আপডেট : ৬ নভেম্বর, ২০১৭ ১৮:২১

বারবার পাক ষড়যন্ত্রেও আক্কেল হয় না আমাদের

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
বারবার পাক ষড়যন্ত্রেও আক্কেল হয় না আমাদের

প্রায় অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে এসেও স্বাধীনতার প্রশ্নে আজও আমরা জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে পারিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা কে করেছেন সেটা নিয়ে আজও দ্বিধাবিভক্ত আমরা।

এই বিভক্তিই কিন্তু আজ অবধি সম্মিলিতভাবে দেশকে সামনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা। দূঃখজনক বিষয় হচ্ছে এই বিভক্তি জিইয়ে রেখেছে আমাদের দেশের প্রধান কয়েকটি রাজনৈতিক দলই। এসব দল স্বাধীনতাবিরোধীদের পৃষ্টপোষক ও লালনকারী হিসেবে চিহ্নিত। স্বাধীতার এই মৌলিক প্রশ্নে ঐক্যমত্য হতে না পারা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য চরম লজ্জার ও অবমাননাকর। স্বাধীনতার বিশেষ একটি মান মর্যাদার সাথে জড়িত, এমন একটি বিষয় নিয়ে অহেতুক বিতর্ক করা কখনই উচিত নয়। কিন্তু আমাদের দেশে অনুচিত অনেক কিছু্‌ই ঘটে যা বিশ্বে আর কোন দেশে ঘটে না।

এই বিভক্তিই জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে আমাদের মাথা তুলে দাঁড়াতে দেয়নি অর্ধশতাব্দী পরেও। এই বিভক্তির সুযোগ নিয়ে বহিঃশক্তিগুলো আমাদের দেশ নিয়ে খেলছে। বিশেষ করে একাত্তরে পরাজিত শক্তি পাকিস্তান তার দোসরদের দিয়ে এই বিভক্তি সৃষ্টি করেছে। একাত্তরে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতেই দেশটি এই ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই।

গত ৩১ অক্টোবর ঢাকার পাকিস্তান দূতাবাস থেকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য ও ধৃষ্টতাপূর্ণ একটি একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

ভিডিওটির শিরোনাম এমন – ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নন, জিয়াউর রহমানই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক’। সেই ভিডিওতে আরো দাবি করা হয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতাই চাননি; তিনি স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিলেন।

পাকিস্তান দূতাবাসের এই বিদ্বেষমূলক প্রচারণাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে স্পষ্টত প্রতীয়মান। যে ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে তার মধ্যে সুস্পষ্ট উসকানি রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত বিষয়াদি নিয়ে পাকিস্তান দূতাবাসের এই নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা উদ্দেশ্যপূর্ণ ও দূরভিসন্ধিমূলক বলেই আমরা মনে করি।

অথচ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ বিষয়ে বিভ্রান্তি বা বিতর্কের কোন সুযোগ নেই। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বাংলাদেশ এমনভাবে জড়িত যে একটি থেকে আরেকটি পৃথক করা যায় না। বঙ্গবন্ধুকে ভালো না বাসলে বাংলাদেশকে ভালোবাসা যায় না। বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশের স্থপতি ও অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে সারা বিশ্ব একবাক্যে মেনে নিয়েছে। শুধু মানতে পারেনি একাত্তরের পরাজিত শক্তি পাকিস্তানও তাঁদের এদেশীয় দোসররা। তাঁরা বিভিন্ন সময়ে অনাকাঙ্খিত অনেক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ বিষয়টাও তাঁদের সেই ঘৃণ্য চক্রান্তের অংশ। জিয়া তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্পষ্ট উল্লেখ করেছিলেন ‘অন বি হাফ অব শেখ মুজিবুর রহমান’। এমনকি জিয়া তাঁর জীবদ্দশায় কখনও বলেননি তিনি স্বাধীনতার ঘোষক। মূলত জিয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের পাঠক ছিলেন মাত্র। একজন পাঠক যে কখনও ঘোষক হতে পারে না এই সহজ সমীকরণটাও বিতর্ককারীদের মাথায় আসে না।

