আপডেট : ১৯ আগস্ট, ২০১৮ ১৪:৪৩

নেতৃত্বশূন্য বিএনপির সামনে দুর্গম পথ

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
নেতৃত্বশূন্য বিএনপির সামনে দুর্গম পথ

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে ৬ মাসেরও অধিক সময় কারাগারে আছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও একাধিক মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। স্বাভাবিক ভাবেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁদের অংশগ্রহণের কোন সুযোগ নেই। শীর্ষ দুই নেতা নির্বাচনে অযোগ্য হওয়ায় চরম নেতৃত্ব সংকটে বিএনপি।

এদিকে সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণও ঘনিয়ে আসছে। সব ঠিক থাকলে নভেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল। ডিসেম্বরের শেষে কিংবা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন। এর আগে অক্টোবরেই গঠন করা হবে নির্বাচনকালীন সরকার। সবমিলে মাঝে সময় আর মাত্র দুই মাস। এখন পর্যন্ত দাবি আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে নেতৃত্বশূন্য বিএনপির সিনিয়র নেতারা স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। আওয়ামী লীগকে ‘বৈধতা’ দেয়ার কোনো নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না, এই ইঙ্গিত দলটির শীর্ষ নেতারা দিলেও নেতৃত্বশূন্য বিএনপিতে ছোট ছোট কয়েকটি অদৃশ্য বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে আছে তারেক রহমানের আস্থাভাজন গ্রুপ। দলে অনেকটা কট্টরপন্থী অবস্থান এদের। এই দলটির সঙ্গেই জামায়াতের সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি। এরা মূলত খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং সহায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণে অনিচ্ছুক। আরেক দিকে আছে মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বাধীন গ্রুপ। দলে এদের অবস্থান অনেকটা উদারপন্থী। যে কোন পরিস্থিতিতে এরা নির্বাচনে যেতে ইচ্ছুক। আরেকটি ভাগ আছে, যাদের মূলত বলা হয় সুবিধাবাদী গ্রুপ। এরা অপেক্ষায় আছে যদি বিএনপির অবস্থান সুবিধাজনক না হয়, বিএনপি যদি নির্বাচনে না আসার সিদ্ধান্তে অটল থাকে তাহলে এরা জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে নির্বাচন করবে।

প্রায় এক যুগ ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটিকে সংগঠিত করা নিয়েও বিপাকে রয়েছেন নীতি-নির্ধারকরা। বেশিরভাগ কমিটি পূর্ণাঙ্গ না করায়, হঠাৎ করেই কোনো কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি নিলে তা বাস্তবায়ন করার সামর্থ দলটির আপাতত নেই। এই যখন অবস্থা, তখন প্রশ্ন উঠছে দাবি আদায় আর নির্বাচন নিয়ে কতটা প্রস্তুত রাজপথের বিরোধী দল বিএনপি? দলটির রাজনীতির ভবিষ্যতইবা কী? প্রশ্ন উঠছে বিএনপির রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০১৪ সালের নির্বাচন আর ২০১৮ সালের নির্বাচন এক নয়। গতবার সরকার চেয়েছিল বিএনপি নির্বাচনে না যাক। এবার বিএনপিকে নিয়ে সরকারের কৌশল একটু ভিন্ন। তারা চাইছে, নির্বাচন ঘিরে বিএনপিতে বিভক্তি সৃষ্টি বা দলছুট একটি অংশকে নিয়ে নির্বাচন করা, যাতে সরকার বৈধতা পায়।

আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, বিএনপির এই মহাসংকট উপভোগ করছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। আগামী নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি যে বড় ধরনের অগ্নিপরীক্ষায় পড়েছে- তা স্পষ্ট রাজনৈতিক মহলে। খালেদা জিয়া ছাড়া নির্বাচন নয়- এমন সিদ্ধান্তে অটল থাকলে সরকার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার দোহাই দিয়ে বিএনপিকে ছাড়াই গতবারের মতো আরেকটি নির্বাচন সম্পন্ন করবে। এতে ফের বিএনপি ছিটকে পড়বে সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির ধারা থেকে।

সত্যি বলতে কী, আগামী নির্বাচনে যাওয়ার ওপরই বিএনপির ভবিষ্যত নির্ভর করছে। অন্তত তার টিকে থাকা। তারপর সে নির্বাচন কেমন হবে, তার ফল কী হবে, সেটা পরের বিবেচ্য বিষয়।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে অনেকগুলো ঐতিহাসিক ভুল করেছে বিএনপি। সেগুলোর সংশোধন না করতে পারলে দলটির পক্ষে আওয়ামী লীগের ‘কৌশল তছনছ’ করে ক্ষমতায় ফেরা সম্ভব হবে না।

