আপডেট : ২১ আগস্ট, ২০১৭ ১৭:৩০

বিএনপি ও একুশে আগস্টের দায়

সোহরাব হাসান
বিএনপি ও একুশে আগস্টের দায়

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেছেন, ‘আর্জেস গ্রেনেড দিয়ে হামলা করে মানুষ হত্যা করার ঘটনা বাংলাদেশ কিংবা উপমহাদেশে নেই। সমগ্র পৃথিবীতে আর্জেস গ্রেনেড নিক্ষেপ করে মানুষ হত্যারও কোনো ঘটনার নজির নেই। কেননা, এই গ্রেনেড কেবল সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ব্যবহার করতে পারেন, তা-ও আবার যুদ্ধক্ষেত্রে। এর বাইরে শক্তিশালী আর্জেস গ্রেনেড কেউ ব্যবহার করতে পারে না।’

তথ্য-প্রমাণ থেকে জানা যায়, ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেডগুলো এসেছিল পাকিস্তান থেকে, যা সেনাবাহিনীর বাইরে কারও কাছে থাকার কথা নয়। গ্রেনেড হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান ও তাঁর সহযোগীরা আশির দশকে আফগানিস্তান গিয়েছিল সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধে মুজাহিদদের সহায়তা করতে। যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরে তারা নতুন যুদ্ধ শুরু করে প্রগতিশীল রাজনীতিক ও সংস্কৃতিসেবীদের বিরুদ্ধে। ১৯৯৯ সালে যশোরে উদীচী সম্মেলনে হামলার মধ্য দিয়েই তাদের হত্যাযজ্ঞ শুরু। এরপর ২০০০ সালের ২০ জুলাই কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার সমাবেশে বোমা পুতে তাঁকে হত্যার চেষ্টা চালায় জঙ্গিরা।

গতকাল রোববার এই মামলায় বিচারিক আদালত ১০ জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এর আগে সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে হত্যাচেষ্টার মামলায় মুফতি হান্নানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় কোটালীপাড়া ও ২১ আগস্টের মামলা থেকে তাঁর নাম বাদ যায়। নব্বইয়ের দশকের শেষ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত যতগুলো হামলা হয়েছে, তার প্রায় সব কটির সঙ্গে মুফতি হান্নান ও জেএমবি চক্র জড়িত, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওই সময়ে ক্ষমতাসীনদের ভূমিকা কী ছিল। আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি আমলে সংঘটিত এসব জঙ্গি হামলা ও হত্যাকাণ্ডের টার্গেট ছিলেন আওয়ামী লীগ ও বাম দলের নেতা-কর্মী, সংস্কৃতিসেবী। অতএব জঙ্গিদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সহযোগিতার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের ভূমিকা কী ছিল? প্রথমে তারা দেশে জঙ্গি আছে—এ কথাই স্বীকার করতে চায়নি। কবি শামসুর রাহমানের ওপর হামলার পরও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বললেন, দেশে কোনো জঙ্গি নেই। এসব মিডিয়ার সৃষ্টি। রাজশাহীতে বিএনপির মন্ত্রী-নেতাদের সহযোগিতায় জঙ্গিরা প্রকাশ্যে মহড়া দিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করে লাশ গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখল। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হলো না।

এই প্রেক্ষাপটে ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হলো পুরো নেতৃত্বকে নিঃশেষ করে দিতে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর দ্বিতীয় নজির নেই।

জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে, মুক্তাঙ্গনে সমাবেশ করে সরকারি দলের নেতারা গ্রেনেড হামলার জন্য উল্টো আওয়ামী লীগের ওপর দোষ চাপালেন। তাঁরা দাবি করলেন, আওয়ামী লীগ নাকি জনগণের সহানুভূতি কাড়তে এই ঘটনা ঘটিয়েছে? এর চেয়ে ঘৃণ্য কাজ আর কী হতে পারে? ক্ষমতাসীনেরা পুরো ঘটনা ধামাচাপা দিতে জজ মিয়া নাটক সাজালেন। তাকে বলা হলো, ‘যদি সে শিখিয়ে দেওয়া কথা বলে, তাহলে মাসে মাসে টাকা পাবে। আর এর অন্যথা হলে ক্রসফায়ার।’ এরপর পুলিশ প্রশাসন কয়েক বছর সেই টাকাও তাকে দিয়েছে।

২০০৬ সালের আগস্টে এই নাটকের পেছনের ঘটনা ফাঁস করে জজ মিয়ার মা জোবেদা খাতুন বলেন, জজ মিয়াকে গ্রেপ্তারের পর থেকেই সিআইডি তাঁর পরিবারকে মাসে মাসে ভরণপোষণের টাকা দিয়ে আসছে। জজ মিয়াকে গ্রেনেড হামলা মামলায় রাজসাক্ষী করতে সিআইডির প্রস্তাবের কথাও ফাঁস করে দেন তিনি। (সূত্র: প্রথম আলো, ২১ আগস্ট ২০০৬)

আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালের জুনে বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তাঁর ভাই তাজউদ্দিন, জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি-বি) নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। তদন্তে বেরিয়ে আসে, তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ওই হামলা চালানো হয়েছিল।

মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিএনপি নেতা তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, আবদুস সালাম পিন্টু, শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদসহ ৫২ জন আসামির মধ্যে ৪১ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধসহ হত্যা, হত্যাচেষ্টা, কর্তব্যকাজে অবহেলার অপরাধে অভিযোগ গঠন করা হয়। আর এই মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমীন উদ্দিন, লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার, লে. কমান্ডার (অব) সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা, শহুদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরী, সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান, সাবেক পুলিশ সুপার ওবায়দুর রহমান খানসহ তদন্ত কর্মকর্তা রহুল আমীন, আবদুর রশিদ ও মুন্সী আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলার আলামত নষ্ট ও কর্তব্যকাজে অবহেলা করার অপরাধে অভিযোগ গঠন করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ আনা হয়নি। অন্য মামলায় তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় বর্তমানে আসামির সংখ্যা ৪৯।

মামলার মোট আসামির সংখ্যা ছিল ৫২। বর্তমানে আসামির সংখ্যা ৪৯। মামলা দুটির প্রধান আসামি মুফতি হান্নানসহ তিনজনের আরেকটি মামলায় তাঁদের ফাঁসি কার্যকর হয়। অভিযুক্ত আসামিদের মধ্যে পলাতক ১৮ জন। জামিনে আটজন আর কারাগারে আছেন ২৩ জন।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর ১৩ বছর কেটে গেছে। কিন্তু সেদিন যাঁরা নিহত হন, তাঁদের স্বজনেরা এখনো কষ্ট ও যন্ত্রণা ভোগ করে চলেছেন। তাঁদের কেউ সন্তানের কথা মনে করে অঝোরে চোখের পানি ফেলছেন, কেউ স্বামীর স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন, কেউ অস্পষ্ট ছবিতে বাবাকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। আর সেদিন যাঁরা গ্রেনেড হামলায় আহত হয়েছিলেন, তাঁরা দুর্বিষহ যন্ত্রণা পোহাচ্ছেন। বেঁচে থাকাই তাঁদের কাছে সবচেয়ে কষ্টের। ২১ আগস্টের ঘটনা জাতির জীবনে যে জমাট বেদনা ও কষ্টের পাহাড় তৈরি করেছিল, তার ক্ষত এখনো শুকায়নি। সেদিন বোমা-গ্রেনেড মেরে মানুষ হত্যা করেছে যে জঙ্গিগোষ্ঠী, এখনো তারা সক্রিয়। সেই অন্ধকারের জীবেরা সুযোগ পেলেই আঘাত হানছে। নতুন নামে ও নতুন আঙ্গিকে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নেতারা মাঠে অনেক কিছু বলেন। তাই বলে প্রশাসনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এ রকম একটি জ্বলন্ত মিথ্যাকে সত্য বলে চালানো অমার্জনীয় অপরাধ বলেই মনে করি।

পরবর্তীকালে তদন্তে বেরিয়ে আসে, সেই সময়ে সরকার কেবল অপরাধীদের বাঁচাতেই নানা অপকৌশলের আশ্রয় নেয়নি, প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রীসহ সরকার ও প্রশাসনের অনেকেই এই তৎপরতায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন। যে জঙ্গিগোষ্ঠী এই নরমেধ যজ্ঞ ঘটিয়েছে, সেই যজ্ঞের অন্যতম পুরোধা মাওলানা তাজউদ্দিন উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই। উপমন্ত্রীর বাসায় জঙ্গিরা একাধিকবার বৈঠক করেছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর অপরাধীদের না ধরে বিদেশে পার করে দিয়েছেন। মামলার সম্পূরক অভিযোগপত্রে আসামি মুফতি হান্নানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার আগে হাওয়া ভবনে তাঁদের বৈঠক হয়েছে এবং তাতে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান ও জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ (যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত) উপস্থিত ছিলেন।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মামলাটি এখন আদালতে বিচারাধীন। মামলা পরিচালনায় যুক্ত সরকারপক্ষের কৌঁসুলিরা বলছেন, বিচারকাজ শেষ হতে আরও অন্তত তিন মাস সময় লাগতে পারে। দেশবাসী চায় বিচারকাজ দ্রুত শেষ হোক। মানবতা ও ন্যায়ের স্বার্থেই ইতিহাসের জঘন্যতম এই হামলা ও হত্যাযজ্ঞের বিচার হওয়া প্রয়োজন। বিচারেই নির্ধারিত হবে কে অপরাধী, কে অপরাধী নয়।

কিন্তু বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকতে যেভাবে মামলার তদন্ত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেছিল, তাতে এই ধারণা অমূলক নয় যে তৎকালীন সরকারের নীতিনির্ধারকদের একাংশ এর পেছনে ছিল। তখন বিএনপির নেতৃত্বে যাঁরা ছিলেন, দু-চারজন বাদে এখনো তাঁরাই আছেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাকে ইতিহাসের কলঙ্ক বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সেই কলঙ্কের হোতাদের রক্ষা করে তো কলঙ্ক মুছে ফেলা যাবে না।

বিএনপি নেতারা ১৫ আগস্টের দায় এড়িয়ে যান সে সময়ে বিএনপি নামের দলটি জন্ম হয়নি বলে। কিন্তু ২১ আগস্টের দায় কীভাবে এড়াবেন তাঁরা? বিএনপি যদি নিজেকে গণতান্ত্রিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সংস্রব ত্যাগ করতেই হবে।

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক
sohrabhassan55@gmail.com

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে