আপডেট : ৮ মার্চ, ২০১৮ ১৯:১৭

মূর্তি ভাঙ্গার অভ্যেস মুসলিম মৌলবাদীদের, হিন্দুরা কেন?

তসলিমা নাসরিন
মূর্তি ভাঙ্গার অভ্যেস মুসলিম মৌলবাদীদের, হিন্দুরা কেন?

ভারতীয় জনতা পার্টি জিতেছে ত্রিপুরায়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। পঁচিশ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটেছে। কেউ কেউ বলছে বামের ধস, রামের উত্থান। গণতন্ত্রে কারও ধস নামা, কারও উত্থান থাকেই। কিন্তু যা সবচেয়ে অগণতান্ত্রিক তা হলো, পরাজিত দলের কার্যালয় ভেঙ্গে ফেলা, তাদের বাড়িঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া, তাদের ওপর হামলা করা। তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচনে জেতার পর পশ্চিমবঙ্গেও একই রকম হামলা চালিয়েছিল সিপিআইএম (কম্যুনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া, মার্কসসিস্ট) কার্যালয়ে, পার্টির কর্মীদের ধরে ধরে পিটিয়েছিল।

বর্বরতার কোনও স্থান নেই গণতন্ত্রে। অথচ গণতন্ত্রের উৎসব তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি একইরকমভাবে পরাজিত দলের ওপর তাণ্ডব চালিয়ে করেছে।

সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত ছিল, বুলডোজার দিয়ে লেনিনের মূর্তি উপড়ে ফেলার দৃশ্য। মূর্তি ভেঙ্গে ফেলার অভ্যেস মুসলিম মৌলবাদীদের। আইসিস ভেঙ্গেছে ইরাক আর সিরিয়ার প্রাচীন সব ভাস্কর্য, ঐতিহাসিক ইমারত। তালিবান ভেঙ্গেছে বিশাল বামিয়ান বুদ্ধ, জামাতিরা ভেঙ্গেছে বাংলাদেশের লালন মূর্তি। কিন্তু হিন্দু মৌলবাদীরা দেখাচ্ছে তারাও মুসলিম মৌলবাদীদের মতো ভেঙ্গে ফেলতে জানে, গুঁড়িয়ে ফেলতে জানে। দলবল নিয়ে ভেঙ্গেছিল বাবরি মসজিদ। এবার ভেঙ্গেছে লেনিনের মূর্তি। ভাঙ্গাভাঙ্গিতে সব ধর্মের মৌলবাদীরা যেন এক কাতারে ভাই ভাই হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। কাউকে আর আলাদা করে চেনা যায় না।

রাজনীতির প্রতিপক্ষকে যুদ্ধের শত্রু হিসেবে গণ্য করা ভীষণরকম অগণতান্ত্রিক। যে দল জিতেছে ত্রিপুরায়, সেই দল এবং দলের সমর্থকরা ভাঙ্গনের পক্ষে যুক্তি দেখাচ্ছে যে, এসবই সিপিএমের কর্মফল। সিপিএম হেরেছে নির্বাচনে, এটিই কি তাদের এতকালের অপকর্ম আর অরাজকতার শাস্তি নয়? তাদেরকে পিটিয়ে, মেরে, তাদের বাড়িঘর অফিস ধ্বংস করে কি তাদের আলাদা করে শাস্তি দিতে হবে? কোন গণতন্ত্র এ কথা বলে যে পরাজিত দলের ওপর অত্যাচার নির্যাতন করে তাদের শাস্তি দাও?

যুদ্ধে পরাজয় হলে এককালে দেওয়া হতো এরকম শাস্তি, পরাজিতদের বাড়িঘর লুটপাট করা হতো, পুড়িয়ে দেওয়া হতো তাদের অঞ্চল, তাদের মেয়েদের গণিমতের মাল হিসেবে ধরে নিয়ে যাওয়া হতো। পরাজিতদের ধন সম্পদ, তাদের স্ত্রী কন্যা মা বোন সবাইকে, যুদ্ধে জয়ীদের, মনে করা হতো, আছে যা ইচ্ছে তাই করার অধিকার। সেই যুগকে আমরা বলি অন্ধকার যুগ। গণতন্ত্রের হারজিত অন্ধকার যুগের যুদ্ধের হারজিত নয়। বর্বরতা কোনও সভ্য সচেতন মানুষ কোনও কিছুর যুক্তি হিসেবে মেনে নেয় না। নেয় না বলেই হিটলারকে মেনে নেয়নি, মুসোলিনিকে মেনে নেয়নি, স্টালিনকে নেয়নি, পল পটকে নেয়নি।

