আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২১:০১

সমুদ্র বিজয় আমাদের, মিয়ানমারের দাবার চাল ভিন্ন দিকেই ধাবিত হবে!

কাকলী প্রধান
সমুদ্র বিজয় আমাদের, মিয়ানমারের দাবার চাল ভিন্ন দিকেই ধাবিত হবে!

উখিয়ায় পৌঁছেই চোখে পড়তে শুরু করলো। ক্যামেরা অন করাই ছিল। ঝটপট গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। তারপর আর যেন থামাথামি নেই। জনসমুদ্র! চলছে তো চলছেই। উখিয়ার কুতুপালং থেকে টেকনাফের নয়াপাড়া পর্যন্ত। কক্সবাজার টেকনাফ মহাসড়কের (আরাকান সড়ক) ৩৫ কিলোমিটার মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিছিল।
চলমান মিছিলে লাখ লাখ মুখ। দুঃখ হতাশা আর ক্লান্তিতে মাখামাখি চেহারাগুলোর মধ্যে কোন মুখের ওপর লেন্স স্থির হবে? মুহূর্তকাল আমিও যেন কেমন হতাশায় ডুবে গেলাম। স্রোতে ভেসে ভেসেই ছবি তুলছি আর বিচিত্র চিন্তা হানা দিচ্ছে মাথায়।
আমাদের মতো ছোট্ট একটা দেশে আমরা এদের কোথায় ঠাঁই দেব! এতো বিপুল পরিমাণ মানুষের কর্মসংস্থান কোথায় হবে! এদের খাদ্য আসবে কোথা থেকে! আমাদের দেশেই কতো গরিব মানুষ তার সংখ্যা জানা নেই। কত মানুষের ঘর নেই। দু’বেলা খাবার জোটে না। সত্যি কথা বলতে কী মানবিকতা এবং সহমর্মিতার পাশাপাশি এই প্রশ্নগুলোর লড়াই শুরু হয়ে গেলো মনের ভেতর। ভূ-রাজনীতির কূ-চক্রকারীরা হয়তো দূরে কিংবা আমাদের মরে বসেই গোঁফে তা দিচ্ছে আর মিটমিট হাসছে। বিজয়ের হাসি। হয়তোবা!

ক্যামেরা চলছে। অসংখ্য শিশুর মুখে বারবার বাড়ি খাচ্ছে লম্বা লেন্স। বুক পেট সাদা ব্যান্ডেজে মোড়ানো ছোট্ট শিশুর মুখ চোখে পড়লো। আগুনে ঝলসানো ছোট্ট শিশু আসাদ, জোহরা, নেসাবু এরকম হাজারও শিশু। আমার চলার সঙ্গী হয়েছে রোহিঙ্গাপল্লীতে দশ বছর ধরে বেড়ে ওঠা কয়েকজন কিশোর। তারা বেশ ভালো সাংবাদিক এবং দোভাষী ভূমিকা পালন করেছে। একের পর এক রোহমর্ষক সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করে আনছে ওরা। হঠাৎ করে কিশোরদের একজন হায়হায় করে ওঠল। আমি বুঝতে না পেরে জানতে চাইলাম কী হলো! সামনে পাহাড় কাটার প্রতিযোগিতা চলছে। আমি ওর কাছে জানতে চাইলাম, ওরা তোমাদেরই মতো কেউ/ হয়তো তোমাদেরই আত্মীয় বা স্বজন/ তুমি পাহাড় কাটায় দুঃখ পাচ্ছো কেন! কিশোর তিনজনই অদ্ভুদভাবে মাথা নাড়লো। বললো- কথাটা ঠিক, কিন্তু এই দেশতো আমাদের থাকতে দিয়েছে। আমরা এখানেই বড় হয়েছি। নতুন যারা আসছে তাদের জন্য কষ্ট হচ্ছে তবে এই পাহাড়গুলো কাটা পড়ুক তা চাই না। ওরা জীবন নিয়ে পালিয়ে আসতে পেরেছে এজন্য আমরা খুশী কিন্তু এখানেও যেন কোনও ক্ষতি না হয়।

মহাসড়কের দুপাশে যে টিলাগুলো ছিল এক রাতেই সেগুলো রাস্তা বরাবর হয়ে গেলো মিয়ানমারের শরণার্থীদের কোদালের আঘাতে। মাটির তলদেশ থেকে শেকড়-বাকর তুলে ফেলা হলো। বিরানভূমি হয়ে গেলো সবুজ পাহাড়। যেখানে আর অকাতরে ডালপালা পাতা ছড়িয়ে গাছের মূল বের হবে না।

ছবি তুলি।শরণার্থীরা ভাবে সব অভাব আভিজাত্যের কথা বুঝি আমাদের বলা যায়। পাহাড় মালিকরা পাহাড়ে থাকার অনুমতি দিচ্ছেন না। আমরা রোহিঙ্গা কিশোর বাহিনীকে ওদের বুঝিয়ে বলি যে, এই পাহাড় মালিকরা অনেক টাকা দিয়ে পাহাড় কিনেছে। এখন তোমাদের থাকতে দিলে অর্থনৈতিকভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ওরা পাল্টা প্রশ্ন করে, তোমরা আমাদের ঢুকতে দিলে কেন? আমি উত্তর দেওয়ার আগেই কিশোর বাহিনী মারাত্মক রেগে গেলো। চোখ রাঙিয়ে ওদের বললো- তাহলে এরা কী করবে! চোখের সামনে তোমাদের মরে যেতে দিলে ভালো হতো!

সমস্যা সেখানেই। যে মানবতার কারণে বাংলাদেশ মিয়ানমারের এই বিশাল বোঝা মাথা পেতে নিল সেই চাপ কি আদৌ কোনও সফলতা বয়ে আনবে? সুফলের কথা নাই বিচার করি, তারপরেও যেসব কুফল চোখের সামনে সাদামাটা ভাবেই ধরা পড়ছে বাংলাদেশে তা মোকাবিলা করবে কিভাবে?

বেশ কয়েকদিন এক নাগাড়ে আসা যাওয়া এবং কাজ করার ফাঁকে একটি বিষয় খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করা গেছে। তা হলো প্রত্যেকটি শিবিরে বিভিন্ন  অসাধু মহলের হোতা এবং ‘চ্যালারা’ ঘুরে রেড়াচ্ছে। যে যার মতো করে গোপন মিটিং থেকে শুরু করে প্রকাশ্য প্রচারণা, ধর্মীয় বিদ্বেষের উস্কানিমূলক যাবতীয় শব্দ ছড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশ কি পারবে এই চক্রগুলোকে ঠেকাতে?

দীর্ঘদিনের অত্যাচারিত, নিপীড়িত, অবহেলিত প্রায় নিঃশেষ হয়ে যাওয়া জাতি মিয়ানমারের এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। যারা বাংলাদেশের আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে একখণ্ড নিরাপদ মাটি খুঁজছে। বিশাল ক্ষতচিহ্ন নিয়ে আবার ফিরে যেতে চায় নিজ ভূমিতে। যে জাতগত এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ওদের ক্ষতে ক্রমাগত আঘাত করে যাচ্ছে তা যেন কোনোভাবেই আমার দেশে ছড়িয়ে না পড়ে। সেই সুযোগ কোনও না কোনও মহল নিতে চাইবেই।

এই কঠিন কাজটিও বাংলাদেশেকে করতে হবে অত্যন্ত কৌশলে। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা, রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ তৈরিতে নিজস্ব কুটনৈতিকদের সাহায্য ছাড়াও বাইরের কুটনৈতিকদের সহযোগিতা নেওয়া প্রয়োজন। নিপীড়িত মানুষগুলোর জন্য না কেঁদে ওদের কণ্ঠস্বরকে প্রতিষ্ঠিত করে দিতে হবে পারাটাই হবে আমাদের স্বার্থকতা। এটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু মানবতার ইতিহাসে বাংলাদেশ যে দৃষ্টান্ত রাখলো তা সবার অনুকরণীয় হওয়া উচিত। মনে রাখা দরকার, উখিয়ার স্থানীয় জনগোষ্ঠী মাত্র তিন থেকে চার লাখ। এখন দ্রুত প্রয়োজন মিয়ানমারের প্রায় এগারো লাখ রোহিঙ্গার বোঝা থেকে দেশকে মুক্ত করা। তা না হলে বাংলাদেশ অচিরেই সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক চাপের মধ্যে পড়বে।

সমুদ্র বিজয় আমাদের। তাই মিয়ানমারের দাবার চাল ভিন্ন দিকেই ধাবিত হবে। বিজ্ঞ এবং চিন্তাশীল মানুষের জন্য ইশারাই যথেষ্ট। এটা একটা হুঁশিয়ারি হয়তোবা।

লেখক: সিনিয়র ফটোসাংবাদিক, দৈনিক কালের কণ্ঠ

উপরে