগ সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বিএনপির এই কর্মকাণ্ডের ভূক্তভোগী হয়। টাকা দিয়ে আদর্শ কেনাবেচা করে দল গঠন করার মূল্য এখন বিএনপিকে দিতে হচ্ছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

৩) বিএনপির রাজনীতির আরেকটি বড় ভুল ছিল ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে পাস করিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ বন্ধ করে দেওয়া। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি থেকে রক্ষা করার জন্য তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ এই ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করেন। মোশতাক অধ্যাদেশ জারি করলেও জিয়াউর রহমানই ছিলেন তখন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু উনি এই অধ্যাদেশ বাতিল করেননি। ওই সময় যদি জিয়া ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল করতেন তাহলে বিএনপি রাজনৈতিক আদর্শের একটি উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারতো। কিন্তু তা না করে জিয়া কর্নেল ফারুক, কর্নেল রশিদের মতো বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করলেন, পৃষ্ঠপোষকতা দিলেন। এর মাধ্যমে বিএনপি নিজেদের পচাত্তরের খুনিদের রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রমাণ করলো। ওই সময়টাতে রাজনৈতিক বিভাজনের যে ধারা বিএনপি সূচনা করেছিল তার প্রতিফল এখন তারা ভোগ করছে।

৪) বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি কলুষিত করার দায়টিও নিতে হবে বিএনপিকে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান হিজবুল বাহার নামক একটি জাহাজে শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিয়ে ভ্রমণে যেতেন। সেই ভ্রমণগুলোতেই শিক্ষার্থীদের ব্রেইন ওয়াশ করে বিএনপির ভ্রষ্ট আদর্শে তাদের দীক্ষা দেওয়া হতো। গোলাম ফারুক অভি, নীরুর মতো অনেক মেধাবী ছাত্র এই হিজবুল বাহারের বলি। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, আদর্শের বদলে অর্থ দিয়ে রাজনীতি করার ধারা শুরু করেছিল বিএনপি। রাজনীতিতে অস্ত্র, পেশীশক্তি, কালো টাকার ব্যবহারের মাধ্যমে রাজনীতিকে কলুষিত করার যে প্রক্রিয়া শুরু করেছিল বিএনপি আজকে তার মূল্যই বিএনপিকে দিতে হচ্ছে। দলের ক্রান্তিকালীন সময়ে যে বিএনপি আন্দোলন করতে পারছে না তার কারণ তাদের কোনো ত্যাগী, আদর্শিক কর্মী নেই। একটি রাজনৈতিক দলের যদি কোনো আদর্শ না থাকে তবে শুধু টাকা পয়সা দিয়ে আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনা করা যায় না। নিজেদের আদর্শহীন রাজনীতির কারণেই এখন ভুগছে বিএনপি।

৫) জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। তখনো তাদের সামনে সুযোগ ছিল জিয়ার অপকর্ম, রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচারের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন বিএনপি গড়ার। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখার মাধ্যমে বিএনপির সামনে এমন একটি পথ সৃষ্টিও হয়েছিল। এর ফলেই একটি দিনবদলের প্রত্যাশা থেকে ’৯১ এর নির্বাচনে বিএনপিকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে জনগণ। কিন্তু ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়ার বিএনপিও জিয়াউর রহমানের বিএনপির ধারাবাহিকতাই রক্ষা করলো। যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে থাকা, স্বাধীনতাবিরোধীদের মদদ দেওয়া, পচাত্তরের খুনিদের সঙ্গে মিত্রতা করার কাজগুলো নব উদ্যমে শুরু করলো বিএনপি। ফলে স্বাধীনতা বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির বদনাম আর ঘুচলো না। গণতান্ত্রিক পথে রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেও গণতান্ত্রিক দল হিসেবে নিজেদের পুনর্গঠন করার সুযোগটি না নিয়ে বিএনপি আরও একটি ভুল করলো।

৬) ২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির রাজনীতিতে অভ্যুদয় ঘটলো জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক জিয়ার। তারেক জিয়ার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বিএনপির রাজনীতিকে আরও কলুষিত করলো। বিএনপি হয়ে গেল দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন ও কালো টাকার আখড়া। সেবার বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ পরপর তিনবার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়। তারেকের বাসভবন হাওয়া ভবন থেকে আসতে থাকলো সরকারি গুরুত্বপুর্ন অনেক সিদ্ধান্ত, দুর্নীতির মচ্ছব বসলো সেখানে। দুর্নীতিবাজ হিসেবে ব্র্যান্ডিং হয়ে গেল তারেক জিয়ার। তাঁকে মানুষ চিনতে লাগলো দুর্নীতির বরপুত্র হিসেবে। তারেক জিয়ার কর্মকাণ্ডে তাঁর পিতা জিয়াউর রহমানের সময় বিএনপির অর্থনৈতিক সততার যে একটা প্রলেপ ছিল সেটিও ধ্বংস হয়ে গেল। বিএনপির যে সকল নেতাকর্মী-সমর্থক আদর্শ ছাড়াই শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সততা দেখে বিএনপিকে পছন্দ করতেন তাদের কাছেও দলটি আস্থা হারিয়ে ফেললো।

৭) জামায়াত নির্ভরতা বিএনপির আরেকটি বড় ভুল। জিয়াউর রহমান জামায়াতকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছিলেন আর খালেদা জিয়া শুরু করেন পুরোপুরি জামায়াত নির্ভর রাজনীতি। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে একাত্তরের রাজাকার-আলবদরদের মন্ত্রী বানিয়ে তাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দিলেন বেগম জিয়া। এসব ঘটনায় জামায়াত থেকে বিএনপিকে আর আলাদা করার সুযোগ রইলো না, জামায়াত-বিএনপি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। এর ফলে দেশের তরুণ সমাজ, সেক্যুলার সমাজ, মুক্ত চিন্তায় বিশ্বাসী সমাজের আস্থাও হারিয়ে ফেললো বিএনপি।

৮) বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি সবচেয়ে বড় বিভাজন রেখাটি তৈরি করেছিল ২০০৪ সালে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে। ওই হামলার মাধ্যমে যে সন্ত্রাস ও প্রতিপক্ষকে নির্মূলের রাজনীতি চালু করেছিল বিএনপি তাই দলটিকে সবচেয়ে বড় সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

৯) বিএনপির আরেকটি ভুল ছিল আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা সংলাপে বসার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে যে টেলিফোন করেছিলেন, তাকে অগ্রাহ্য করা। শেখ হাসিনার সঙ্গে সংলাপে বসলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত তা কেউ মনে করে না। তবে এর মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্র প্রস্তুত হতো, এটাই বা কম কিসে। একই সঙ্গে জিয়াউর রহমানের ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মারা যাওয়ার পর সান্তনা দিতে গুলশানে মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু তাঁকে ভিতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। গুলশান কার্যালয়ের সামনে থেকে ফিরে এসেছিলেন শেখ হাসিনা। এই ঘটনাটিকেও রাজনৈতিক মহল ভালো চোখে দেখেননি। বিএনপি এখানেও যে ফেল মেরেছে, তা হলফ করে বলে দেওয়া যায়।

১০) বিএনপির সর্বশেষ বড় ভুল হলো ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেওয়া। রাজনৈতিক মহল মনে করেন, ওই নির্বাচনে অংশ নেওয়াটা বিএনপির উচিত ছিল। নির্বাচনে অংশ না নিয়ে তা প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়ে একাধারে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলনের কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়া। দেশজুড়ে জ্বালাও-পোড়াও করা। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের দিনকে গণতন্ত্রের কালো দিবস আখ্যায়িত করে এ আন্দোলন এতদূর টেনে নিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। এই আন্দোলনে যে জ্বালাও-পোড়াও ও মানুষের ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে, তার পুরো দায়ভার সরকার বিএনপির ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। যদিও বিএনপি দাবি করেছে, এর জন্য ক্ষমতাসীন দল ও সরকার দায়ী। কিন্তু এতদিন আন্দোলন করার কারণে অনেক নেতা-কর্মীর প্রাণহানি ঘটেছে, আহত হয়েছেন অনেকে। আবার অনেকের নামে দেওয়া হয়েছে মামলা। বলা হয়, মামলায় পর্যুদস্ত দল হচ্ছে বিএনপি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, বিএনপি যদি ওই নির্বাচনে যেত তাহলে আজকে তাঁদের ৪০ বছর পূর্তির দিনটি এতটা বিবর্ণ, এতটা সংকটময় হতো না।

 

লেখক- সাংবাদিক ও কলামিস্ট

উপরে