পাকিস্তানি ষড়যন্ত্র ও পৃষ্টপোষকতায় চালু হওয়া এই ঘোষক বিতর্ক যাতে জাতিকে আর পিছনে ঠেলে না দেয় সেজন্য আমাদের মহামান্য আদালতও রায় দিয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছেন ২০০৯ সালের ২১ জুন। এদিন এক ঐতিহাসিক রায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেই স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে রায় দেন আদালত। তবুও এই আত্মবিনাশী বিতর্ক থামছেনই না। নতুন করে সেই আগুনে ঘি ঢেলেছে পাকিস্তান দূতাবাস।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে স্বাধীনতার এত বছর পরে এসে পাকিস্তান কেন এই বিতর্কে ঘি ঢাললো? তাঁদের উদ্দেশ্য কি? তাহলে কি বাংলাদেশ নিয়ে তাঁরা নতুন কোন ভয়ঙ্কর খেলায় মেতেছে? পাকিস্তানের প্রেতাত্মা যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির কাস্টে ঝুলানো এবং তৎপরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিষয়টি যতেষ্ট উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।

সেই ২০০৬ সাল থেকে পাকিস্তানের মদদপুষ্ট বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতার বাইরে। যুদ্ধাপরাধীদল জামায়াত নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় বিগত নির্বাচনে অংশ নেয়নি তাদের জোটসঙ্গী বিএনপি। নির্বাচন বানচাল করতে নানামূখী ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাস চালিয়েও সফল হতে পারেনি তাঁরা। সেই থেকেই পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইএর প্রেসক্রিপশন ও সহযোগীতায় ভিন্নপথে দেশের শাসনভার নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে বিএনপি-জামায়াত জোট। লন্ডনে বসে তাদের অন্যতম নেতা তারেক রহমান আছেন এই ষড়যন্ত্রের অগ্রভাগে। সেখানে বসেই বসেই একের পর এক দেশবিরোধী চক্রান্ত করছেন তিনি। সেখানে তিনি দফায় দফায় আইএসআই’র কর্মকর্তাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন বলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে খবর এসেছে। সর্বশেষ দেশে যে রোহিঙ্গা সংকট সেখানেও লন্ডনে বসে কূটচাল চেলেছেন তারেক ও পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। অন্তত গণমাধ্যমের খবরে এমনটিই জানা যাচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে বলা হয়েছে, আইএসআই’র ব্রিগেডিয়ার আশফাক এবং মেজর সালামতের সঙ্গে লন্ডনে বৈঠক করেছেন তারেক রহমান। ভারতের দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টির নেপথ্যে মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএস এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিস ইনটেলিজেন্স (আইএসআই) মূলত কলকাঠি নাড়ছে। এবারের রোহিঙ্গা সংকটের সূত্রপাত হয়েছে মূলত আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মির (আরসা) মিয়ানমারের সেনা চৌকিতে আক্রমনের মধ্যদিয়ে। আর এই আরসা সৃষ্টির মূল কুশীলব হচ্ছেন আইএসআই’র ব্রিগেডিয়ার আশফাক এবং মেজর সালামত। তাদের তত্বাবধান ও প্রশিক্ষণেই গড়ে উঠেছে আরসা। যাদেরকে মিয়ানমারে অপরিণামদর্শী হামলার মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের ঘাড়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা চাপানোর মূল কারিগর ভাবা হচ্ছে।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে এতটুকু বোঝা যাচ্ছে_ রোহিঙ্গা সংকট, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিতর্কিত রায়, জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক আখ্যা দিয়ে পাকিস্তান দূতাবাসের ধৃষ্টতাপূর্ণ ভিডিও প্রকাশ, খালেদা জিয়ার লন্ডন থেকে ফিরেই রোহিঙ্গাদের দেখতে যাওয়া এবং পথে পথে নানা নাটকীয়তার জন্ম দেওয়া, বিএনপির ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গার সার বেঁধে রাস্তায় দাঁড়ানো সবই একই ষড়যন্ত্রসূত্রে গাঁথা।

সবদিক বিবেচনায় এটা বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশ অচিরেই বেশ বড় ধরণের ঝামেলায় পড়তে যাচ্ছে। হতে পারে বাংলাদেশকে সমস্যায় ফেলতে এটা উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক কৌশল। সব কিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে ষড়যন্ত্রকারীদের মূল টার্গেট এখন বাংলাদেশ। আর এ শঙ্কাটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র সঙ্গে বাংলাদেশের জামায়াত-বিএনপির যোগসাজশ।

লেখক : সাংবাদিক, রাজনীতি বিশ্লেষক

উপরে