প্রথমত, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও  মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দল জামায়াতে ইসলামির প্রশ্নে এখন পর্যন্ত কোনও সঠিক অবস্থান নিতে পারেনি বিএনপি। বিএনপির উচিত ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। তাতে দলের কিছু নেতা ফেঁসে গেলেও আখেরে দলেরই লাভ হতো। আর মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দলকে এখনও ছাড়তে না পারা বিএনপির নৈতিক অবস্থানকেই দুর্বল করে রেখেছে। বরং এতে নানাভাবেই লাভবান হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের ইসলামিস্টদের বড় একটা অংশ, যারা মূলত জামায়াতবিরোধী, তাদেরও হারিয়েছে বিএনপি।

দ্বিতীয়ত, ২০১৪ সালের নির্বাচনকে ‘বানচাল’ করতে অবরোধের নামে দেশজুড়ে যে জ্বালাও পোড়াও এর রাজনীতি তারা করেছে, সে ভুলের মাশুল ‘মামলা, গ্রেফতার, বিচার ও সাজার ভয়ে তটস্থ থেকে’ এখনও গুনছে তারা। বলতে গেলে এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কোর্টে দীর্ঘমেয়াদে বল ঠেলে দিয়েছে তারা।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নেতৃত্ব শূন্যতার পাশাপাশি বিএনপির বুদ্ধিজীবী শূন্যতাও চোখে পড়ার মতো। বরং দলটি জামায়াতপন্থীদের পরামর্শ দ্বারা বেশি প্রভাবিত বলেই মনে হয়। অথচ এই জামায়াত প্রশ্নেই দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতারা পর্যন্ত নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। এই ঐতিহাসিক ভুলগুলোর ফয়সালা না করে বিএনপির পক্ষে আওয়ামী লীগের কৌশল তছনছ করা দূরে থাক, নিজের দল গোছানোই কঠিন হয়ে যাবে।

বিএনপির মূল শক্তি হলো অ্যান্টি আওয়ামী লীগ সেন্টিমেন্ট। আর এই সেন্টিমেন্টই সব সময় বিএনপিকে ক্ষমতায় নেয়। দলটির জনকল্যাণ মূলক কোন এজেন্ডাই নেই। বিএনপির ভাগ্য ভালো যে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগবিরোধী অনেক লোক আছে এবং যাদের চোখে কার্যত কোনও বিরোধী শক্তি না থাকায় তারা বিএনপির সমর্থক হয়ে ওঠে। গত এক যুগে কিছু রাজনৈতিক বুলি আওড়ানো ছাড়া জনসম্পৃক্ত কোনও ইস্যুতে বিএনপি কি কঠোর কোন আন্দোলন করতে পেরেছে? জনগণের চাহিদাকে পাশ কাটিয়ে দলটি রাজপথ পেরিয়ে কেবল ক্ষমতার যেতে চেয়েছে। কিন্তু জনশূন্য রাজপথ কি আর কাউকে ক্ষমতায় নিতে পারে?

বিএনপি সময় অসময়' গ্রন্থের লেখক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, “বিএনপি জিয়াউর রহমান মারা যাবার পর এবং এরশাদের সময়েও সংকটে পড়েছে। ওয়ান ইলেভেনের সময়েও একটা বড় সংকট তাদের গেছে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি জটিল। দলতো আছে, কিন্তু সবচে বড় সমস্যা হচ্ছে দলের মধ্যে সংহতিটা থাকবে কিনা। কারণ এই দলের অনেক নেতা অতীতে দল ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন আবার এসেছেন, আবার চলেও যেতে পারেন। সরকার থেকে নানা টোপ ও চাপ তাদের দেয়া হতে পারে। সুতরাং এই সময়টা বিএনপির জন্য খুবই নাজুক।”

বিরোধী দল ও মতের প্রতি সরকারের কঠোর অবস্থানও স্পষ্ট। এ অবস্থায় ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে কি কোনো ভাবনা আছে বিএনপিতে? এমন প্রশ্নে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “নেতৃত্বের কোনো সংকট বিএনপিতে নেই। নতুন কিছু ভাবার নেই। আমরা এগুলো নিয়ে এতটুকু চিন্তিত নই, শঙ্কিত নই। এটা পার্ট অব পলিটিক্স। যতই ষড়যন্ত্র করা হোক বিএনপিকে রাজনীতি থেকে সরানো যাবে না। এটা সম্ভব না।”

মির্জা ফখরুল বলছেন বটে, তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা এবং বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিএনপি একটি পরিবার কেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল। পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির সমস্যাটা হচ্ছে এখানে পরিবার থেকে যদি ঐ ধরনের ক্যারিশম্যাটিক লিডার বেরিয়ে না আসেন তখন ঐ রাজনীতি বেশিদিন টেকে না । অতীতে আমরা দেখেছি মুসলিম লীগের একই পরিণতি হয়েছে। এছাড়া কৃষক শ্রমিক পার্টি ও ন্যাপেরও একই পরিণতি হয়েছে। এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে বিএনপিকেও হয়ত একই পরিণতি বরণ করতে হবে।

লেখক-সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

উপরে