ত্রিপুরার বিজেতা গোষ্ঠীর সব রাগ গিয়ে পড়েছে লেনিনের ওপর। ওই রাজ্যের কম্যুনিস্টরা কি সত্যিই লেনিনের আদর্শ মেনে চলতেন? আমি তো দেখি না ভারতীয় উপমহাদেশের কোথাও সত্যিকার কম্যুনিজমের চর্চা হচ্ছে, দেখি না কম্যুনিস্ট নামে পরিচিত লোকেরা আদৌ কোনও কম্যুনিস্ট। কম্যুনিস্টদের অনেককেই দেখেছি ধুমধাম করে বারো মাসে তেরো পুজো করেন, ধুমধাম করে ঈদ করেন, ক্রিসমাস করেন।

পশ্চিমবঙ্গের কথাই ধরি, ৩৪ বছর ক্ষমতায় ছিল সিপিএম। কী করেছেন নেতারা পশ্চিমবঙ্গে? তাঁদের তো কথা ছিল না ধর্মীয় মৌলবাদকে তোষণ করার, অথচ করেছেন। তাঁদের তো কথা ছিল না ধর্মীয় উপাসনালয় গড়ার, অথচ গড়েছেন। তাঁদের তো কথা ছিল না রাজ্যের ধনী আর গরিব শ্রেণিকে ধনী আর গরিব বানিয়ে রাখা, অথচ রেখেছেন। তাঁদের তো কথা ছিল না নারী নির্যাতন মেনে নেওয়া, নারীর নিরাপত্তাহীনতা মেনে নেওয়া, তাঁরা তো পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অজুহাত দিয়ে মেনে নিয়েছেন।

বিজেতা গোষ্ঠী লেনিনের মূর্তি ভেঙ্গেছে। লেনিনকে ভাঙ্গলে কিন্তু সিপিএমকে ভাঙ্গা হয় না। সিপিএম যে অন্যায়গুলো করেছে, সেই অন্যায়গুলো না করলেই সিপিএমকে ভাঙ্গা হয়। যে ভুলগুলো করেছে, সেই ভুলগুলো না করলেই ভাঙ্গা হয়। সাধারণ মানুষকে যেভাবে বোকা বানিয়েছে, যেভাবে ঠকিয়েছে, সেভাবে আর বোকা না বানালেই, না ঠকালেই ভাঙ্গা হয়। মানুষের যে আস্থা একটু একটু করে সিপিএমের ওপর থেকে সরে গেছে, সেই আস্থা আবার অর্জন করলেই সিপিএমকে ভাঙ্গা হয়।

লেনিনের পক্ষে স্লোগান দেওয়া ছাড়া লেনিনের কোনও আদর্শকে সিপিএমের প্রায় কেউই মেনে চলেন নি। নারীর সমানাধিকারের জন্য, শ্রেণিবৈষম্য দূর করার জন্য ভারতীয় উপমহাদেশের কোনও কম্যুনিস্ট রাজ্য আদৌ কি কোনও চেষ্টা করেছে? ৩৪ বছরের বাম শাসকরা ধর্মীয় মৌলবাদ তোষণ করতে গিয়ে সমতার সমাজে আর নারীর সমানাধিকারে সারা জীবন বিশ্বাস করা লেখককে পশ্চিমবঙ্গ থেকে তাড়িয়েছেন। যে লেখক সবরকম ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে, জাতপাতের বিরুদ্ধে দীর্ঘকাল লড়াই করছে, সেই মুক্ত চিন্তক লেখককে বাম নেতারা রাজ্যে রাখতে চাননি, মৌলবাদীদের দুটো ভোট পাওয়ার লোভে।

৩৪ বছর শাসন করেও কী ভীষণভাবে সমাজতান্ত্রিক আদর্শকে রক্ষা করতে ব্যর্থ পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম! নিজের জীবন দিয়ে আমার তা দেখা হয়েছে। সে কারণেই হয়তো সামান্য টোকা পড়তেই ঝুরঝুর করে ঝরে পড়েছে তাঁদের এত দিনকার নড়বড়ে প্রাসাদ। মমতার মতো এক্সেন্ট্রিক মহিলার কাছে ভূলুণ্ঠিত হলো বাম রাজনীতির বাঘা বাঘা সব নেতা। ভারতবর্ষে সিপিএমের করুণ দশা সবাই দেখছে। ত্রিপুরার পর কেরালায় সিপিএমের নিভু নিভু প্রদীপটিও হয়তো একদিন দপ করে নিভে যাবে। চারদিকে দক্ষিণপন্থিদের বিজয়ের উৎসব। সারা পৃথিবীতেই এই উৎসব। দক্ষিণপন্থিদের আশকারা পেয়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে কট্টরপন্থিরা। ইউরোপ আমেরিকায় চলছে বর্ণবাদের বর্বরতা। বামদের ভুলের কারণে ভুগছি আমরা সাধারণ মানুষ।

ভারতবর্ষের সিপিএম সত্যিকার শ্রেণিবৈষম্য না ঘুচিয়ে ব্যস্ত ছিল কী করে মুসলিম মৌলবাদীদের প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে ওদের ভোট আদায় করা যায়, কী করে ক্ষমতায় চিরকালের জন্য বসে থাকা যায়। দারিদ্র্য দূর করার কোনও উদ্যোগ কি সত্যিই নিয়েছে? ফুটপাথে, স্টেশনে, হাটে ঘাটে বস্তিতে দিন দিন দরিদ্রের সংখ্যাই শুধু বেড়েছে। সিপিএমের গুণ্ডারা গ্রামে গঞ্জে, শহরে নগরে মানুষের জীবন অতিষ্ঠই শুধু করেছে। গদিতে বসে শুধু আরাম করেছে পার্টির লোকেরা আর পার্টির লোকদের খাতিরের লোকেরা।

আমার আত্মজীবনীর তৃতীয় খণ্ড ‘দ্বিখণ্ডিত’ পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার নিষিদ্ধ করেছিল। কী ছিল বইটিতে? বাংলাদেশে আশির দশকে সেকুলার সংবিধান বদলে একটি রাষ্ট্রধর্মের আমদানি হয়েছিল, সেটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ছিল। তাছাড়া ছিল বাংলাদেশে কী করে মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হলে কী করে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছি। মৌলবাদীরা আমার বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছে, আমার মাথার দাম ঘোষণা করেছে, তারপরও মোটেও দমে যাইনি, পিছু হটিনি। এই বইটিকে নিষিদ্ধ করার জন্য কোনও মুসলমান তো নয়ই, কোনও মুসলমান মৌলবাদীও দাবি করেনি, কিন্তু কম্যুনিস্ট বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। দু বছর পর মহামান্য আদালত বইটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে প্রমাণ করেছে সিপিএম বই নিষিদ্ধের পক্ষে যা বলেছে, তা নিতান্তই যুক্তিহীন। কপটতা ছিল নেতাদের কাজকর্মে। লেনিনের কোনও আদর্শই তাঁদের আদর্শ ছিল না। আহ, বর্বর স্টালিনের পক্ষেও তো তাঁরা গীত গেয়েছেন।

লেনিনের কোনও আদর্শের সঙ্গে যেহেতু সিপিএমের আদর্শ ছিল না, তাই লেনিনের সঙ্গে সিপিএমকে সম্পর্কিত করা উচিত নয়। লেনিন সারা জীবন শ্রেণি আর লিঙ্গবৈষম্য দূর করার জন্য প্রাণপাত করেছিলেন। লেনিন ব্যর্থ হতে পারেন। সারা পৃথিবী থেকেই কম্যুনিজম বিদেয় নিয়েছে, তার মানে কিন্তু এই নয় যে লেনিনের সমতার সমাজের স্বপ্ন কোনও খারাপ স্বপ্ন ছিল। লেনিনের আদর্শ কোনও দেশেই টেকেনি, কারণ মানুষ তার লোভ, স্বার্থপরতা, হিংসে ইত্যাদি ত্যাগ করতে আজও অপারগ।

ভারতবর্ষের রাস্তাঘাটে বিশ্বের অনেক নেতার, অনেক স্বপ্নচারীর, বিজ্ঞানীর, অনেক দার্শনিকের মূর্তি আছে। তাঁদের ধ্যান ধারণে আজকের যুগে হয়তো অচল। কিন্তু তাঁদের মূর্তি কিন্তু ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে না। তাঁরা ইতিহাস হয়ে মূর্তি রূপে দাঁড়িয়ে আছেন। শুধু সিপিএম নামের দলটি লেনিনের মূর্তি গড়েছিল বলে সেই মূর্তি ভেঙ্গে ফেলতে হবে তার কোনও যুক্তি নেই। পৃথিবীতে লেনিন একটি আন্দোলনের নাম। একটি স্বপ্নের নাম। সারা পৃথিবী একদিন জেগে উঠেছিল লেনিনের দেখানো স্বপ্ন দেখে। স্টালিনের কুকর্মের দায় লেনিনের নয়।

নতুন সরকার ভবিষ্যৎ গড়বে, তাই বলে ত্রিপুরায় একসময় বামের শাসন ছিল, এই চিহ্নকে, বা এই ইতিহাসকে গুঁড়ো করতে হবে কেন। ভবিষ্যৎ গড়তে হলে অতীতকে নিশ্চিহ্ন করার দরকার পড়ে না। অতীতকে অস্বীকার না করেই ভবিষ্যৎ গড়তে হয়। অতীতের ভুলগুলো দেখে আমরা ভুল না করতে শিখি। কিন্তু বারবারই দেখছি, যে ভুল পুরনোরা করেছে, সেই একই ভুল নতুনরাও করছে। পৃথিবী কি তাহলে এভাবে এখানেই থমকে থাকবে?

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে