আপডেট : ২০ জানুয়ারী, ২০১৬ ১২:০৬

প্রশাসন ক্যাডারের সাথে মন্ত্রণালয়ের সচিব পদের সম্পর্ক কি?

আশরাফ আনাম সিদ্দিক
প্রশাসন ক্যাডারের সাথে মন্ত্রণালয়ের সচিব পদের সম্পর্ক কি?

বাংলাদেশের রাষ্টীয় ব্যবস্থায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের এবং মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভাগের প্রশাসনিক প্রধান পদটি সচিব পদ হিসেবে নির্দিষ্ট। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের সেই সচিব পদটিতে কে আসীন হবেন তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন, সংশয় ও দ্বন্দ পরিলক্ষিত হয়।

বিভিন্ন বিষয় ভিত্তিক ক্যাডার সার্ভিসের অনেককেই মন্তব্য করতে দেখা যায় যে, তাঁর নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় বা অধিদপ্তরের সচিব বা মহাপরিচালক পদটি সংশ্লিষ্ট ক্যাডার কর্মকর্তা দ্বারাই পূরণীয়। অর্থ্যাৎ কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব হবেন কৃষি ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা, একইভাবে স্বাস্থ্য, প্রকৌশলী, শিক্ষা, মৎস, প্রাণী, অর্থ ইত্যাদি মন্ত্রণালয়ের সচিব হবেন সংশ্লিষ্ট ক্যাডারের কর্মকর্তা।

পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদের মন্তব্যটি যাচাই করতে গেলে প্রশাসন ক্যাডারের কর্ম পরিধি নিয়ে কিছু আলোচনা না করলেই নয়।

 মন্ত্রণালয় গুলোতে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের কাজ হল নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে সঠিক সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নীতিমালা প্রনয়নে সহায়তা, নীতিমালার বাস্তবায়নে সামঞ্জস্যপূর্ণ মেকানিজম প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনে শৃঙ্ক্ষলা নিশ্চিত করা, নীতিমালার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা এই কাজ সম্পাদন করতে গিয়ে পথ চলা শুরু করে জেলা পর্যায়ে সহকারী কমিশনার পদ দিয়ে। যেখানে জেলার সকল বিভাগের কর্মকান্ড গুলোকে সারসংক্ষেপ করা হয় এবং তা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের মাধ্যমে নীতিমালা প্রনয়নে সহয়তা করা হয়।

আবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রেরিত নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট দপ্তর গুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করত: পরবর্তী প্রতিবেদনও এ কার্যালয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এভাবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রশাসন ক্যাডারেরে একজন কর্মকর্তা সরকারী বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও তার অধীন দপ্তর গুলোর কার্যপরিধির সাথে পরিচিতি লাভ করে।

এর সাথে ঐতিহ্যগত ভাবে তাদের উপর ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেসির দায়িত্ব অর্পিত আছে। ফলে আইন-শৃঙ্ক্ষলা জনিত উদ্ভুত পরিস্থিতি, জনরোষ মোকাবিলা, ফৌজদারী অপরাধের প্রতিরোধ মূলক মামলা পরিচালনা, অপমৃত্যু মামলা পরিচালনা, সার্টিফিকেট মামলা পরিচালনা, ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত কাজ, জনসচেতনতা ও তাৎক্ষনিকভাবে দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কল্পে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা তারা করে থাকেন।

সেই সাথে উর্ধ্বতন আদালতের নির্দেশে কবর থেকে লাশ উত্তোলন, নিলাম কার্য পরিচালনা, উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা ইত্যাদি বহুবিধ আদেশ প্রতিপালন করেন। একই সাথে অধস্তন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ, বেসরকারী সংস্থার কর্মকান্ড সংক্রান্ত তদন্ত, বেসরকারী সংস্থার কার্যক্রম মনিটরিং, ভূমি বিরোধ, জেলাধীন যেকোন মানবসৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দূর্ঘটনা ও দুর্যোগে প্রাথমিক বিপর্যয় সামাল দেওয়া, পরিস্থিতি স্বাভাবিকায়নসহ হরেক রকম বিষয়ের তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা তারা করেন।

সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন উন্নয়ন-অনুন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনাও করেন এই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। এতে করে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা মনোভাব, প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে প্রতিনিয়ত হাতে কলমে অবগত এবং অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হয়।

এরসাথে যুক্ত হয় রাষ্ট্রীয় যেকোন দিবস ও অনুষ্ঠান আয়োজনের অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও বিদেশী অতিথিদের ব্যবস্থাপনার মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও এই ক্যাডারের কর্মকর্তারা সম্পাদন করে থাকেন। এর ফলে এই কর্মকর্তারা যেকোন ধরনের প্রশাসন পরিচালনার জন্য যোগ্য হয়ে গড়ে উঠেন।

চাকরীর বিভিন্ন ধাপে উপজেলা নির্বাহি অফিসার, জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এই কর্মকর্তারা উপজেলা, জেলা এবং বিভাগ পর্যায়ে কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থার প্রতিনিধি হিসেবে সকল মন্ত্রণালয়ের/বিভাগের অধীন দপ্তর গুলোর কার্মকান্ডের সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

প্রকৃতপক্ষে সরকার এবং রাষ্ট্রের সকল এজেন্ডা বাস্তবায়নে জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক মুখ্য পরিচালকের ভূমিকায় থাকেন এবং এজেন্ডার সাথে সংশ্লিষ্ট দপ্তরটির মাধ্যমে কার্যক্রমটি সম্পন্ন হয়ে থাকে। অপরদিকে অন্যান্য যে ক্যাডার সার্ভিস গুলি রয়েছে, সংশ্লিষ্ট সকল ক্যাডার কর্মকর্তাদেরই নির্দিষ্ট কর্ম পরিধি রয়েছে।

এখানে লক্ষ্যনীয় যে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রকৌশলী ইত্যাদি ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিয়োগ হয় সংশ্লিষ্ট বিষয় ধর্মী সেবা বা কর্ম নিশ্চিত করার জন্য। যেমন একজন শিক্ষক শিক্ষকতা করবেন, ক্লাশ পরিচালনা করবেন, পরীক্ষা গ্রহণ করবেন; একজন ডাক্তার স্বাস্থ্য সেবা দিবেন; একজন প্রকৌশলী নির্মাণ কর্মে তার প্রকৌশলী জ্ঞানের প্রয়োগ ঘটাবেন।

এভাবে নিজ নিজ ক্ষেত্রে দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে ক্রমান্বয়ে বড় পরিসরে একই প্রকৃতির সেবা দেবেন। আরও কিছু উদাহারণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে, যেমন- স্কুল-কলেজে ভর্তি পরীক্ষা কবে হবে, পরীক্ষা সনাতন পদ্ধতিতে হবে-নাকি প্রযুক্তির ব্যবহারে নতুন কোন মাধ্যমে হবে, দেশে নতুন কোন শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কিনা- এইসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রধানগণ।

কোনভাবেই শিক্ষকমন্ডলীর দায়িত্ব এটি নয়। বরং তাঁর দায়িত্ব পাঠদানের মান উন্নয়ন করা, শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও বিষয় ভিত্তিক জ্ঞানে হৃদ্ধ করে জাতির জন্য সম্পদে পরিণত করা। একইভাবে ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবা বর্ধিত করার প্রয়োজন রয়েছে কিনা, এলক্ষ্যে কতজন ডাক্তার নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন, স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার মেকানিজম তৈরী ইত্যাদি স্বাস্থ্য ক্যাডার কর্মকর্তার কাজ নয়। তাঁর অধিক্ষেত্র সেবা প্রশ্যাশী সকলের স্বাস্থ্য সেবা প্রদানে নিবেদিত হওয়া। তারপরও মাঠপর্যায়ে পেশাভিত্তিক এবং প্রশাসনিক- দ্বৈত ভূমিকা পালন করে থাকেন বেশীরভাগ ক্যাডারের কর্মকর্তাগণই।

এখন লক্ষনীয় যে, একটি নীতিমালা প্রণয়ন এবং সেটির বাস্তবায়ন মেকানিজম প্রতিষ্ঠা করা কোন এককেন্দ্রিক জ্ঞান ও মতামতের প্রেক্ষিতে সম্ভব নয়। একটি নীতিমালার সাথে সমাজের ভিন্ন ভিন্ন স্তরের, ভিন্ন পেশার মানুষের কর্মকান্ড, প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা, পরিবেশগত ভিন্নতা ইত্যাদি বিষয় সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে। তাই শুধু একটি মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের জানাশোনা ও কর্ম অভিজ্ঞতা দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়টির প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নে সহায়তা, প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণে প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়া সম্ভব নয়। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে প্রায় ১৩ লক্ষ কর্মচারি দায়িত্ব পালন করছেন।

সকলকে সমান প্রশিক্ষণ দেওয়া যেমন একটি অর্বাচিন চিন্তা তেমনি সকল কর্মচারিকে একই কাজের জন্য যোগ্য করে গড়ে তোলাও শুধু অপ্রয়োজনীয় নয় বরং তা আত্মবিধ্বংসী। প্রচলিত পদ্ধতিতে দেশের সবচেয়ে যোগ্যতা সম্পন্ন কর্মচারিদের মধ্য থেকে স্বল্প সংখ্যক (প্রশাসন ক্যাডার) কর্মচারিকে প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ের বৈচিত্রপূর্ণ পদায়ন, অভিজ্ঞতার সম্মুখীন করে ধীরে ধীরে মন্ত্রণালয়ের সচিব পদের যোগ্য করে গড়ে তোলার একটি প্রক্রিয়া বিদ্যমান রয়েছে।

এই প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে সফলভাবে উত্তীর্ণ ব্যক্তিরাই সচিব পদটিতে আসীন হবেন। এই প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে যিনি একটি মন্ত্রণালয়ে সচিব হওয়ার যোগ্য হয়েছেন ধরে নিতে হবে তিনি সরকারের যেকোন মন্ত্রণালয়েরই সচিব হওয়ার যোগ্য। কারণ বিশেষায়িত জ্ঞানের প্রয়োজন থাকলেও নীতিমালা প্রণয়নে সহায়তা, নীতিমালা বাস্তবায়নের মেকানিজম প্রতিষ্ঠা ও প্রশাসন পরিচালনা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গহণের যোগ্যতার মাপকাঠিতে প্রচলিত এবং অপ্রচলিত সমাজ ব্যবস্থাকে বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিতে নীরিক্ষা করার অভিজ্ঞতার গুরুত্ব অনেক বেশী।

তাই সচিব পদে কে যাবেন তা যৌক্তিকতা ও বাস্তবতার প্রেক্ষিতে নির্ধারিত। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন একটি নির্দিষ্ট যোগ্যতা সম্পন্ন সকল চাকরীপ্রার্থীদেরকেই মেধা, যোগ্যতা ও পছন্দক্রম অনুসারে সার্ভিসে যোগদানের সুযোগ দিযে থাকে। এরপরও আদালতের রায়ে উপসচিব পুলে ২৫% কর্মকর্তা অন্য ক্যাডার (প্রশাসন ব্যাতিরেকে) থেকে আত্তিকরণের সুযোগ রয়েছে। ফলে মন্ত্রণালয়ের সচিব কে হবেন সেবিষয়ে সংশয় ও প্রশ্ন উত্থাপনের আর কোন সুযোগ থাকে না।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম

উপরে