আপডেট : ১৩ মার্চ, ২০১৬ ১২:১৭

রফিক আজাদের সর্বশেষ কাব্যিক আলোড়ন বোধহয় বিরিশিরি পর্বেই

মাহবুব মোর্শেদ
রফিক আজাদের সর্বশেষ কাব্যিক আলোড়ন বোধহয় বিরিশিরি পর্বেই

রফিক আজাদের সর্বশেষ কাব্যিক আলোড়ন বোধহয় বিরিশিরি পর্বেই। এক/দুই সালের দিকে বছর কয়েক বিরিশিরিতে ছিলেন গারো সাংস্কৃতিক একাডেমির পরিচালক হিসেবে। ওনার বাড়ি টাঙ্গাইল এলাকাতেই। বিরিশিরিতে দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তার মনে হয় উনি মান্দি বা গারো। নিজের নামও পরিবর্তন করেছিলেন। রফিক মারাক নাম নিয়েছিলেন। ওই সময়ের কবিতায় আবার পুরনো রফিক আজাদের উঁকি দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু মূলে ছিল নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে তার মিলমিশের ব্যাপারগুলোই।

উনি ঢাকায় ফিরে এলে ওনার আর কোনো কবিতায় সেইরকম আবিষ্কার পেয়েছি বলে মনে পড়ে না। তখন সেলিম আল দীন মাঝে মাঝে বলতেন, চল বিরিশিরি যাই। রফিক আজাদের ওখানে। রফিক আজাদকে উনি বাবা ডাকতেন। সেলিম আল দীন যখন লেখা শুরু করেন তখন রফিক আজাদ স্নেহ ও প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। লেখা ছাপা, লেখা বিষয়ক পরামর্শ, দিকনির্দেশনা, কবির প্রতি মুগ্ধতা ইত্যাদির কারণে তিনি তরুণ লেখকের বাবায় পরিণত হয়েছিলেন।

একবার আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে রফিক আজাদের সঙ্গে সেলিম আল দীনের দেখা। দেখলাম উনি বাবা বাবা বলে রফিক আজাদকে সালাম করে বসলেন একগাদা লোকের সামনে। রাস্তার ফুটপাতে। রফিকও তাকে জড়িয়ে ধরলেন। বেটা বেটা বলে। তখন সেলিম আল দীন অধ্যাপক, পঞ্চাশ পেরিয়েছেন।

হুমায়ূন আজাদ ওই দৃশ্যটা দেখেছিলেন। পরে বলেছিলেন, সেলিম তো পিতাবাদী। রফিক আজাদকে দেখে পিতা পিতা বলে পদতলে লুটিয়ে পড়লো।

যাই হোক, রফিক আজাদের সঙ্গে আমার তেমন খাতির ছিল না। খুব কম দেখা হয়েছে। ভায়া বিট হাংরিদের আদলে এখানে যে স্যাড জেনারেশন তৈরি হয়েছিল তাদের পুরোধা ছিলেন রফিক আজাদ। সয়ম্ভূ কবিতা আন্দোলন নামে একটা আন্দোলনও তৈরি করেছিলেন তারা। আধুনিক কবিতার সচেতন চর্চার ধারাটিকে অনেকদিন নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। স্বাভাবিক কারণেই এই কবিতাগুলো বিস্মৃতির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। কবিদের নানা রাজনৈতিক তৎপরতায়ও তিনি ছিলেন নেতৃত্বে। সব মিলিয়ে রফিক আজাদ কি সাহিত্য ও সময়ে কোনো গভীর রেখা এঁকে দিতে পেরেছেন?

রফিক আজাদের সঙ্গে শেষ দেখা সাকুরায়। ঢুকতে দুই টেবিল পরে একটা সিঙ্গেল টেবিলে বসতেন তিনি। সম্ভবত ২০-২৫ বা তারও বেশি সময় ধরে ওখানে বসেন তিনি। আমি খুব অকেশনালি গেছি। প্রতিবার দেখেছি উনি জানালার পাশে বসে। জানালায় নিচেই রাস্তা। শেষদিন গেছিলাম কবির ভাইয়ের সঙ্গে। এমনিতে ওনার টেবিলে বসার কথা না। কবির ভাইয়ের চাপাচাপিতে বসলাম। উনি নানা কথা বলতে শুরু করলেন। বার্ধক্য নিয়ে আসে এক অভূতপূর্ব নির্জনতা, নির্জনতা ও নাজুকতা। রফিক ভাই তো বাঘ ছিলেন একসময়। ওইদিন দেখলাম বুড়ো বাঘ। রণেশ দাশগুপ্তের উপন্যাসের শিল্পরূপ বইটার কথা বলছিলেন। আমি বইটা পড়েছি শুনে বললেন, এই বই পড়া লোক তো আমি আর পাইনি। তোমার সঙ্গে কথা আছে। অনেকক্ষণ বসে ছিলাম সেদিন। শরীর, স্বাস্থ্য, দিনযাপনের নানা কথা হচ্ছিল। উনি একসময় উঠে গেলেন। এত রাতে বাসায় তো ঠিকঠাক পৌঁছাতে হবে।

মাঝে দেখলাম কানাডায় ঘুরছেন। মনে হলো ভালই হয়েছে। ছবির মতো মদের দেশ। মদের দেশ থেকে মোদের দেশে ফিরে কয়টা দিন যেতে না যেতেই হাসপাতাল।

এর মধ্যে দিন দশেক আগে কেউ একজন গভীর রাতে জানালো রফিক ভাই আর নেই। ক্লিনিকালি ডেড। শুধু পরিবারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা। নিউজ তো করতে হবে। নানা তোড়জোড় শুরু করলাম। কিন্তু শেষে দেখলাম খবর ঠিক নয়।
কাল থেকে আবার একই খবর। এরকম খবর কেন দেয় মানুষ? এরপর থেকে তো শুধু মৃত্যু সংবাদের জন্য অপেক্ষা ছাড়া আর কিছু থাকে না। (লেখাটি মাহবুব মোর্শদ এর ফেসবুক থেকে নেয়া)

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জেডএম

উপরে