আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১১:২৩

রোহিঙ্গাদের চাপ আর কত নেবে বাংলাদেশ?

সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন
রোহিঙ্গাদের চাপ আর কত নেবে বাংলাদেশ?

গত বছর বন্ধু শাজাহান কবির গিয়েছিলেন ইতালীর মিলানে একটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শণীতে। সেখানে দক্ষিন এশীয় ব্যবসা সংক্রান্ত একটি সম্মেলনে বক্তৃতায় তিনি বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কথা বলেছিলেন। বক্তৃতার এক পর্যায়ে তিনি জানান গত পনের বিশ বছর ধরে বিশ লাখ শরনার্থীকে পুষছে বাংলাদেশ। তার এই কথার সূত্র ধরে বক্তৃতার শেষে তিনি ব্যপক প্রশ্নবানে বিদ্ধ হন। তাকে প্রশ্ন করা হয় বাংলাদেশে শরণার্থী আছে এমন তথ্যের ভিত্তি কি?। অনেকের কাছেই বিষয়টি ছিল এটা কোন সত্য কথা নয়। পরে যখন তিনি সবাইকে গত বিশ বছর ধরে মিয়ানমার থেকে ধেয়ে আসা রহিঙ্গা শরণার্থীদের কথা বলেন তখন সবাই-ই তাজ্জব হয়ে যান। অনেকেরই এই তথ্যটি জানা ছিল না।

পৃথিবীর ইতিহাসে এই মূহুর্তে সবচেয়ে বেশি শরণার্থী রয়েছে কোন দেশগুলোতে? অ্যমেনেস্টির সূত্র ধরে আল জাজিরার একটি প্রতিবেদন পড়েছিলাম কয়েকদিন আগে। প্রতিবেদনটিতে দশটি দেশের তালিকা দিয়েছে যারা সবচেয়ে বেশি শরনার্থীদের নিজ নিজ দেশে আশ্রয় দিয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে জর্ডান, তুরস্ক, পাকিস্তান, লেবানন, ইরান, ইথোপিয়া, কেনিয়া, উগান্ডা, কঙ্গো ও চাদ। কিন্তু বাংলাদেশের নাম নেই ওই তালিকায়। অথচ বাংলাদেশে গত তিন শতক ধরে মিয়ানমার থেকে আসা প্রায় বিশ লক্ষাধিক রহিঙ্গা শরণার্থীর ভারে জর্জরিত সেই হিসেব নেই অ্যমেনিষ্টির কাছে!

বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কতখানি বৈষম্যমূলক আচরণ করে আসছে এতেই বোঝা যায়। গতবছর সিরিয়ান শরণার্থীদের নিতে সারা পৃথিবীতে সমালেচনার ঝড় বয়ে গেছে আর এবছর বিগত পনের দিনেই প্রায় ৫ লক্ষাধিক রহিঙ্গা শরণার্থী বাধভাঙা স্রোতের মতো ধেয়ে এসেছে বাংলাদেশে, অথচ বিশ্ব বিবেক একদম চুপ! তারা কেউ কেউ বিবৃতি দিয়ে আবার সরেজমিনে দেখে শুনে কেঁদে কেটে কিছু ত্রাণ দিয়ে দেশে ফিরে গেছেন। চুপ বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোও। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? কেন রহিঙ্গারা গত এক যুগ ধরে বাংলাদেশে পাড়ি দিচ্ছেন কিন্তু ফিরে যাচ্ছে না? এর পেছনে আসল উদ্দেশ্য কি মিয়ানমারের?

মানবিকতার দিক দিয়ে হয়তো বাংলাদেশ বরাবরের মত এবারও রহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু আর কত? আর কত রহিঙ্গা শরণার্থীর চাপ বইবে বাংলাদেশ? রহিঙ্গাদের নিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে এক গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। ষঢ়যন্ত্র চলছে বাংলাদেশের বিরুদ্ধেও। জাতিসংঘ বারবার এই সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে আসলেও তা শুধু কাগজেই রয়ে গেছে। গত একযুগের বেশি সময় ধরে কুটনৈতিক তৎপরতায় একজন রহিঙ্গারও মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার রেকর্ড নেই।

রোহিঙ্গা নিধন মিয়ানমারের কোন ধর্মযুদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে দেশটির একটি সুদুর প্রসারী পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কয়েকটি দেশ। তাদের লক্ষ্য হলো ক্ষুদ্র জাতি স্বত্বা হিসেবে রাখাইন স্টেট থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করা। মিয়ানমারের সেনা নিয়ন্ত্রিত শিশু গণতান্ত্রিক সরকার এর বাইরে ঠিক এই মূহুর্তে নতুন কিছু ভাবতে পারছে না।

রোহিঙ্গা নিধন দেখে যখন বিশ্বের কতিপয় মুসলিম দেশ কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে, ঠিক তখনই বেশ কিছু গড়মিল ষ্পষ্ট হচ্ছে। মুসলিম বিশ্বের মুরুব্বী দেশ হিসেবে সৌদি আরবের নিরবতা একদম চোখে পড়ার মত। অথচ এই দেশটিতেই রোহিঙ্গা বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা পেয়ে আসছেন বহু বছর ধরে। এমন অভিযোগ অনেক আগে থেকেই করে আসছে মিয়ানমার।

পৃথিবীতে মুসলিমদের দুঃখ দুর্দশা দেখে দুঃখে বুক ভাসিয়েছে পাকিস্তান। এরকমটাই আমরা দেখে এসেছি বিগত বছরগুলোতে। অথচ বর্তমানে রাখাইন প্রদেশে সংগঠিত রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়ে একদম চুপ পাকিস্তান। চুপ তো থাকারই কথা। শুধু চীন নয়; মিয়ানমারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে আরেক মুসলিম দেশ পাকিস্তানও। কারণ এবছর ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের প্রভাবশালী ডন পত্রিকা সূত্রে জানা যায়, এবছর ডিসেম্বর মাস নাগাদ পাকিস্তানে তৈরী ১৬টি জেএফ-১৭ যুদ্ধ বিমানের একটি চালান যাবার কথা মিয়ানমারে। এই দু’টি দেশ মিলে কিছু দিন আগেই মিয়ানমারকে সামরিক সহায়তাও করেছে। বিশেষ করে নিজেদের সামরিক সরঞ্জাম রফতানির প্রয়োজনে মিয়নামারকে বেছে নিয়েছে পাকিস্তান। মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে নিজেদের অস্ত্র রফতানিকারক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সচেষ্ট দেশটি।

চলতি বছরের শেষ দিকেই মিয়ানমারের কাছে যুদ্ধ বিমান সরবরাহের কথা রয়েছে পাকিস্তানের। জেএফ-১৭ বিমানটি পাকিস্তান অ্যারোনোটিক্যাল কমপ্লেক্স ও চীনের চেংডু এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশনের যৌথ প্রচেষ্টার ফসল। এই যুদ্ধবিমান ক্রয়কারী প্রথম দেশ হবে মিয়ানমার।

আবার ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর মিয়ানমারের উত্তর পশ্চিম রাখাইন প্রদেশে দেশটির রোহিঙ্গা মিলিশিয়াদের সংগঠন আকায়ামুল মুজাহিদিন (এএমএম) যে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়েছিল- মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের দফতর থেকে এর দায়ভার আকারে ইঙ্গিতে পাকিস্তানের ওপরই দিয়েছিলো। মিয়ানমারের কয়েকটি পত্রিকা আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার বরাত দিয়ে সেসময় লিখেছিল এই হামলার পেছনে কলকাঠি নেড়েছে পাকিস্তানের রাষ্ট্রিয় গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিস ইন্টিলিজেন্স (আইএসআই)। মোদ্দাকথা এএমএম জানতো এরকম দু একটা মিয়ানমার পুলিশ মেরে তারা আদতে কিছুই করতে পারবে না। এর ফল ভোগ করবে সাধারণ রোহিঙ্গা জনগণ। আর এতে কার্যসিদ্ধি হবে মিয়ানমারের সামরিক ক্ষমতাপুষ্ট সরকারের। তারা ঢালাওভাবে রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেবে। এরই সাইড ইফেক্ট হিসেবে রোহিঙ্গা জনগোষ্টি জীবন বাঁচাতে বরাবরের মতো ছুটবে বাংলাদেশের দিকে। এ ছক যেন আগে থেকেই কাটা!

গত বছর ১৮ অক্টোবর মিয়ানমার বৈদেশিক বিনিয়োগ অবারিত করতে পুরাতন দুটি বিনিয়োগ আইন বাতিল করে ‘মিয়ানমার ইনভেস্টমেন্টল’ নামে নতুন একটি আইন পাশ করে। এতে বৈদেশিক বিনিয়োগের দরজা অবাধ করে দেওয়া হয়। সেই মাসেই রহিঙ্গা উগ্রবাদীদের চোরাগোপ্তা হামলার জেরে প্রায় এক লাখ রহিঙ্গা ছুটে আসে বাংলাদেশে। ঠাঁই নেয় কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায়।

২০১৬ সালের ৯ সেপেটম্বরের রহিঙ্গা জঙ্গিদের হামলার ঘটনার পরের দিন থেকেই রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কিছু উগ্রপন্থী বৌদ্ধিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠি। আর সেদিন থেকে প্রায় প্রতিদিনই বাংলাদেশে ঢুকছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। এতো গেল প্রায় এক বছর আগেকার কথা, এই তো মাত্র কয়েকদিন আগে গত ২৪ আগস্ট একইকায়দায় আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি (আরসা) নামের একটি উগ্রবাদী সংগঠন হামলা চালায় উত্তরপূর্ব রাখাইন রাজ্যের ৩০টি নিরাপত্তা চৌকিতে। এ ঘটনার জের হিসেবে ইতোমধ্যে কমপক্ষে চার লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী নতুন করে ঢুকে পড়েছে বাংলাদেশে। রোহিঙ্গারা আসছে আর আসছে। মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ তাদের ঠাঁই দিচ্ছে। কিন্তু ফিরে যাচ্ছে না কেউই। বিষয়টি হচ্ছে এমন যেন প্রতিটি বিফল হামলার বিপরিতে রাখাইন রাজ্য থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা ঢুকে পড়বে বাংলাদেশে। এতে জঙ্গিদের কি লাভ সেটা বোঝা না গেলেও এখানে লাভবান হচ্ছে দুটি পক্ষ। একটি মিয়ানমার, কারণ তারা চাচ্ছে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ছেড়ে চলে যাক। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ক্রমবর্ধমান রোহিঙ্গা শরণার্থীর চাপ বাংলাদেশের ওপর পড়লে বাংলাদেশে একটা বেশামাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। সেটাকে পুঁজি করবে তৃতীয় কোন শক্তি। মোদ্দাকথা, প্রতিটি চোরাগোপ্তা হামলায় রোহিঙ্গা জঙ্গিরা কিছু অর্জন করতে না পারলেও বেশ কঠিন চাপে পড়েছে বাংলাদেশ।

এভাবেই গত বিশ বছরে কমপক্ষে দশ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। যাদের মধ্যে মাত্র চার লাখের মতো শরণার্থী পরিচয় রয়েছে। বাকি যারা এসেছেন তারা সাধারণ জনস্রোতের মধ্যে মিশে গেছেন। তাদের অনেকের খবর নেই আমাদের কাছে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে এরকম একটি রোহিঙ্গা পরিবার পুলিশের হাতে আটক হয়েছিল বরিশাল লঞ্চঘাটে। এতে বোঝা যায় রোহিঙ্গারা আসলে ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশজুড়ে। এ খবরটি আসলেই বাংলাদেশের জন্য আতঙ্কের। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ জাতিগত দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের দায় কেন বইতে হবে বাংলাদেশকে?

এদিকে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও কেঁদে বুক ভাসিয়ে বাংলাদেশকে বলছে তোমরা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দাও, খাবার দাও, পানি দাও। বাংলাদেশও সামার্থ্যের বাইরে চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু তাতেও কারো সন্তুষ্টি নেই। দুদিন আগেই জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক দূত বলে গেছেন, যেটুকু জায়গা রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেটাও নাকি মানবেতর। সুদূর তুরস্ক থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেখতে উড়ে এসেছেন এরদোয়ান পত্নী। তিনিও কেঁদে বুক ভাসিয়ে আবার দেশে ফিরে গেছেন। এসেছিলেন, জাকার্তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীও। দেখে গেছেন। এর আগেও এরকম অনেকেই দেখে শুনে হতাশা প্রকাশ করে চলে গেছেন। সবাই দিয়েছেন ত্রাণের আশ্বাস। পেছনে পড়ে থেকেছে জনসংখ্যার চাপে ওষ্ঠাগত বাংলাদেশে আরও অতিরিক্ত ১০লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর চাপ। তাদের আশ্রয় খাদ্য জোগাচ্ছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পর্যটন নগরী কক্সবাজারের ভারসাম্য ইতোমধ্যে নষ্ট হবার পথে এই শরণার্থীদের চাপে। চুপ মুসলিম বিশ্বের মুরুব্বীরা। চুপ মানবাধিকার নিয়ে সরব পরাশক্তিগুলোও।

রহিঙ্গা ইস্যুতে মুসলিম বিশ্বের যে দেশগুলো সবার আগে এগিয়ে এসেছে তুরস্ক তাদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু শরণার্থী নিয়ে দেশটির পূর্ব অভিজ্ঞতা সুবিধার নয়। তুরস্ক উপকূলেই গত বছর শিশু আয়লান কুর্দির মতো হাজার হাজার সিরীয় শরণার্থীর মৃত্যু ঘটেছে। উনিশ শতকের শুরুর দিকে দেশটি ১৫ লাখ আর্মেনিয়ানদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে। কচুকাটা করেছে আর্মেনিয়ানদের। বিশ্লেষকদের মতে রহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশে তুরস্কের আগমন ঘটেছে মুসলিম বিশ্বের সুলতানের ভুমিকায়। তুরস্ক চাচ্ছে মুসলিম বিশ্বের অধিপতি হতে। আর এই এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতেই রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন এরদোয়ান। কার্যত এর বাইরে রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে তুরস্কের কোন আগ্রহই নেই।

রোহিঙ্গা নিধন ও নিপীড়ন বন্ধে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। কিন্তু এরপরও মিয়ানমারের প্রতি চীনের অব্যাহত সমর্থন রয়েছে।

মিয়ানমারকে চীনের এই অব্যাহত সমর্থনের কারণ হচ্ছে, মিয়ানমারে চীনের পদচারণা আরও জোরদার করা এবং তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে পশ্চিমা প্রভাব কমিয়ে আনা।

মিয়ানমারে প্রধান বিনিয়োগকারী দেশ হিসেবে চীনের দৃষ্টি নিবন্ধিত হয়েছে বঙ্গোসাগর তীরবর্তী রাখাইন রাজ্যের ক্যাউকফিউর সমুদ্রবন্দরের দিকে। যা ভারত মহাসাগরে তাদের অবস্থান জোরদার করবে।

গত মে মাসে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মিয়ানমারের একটি সমুদ্রবন্দরের ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ার নিতে চায় চীন। এছাড়া পুরো এশিয়াজুড়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপ্তি বাড়াতে মিয়ানমারের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের যে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা চীন নিয়েছে তার অংশ হিসেবে ক্যাউকফিউর গভীর সমুদ্রবন্দরে অগ্রাধিকার মূলক প্রবেশাধিকার পেতে অব্যাহতভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা।

এসব ছাড়াও মিয়ানমারের ক্যাউকফিউ থেকে চীনের দক্ষিণাঞ্চলের কুনমিং পর্যন্ত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের পাইপলাইন করতে দেশটির সঙ্গে চুক্তি করেছে চীন, যা ক্যাউকফিউতে ১০ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনারই অংশ। এছাড়া চীনের ইউনান প্রদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রেল যোগাযোগ স্থাপনেরও পরিকল্পনা রয়েছে চীনের, যদিও বিষয়টি স্থগিত বা পুনর্বিবেচনার পর্যায়ে রয়েছে।

মিয়ানমারে এমন অনেক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ দেশটির সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় জড়িত থাকায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে সরাসরি কিছু বলছে না চীন।

বাংলাদেশে ২০১৩ সালে সংগঠিত জ্বালাও-পোড়াও কর্মসূচী নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য বিবৃতি দিলেও বর্তমানে মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়ে তাঁরা মুখে কুলুপ এঁটেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর তো জানিয়েই দিয়েছে, তাঁরা রাখাইন স্টেটে কোন গণহত্যার প্রমাণ পায়নি। এ বিষয়ে রাশিয়ার রাশিয়ান সেন্টার ফর সাউথ এশিয়া বিষয়ক সংস্থার পরিচালক দিমিত্রি মোশিকভ মনে করেন রোহিঙ্গা গণহত্যার পেছনে আসলে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন যুক্তরাষ্ট। সম্প্রতি স্পুটনিক’কে দেয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি এমন কথাই জানান।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একাধিক ভূ-রাজনৈতিক খেলোয়াড়দের উত্থান ও স্বার্থ রক্ষাই মিয়ানমারের দুর্যোগপূর্ণ এই সংকটের নেপথ্য কারণ। সাম্প্রতিক সহিংসতার পেছনে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় কারণই জড়িত।

দিমিত্রি মোশিকভ বলেন, আদতে এই সংকটের পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক অনেকগুলো শক্তি। যারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় এই সংঘাত উসকে দিয়েছে। মিয়ানমারের সংঘাতের পেছনে মোটা দাগে তিনটি কারণ রয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথমত, এটি চীনের বিরুদ্ধে একটি খেলা, যেহেতু আরাকান [রাখাইন] অঞ্চলে চীনের খুব বড় বিনিয়োগ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় মুসলিম চরমপন্থাকে উসকে দেয়ার লক্ষ্যে এই সংকট তৈরি করা হয়েছে। তৃতীয়ত, এটি আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মাঝে বিরোধ সৃষ্টির একটি অপচেষ্টাও হতে পারে।

দিমিত্রি মোশিকভের মতে, শতাব্দী-দীর্ঘ এই দ্বন্দ্ব দক্ষিণ পূর্ব এশীয়ার স্থিতিশীলতা নষ্ট করার জন্য বহিরাগত কুশীলবদের একটি চক্রান্ত। বিশেষত রাখাইন রাজ্যের ভুগর্ভে যে বিপুল পরিমান হাইড্রোকার্বনের ভাণ্ডার সনাক্ত হয়েছে সেগুলির দখল নেওয়ার একটা কৌশল হচ্ছে এই রোহিঙ্গা নির্যাতন ও বিতাড়ন।

মোশিকোভ বলেন, ‘রাখাইনে বিপুল পরিমান গ্যাস ক্ষেত্র রয়েছে। এছাড়া, আরাকানের উপকূলীয় অঞ্চলে [রাখাইন] প্রচুর তেল ও হাইড্রোকার্বন সনাক্ত হয়েছে।’

২০০৪ সালে রাখাইনে বিপুল জ্বালানি সম্পদ আবিষ্কৃত হওয়ার পর মিয়ানমার দেশটিতে বিনিয়োগের জন্য চীনের মনোযোগ আকর্ষণ করে। ২০১৩ সালেই চীন তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করেছে। এই পাইপ লাইন মিয়ানমারের কিউকফিয়ার বন্দরকে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং বন্দরের সাথে সংযুক্ত করেছে।

এই তেল পাইপলাইন বেইজিংকে মালাক্কা প্রণালী বাইপাস করে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকান অঞ্চলে ক্রুড তেল সরবরাহের সুযোগ করে দিয়েছে। এবং গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মিয়ানমারের গ্যাস ক্ষেত্র থেকে হাইড্রোকার্বন চীনে পরিবহন করা যাবে।

২০১১-১২ সালে চীন-মিয়ানমার এনার্জি প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হবার পর থেকেই রাখাইনে রোহিঙ্গা সংঘাতের তীব্রতা পায়। সে সময় রক্তাক্ত সংঘাত এড়াতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে যায়।

রাশিয়ার পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটির স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ অ্যান্ড প্রগনোসিস অ্যাট দ্যা পিপল এর সহকারী পরিচালক দিমিত্রি ইগোরিচেনকভের মতে, ‘এটি সম্ভবত একটি কাকতালীয় ঘটনা। যদিও রোহিঙ্গা সঙ্কটের পেছনে কিছু অভ্যন্তরীণ কারণও রয়েছে, তবে মোটাদাগে এটি মূলত বহিরাগত কুশীলবদের দ্বারা সৃষ্ট ও অনুপ্রাণিত একটি ঘটনা। বিশেষ করে এর পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাত থাকতে পারে।

মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা চীনের জ্বালানি প্রকল্পকে প্রভাবিত করবে এবং এই অস্থিরতার কারণে মিয়ানমারের জ্বালানি প্রকল্পে বেইজিংয়ের দরজা বন্ধ হবে। এমন ধারণা থেকেই হয়ত যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাত উসকে দেওয়ার নেপথ্যে কাজ করছে। মার্কিন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে চলমান সংকটের কারণে এমনিতেই বেইজিং অস্বস্তিতে আছে। এবার আরেক ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী মিয়ানমারকে অস্থির করে চীনকে বিপাকে ফেলাই এই ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য।

ইগোরিচেনকভের মতে, মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরোসের অর্থায়নে পরিচালিত ‘বার্মা টাস্ক ফোর্স’ নামে পরিচিত বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ২০১৩ সাল থেকে রাখাইনে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তারা সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে দেশটিতে হস্তক্ষেপের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বারবার আহ্বান করছে। তবে, মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে জর্জ সোরোসের হস্তক্ষেপ দেশটির ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত হয়ে উঠেছে। তারা আসলে রহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না করে আরও ক্ষতের সৃষ্টি করেছেন।

২০০৩ সালে সোরোস একটি মার্কিন টাস্ক ফোর্স গ্রুপের সাথে যুক্ত হয়ে বার্মায় দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর আনতে এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে বার্মার সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কাজ শুরু করেন। দি কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনস্ (সিএফআর) ২০০৩ সালে “বার্মা: টাইম ফর চেঞ্জ” শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি প্রকাশ করে। যেখানে গ্রুপটির মূল কথা ছিল, “যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্য ছাড়া বার্মায় গণতন্ত্র বেঁচে থাকতে পারে না।”

মিয়ানমার প্রসঙ্গে সোরোস প্রথমেই জাতিগত বা সামাজিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের দিকে বিশেষ নজর দেন এবং নিজেদের মত করে এই সংকট নিরসণের লক্ষ্যে কাজ করেন। এটাই কোন একটি দেশের অভ্যন্তরীন বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের কৌশল বলে জানান ইগোরিচেনকভ।

সেন্টার ফর সাউথ এশিয়ার একাডেমিক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী ব্যবস্থাপনা নীতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষার চেষ্টার মাঝেই এই সংঘাতের বীজ রোপিত আছে।

রোহিঙ্গা চাপে বিপর্যস্ত বাংলাদেশ:

বাংলাদেশকে শুধু লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর চাপই সইতে হচ্ছে না সঙ্গে যোগ হয়েছে নানা সামাজিক সমস্যাও। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এতকাল রোহিঙ্গারা বর্বর, অসভ্য ও অপরাধ প্রবণ জাতি হিসেবেই বিবেচনা করেছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীর স্রোতের সঙ্গে দেশে ঢুকে পড়ছে ইয়াবা, অস্ত্র ও জঙ্গিরা। বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে এরা সব রকমের প্রচেষ্টাই অব্যাহত রেখেছে। সড়ক পরিবহন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘রোহিঙ্গাদের সাথে ইায়াবা, অবৈধ অস্ত্র ও জঙ্গির স্রোতও আসতে পারে। সে দিকে সবাইকে নজর রাখতে হবে। তাই বলে আমরা এই মানুষগুলোকে নদীতে ঠেলে দিতে পারি না।’

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সঙ্গে ঢুকছে ইয়াবার বড় বড় চালান। রোহিঙ্গার এই স্রোত থামাতে গিয়ে গলদ্ঘর্ম বিজিবি। তার ফাঁকে নজরদারির বাইরে চলে যাচ্ছে ইয়াবা চোরাচালান। মিয়ানমার থেকে সীমান্ত দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের পাশাপাশি এই ভয়ংকর মাদকের চোরাকারবারিরাও যেন প্রতিযোগিতায় নেমে গেছে। অনেকটা বাধাহীনভাবে তারা দেশের ভেতরে নিয়ে আসছে ইয়াবা ট্যাবলেটের চালান। নাফ নদ-তীরবর্তী সীমান্তের উখিয়া-টেকনাফ উপজেলার কমপক্ষে ২০টি পয়েন্ট দিয়ে পাল্লা দিয়ে ঢুকছে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী ও ইয়াবার চালান।

এছাড়া, রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় উন্মাদনাকে কাজে লাগিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল বাংলাদেশকে বিপর্যস্ত করে ফেলতে ভয়াবহ ষড়যন্ত্রে মেতেছে। ১০ লাখ রোহিঙ্গার সমাবেশ ঘটিয়ে বক্সবাজারকে ‘রোহিঙ্গা রাজ্য’ ঘোষণা করতে আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারেটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামিক ফ্রন্টের (আরিফ) নামের দুটো জঙ্গি সংগঠন বিদেশী অর্থ এবং অস্ত্রের মদতে পরিকল্পিতভাবে মিয়ানমারে প্রবেশ করে সাম্প্রদায়িক উসকানি দিয়ে, নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলা চালিয়ে সাধারণ রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশে বাধ্য করছে।

উপমহাদেশের পটভূমিতে বাংলাদেশে পাকিস্তান, আফগানিস্থানের মত আরেকটি ইসলামি ক্ষত তৈরির চেষ্টা ইসলামী আন্দোলনকারীদের বহুদিনের। রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় উন্মাদনাকে ব্যবহার করে তাঁরা এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে চাইছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্টির মাঝে ধর্মীয় কিছু জ্ঞান ছাড়া আর কোন শিক্ষা-দিক্ষা না থাকায় সহজেই তাদের দিয়ে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ছক কষেছে ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠী।

অচিরেই রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দেখা দেবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সাধারণভাবে প্রায় ২০ লাখের মত রোহিঙ্গা শরণার্থী বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। প্রকৃত সংখ্য এর বেশিও হতে পারে। কারণ অশিক্ষিত রোহিঙ্গারাদের মাঝে জন্ম নিয়ন্ত্রণের কোন বালাই নেই। রোহিঙ্গা পরিবারগুলোতে সন্তান জন্মদানের প্রবণতা তাই অনেক বেশি। কোন একটি জায়গায় এক লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিলে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সেই সংখ্যা দেড় লাখ পেরিয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশে প্রকৃত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কত সেটা কেউ সঠিক ভাবে বলতে পারে না।

আবার বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা সমাজের অন্যন্য অংশের সঙ্গে মিশে গেছে। ফলে তাদের আলাদা করা আর সম্ভব নয়। অনেক রোহিঙ্গা বিভিন্নভাবে বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। তারা সেখানে নানা অপকর্ম ও জঙ্গিবাদে লিপ্ত হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই রোহিঙ্গাদের এই সমস্ত অপকর্মের দায়ভার বইতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

উপরে