আপডেট : ১৪ মার্চ, ২০১৯ ১৫:৩৩

ছাত্রলীগেই ফিরছেন ভিপি নুরুল হক!

অনলাইন ডেস্ক
ছাত্রলীগেই ফিরছেন ভিপি নুরুল হক!

দীর্ঘ ২৮ বছর পর গত ১১ মার্চ (সোমবার) অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে (ডাকসু) নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে ছাত্রলীগ ছাড়া সব দল ভোট বর্জন করে।

দিনভর নানা উত্তাপের পর ক্যালেন্ডারের পাতায় ১২ (মার্চ) মঙ্গলবার শুরু; রাতের প্রথম প্রহর পৌনে চারটা, সবাই যখন ঘুমিয়ে; তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রোমান্স, ড্রামা, সাসপেন্স, অ্যাকশনে ভরা মিষ্টি মধুর কণ্ঠে ঘোষণা করেন ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়েছেন নুরুল হক নূর।

নির্বাচনের এই ফলাফল ঘোষণার পর পাল্টে যায় দৃশ্যপট। বাম সংগঠনগুলোর জোট প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য, ছাত্রদল, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদ, ছাত্র ফেডারেশন ও স্বতন্ত্র জোটের আন্দোলনের মধ্যেই ছাত্রলীগও উল্টো আন্দোলনে নামে।

ভিসির বাসা ঘেড়াও করে ডাকসুর ভিপি পদে নির্বাচিত নুরুল হক নুরকে মেনে না নেয়ার ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে নবনির্বাচিত ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর ও প্রগতিশীল ছাত্রজোটের ভিপি প্রার্থী লিটন নন্দীসহ ৪০ জনের বিরুদ্ধে ভাঙচুর ও প্রভোস্টকে লাঞ্ছনার অভিযোগে থানায় মামলা করে।

এছাড়া নতুন ভিপি নূরুল হক নূরকে বহিষ্কারের দাবিতে ভিসির বাসভবনের সামনে টায়ারে আগুন দিয়ে বিক্ষোভ করে ছাত্রলীগ। দুপুরে টিএসসিতে নতুন ভিপির ওপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা চালায়। এ ঘটনায় ভিপিসহ কয়েকজন আহত হয়।

এছাড়া উভয় পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে দিনভর দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। সব মিলে দিনভর ক্যাম্পাসে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করে। কিন্তু বিকালে ছাত্রলীগ সভাপতি ও ভিপি প্রার্থী রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আকস্মিকভাবে টিএসসিতে আসেন।

এসময় দুই পক্ষের উত্তেজনার মধ্যে টিএসসিতে গিয়ে নুরকে বুকে জড়িয়ে ধরেন শোভন। কোটা আন্দোলনের প্যানেল থেকে ভিপি নির্বাচিত হওয়া নুরও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। এতে উত্তেজনা কমে।

এদিকে এরপর থেকেই গুঞ্জন উঠেছে ডাকসুর নব নির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুর ছাত্রলীগেই ফিরছেন। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ মহল থেকে ইতিবাচক মনোভাব জানানো হয়েছে বলে এক জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

‘ছাত্রলীগেই ভিড়ছেন ভিপি নুর’ শিরোনামে এই প্রতিবেদনটি আজ বৃহস্পতিবার একটি দৈনিক পত্রিকার  প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয়েছে। ছাত্রলীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, নুর যেহেতু একসময় ছাত্রলীগে যুক্ত ছিলো, বিষয়টি আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানানো হলে তিনিও নুরের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন। ফলে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে সরকারবিরোধী হিসেবে আখ্যা পাওয়া নুর আবারও ছাত্রলীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে যাচ্ছেন বলে আশা করা হচ্ছে। নুরের ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতাও এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

সূত্র মতে, ডাকসু নির্বাচন বর্জনকারী অন্য প্যানেলগুলো ভিপি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ না করতে নুরকে চাপ দিচ্ছে। তবে এর পরও ছাত্রলীগের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে তিনি দায়িত্ব গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে আলোচনা আছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের একটি অংশও ভিপি হিসেবে দায়িত্ব না নিতে নুরকে চাপ দিচ্ছে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্যও সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে। একটি অংশ চাইছে নুর ভিপি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে ভূমিকা রাখুক। আর ছাত্রলীগও নুরকে সঙ্গে নিয়ে ডাকসু পরিচালনায় এগোতে চায়।

গতকাল বুধবার দুপুরে উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করেন ডাকসু নির্বাচন বর্জনকারী ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদসহ বিভিন্ন প্যানেলের নেতারা। এরপর গণমাধ্যমে ব্রিফিংকালে তাঁরা নুরকে কোনো বক্তব্য দিতে দেননি। কারণ আগের দিন মঙ্গলবার নুর গণমাধ্যমে নির্বাচন, দায়িত্ব গ্রহণ ও ক্লাস বর্জন বিষয়ে একেকবার একেক অবস্থান ব্যক্ত করেন। এ নিয়ে নির্বাচন বর্জনকারী অন্যদের সঙ্গে নুরের মতপার্থক্য দেখা দেয়। এ কারণে গতকাল আর নুরকে বক্তব্য দিতে দেওয়া হয়নি। তবে তিনি পরে হাজী মুহম্মদ মহসীন হলে গণমাধ্যমের সামনে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন। আগে এ হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন নুর। কোটা আন্দোলনের সময় তাঁকে হল থেকে বের করে দেয় ছাত্রলীগ। এ হলেই আবার উঠতে যাচ্ছেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্র বলছে, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে প্রশাসন। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

ছাত্রলীগের সূত্রগুলো জানায়, গত মঙ্গলবার রাত ২টার পর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নুরের সঙ্গে দেখা করেন ছাত্রলীগের পাঁচ-ছয়জন কেন্দ্রীয় নেতা। তাঁরা নুরকে নিয়ে একসঙ্গে ডাকসুতে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা করেন। হাসপাতালটির ৫০৪ নম্বর কেবিনে রাত আড়াইটা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত ওই বৈঠক হয়।

নুর যে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন সেখানকার এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নুরের সঙ্গে দেখা করতে আসা ছাত্রলীগের নেতাদের মধ্যে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী এবং আরো কয়েকজন ছিলেন। তাঁরা এক ঘণ্টার মতো নুরের সঙ্গে আলাপ করেন।

ছাত্রলীগের সূত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে নুরকে সঙ্গে নিয়ে ডাকসু পরিচালনা করতে ছাত্রলীগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সে নির্দেশনা অনুযায়ীই ছাত্রলীগের নেতারা নুরের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁর কাছে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বার্তাও পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

সূত্র বলছে, একসময় ছাত্রলীগের সঙ্গে কাজ করা নুর আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের চাওয়াকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। ফলে তিনি পুনর্নির্বাচনের দাবিতে এখনো সোচ্চার থাকলেও ডাকসুর ভিপির দায়িত্ব নেবেন।এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নুর বলেন, ‘যেহেতু আমি ভিপি নির্বাচিত হয়েছি এখন ডাকসুর কাজ এগিয়ে নিতে হলে তো আমাকে ছাত্রলীগের সহযোগিতা নিতেই হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমি হলের ১১৯ নম্বর কক্ষে থাকতাম, কিন্তু বের হয়ে যেতে হয়েছে। আমি খুব শিগগিরই আবারও হলে উঠব।’

জানতে চাইলে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘সে আমাদের আদর্শিক কর্মী ছিল। সে একটি হলের উপসম্পাদক ও হলের গুরুত্বপূর্ণ পদের প্রার্থী ছিল। কিন্তু কোটা আন্দোলনের সময় তাকে ভুল বুঝিয়ে মাঠে নামায় একটি পক্ষ। আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিষয়টি জানিয়েছি। নুর আমাদের আদর্শিক ছোট ভাই। তাকে সংগঠনে ফেরানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। নুর নিজেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী। আশা করছি, নুর নিজেও বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নেবে।’

রাব্বানী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা—ডাকসু ও হল সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একত্রে কাজ করতে হবে। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে কঠোর মনোভাব জানিয়েছেন নেত্রী। প্রয়োজনে ছাত্রলীগকে সর্বোচ্চ ছাড় দিয়ে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করতে বলেছেন। ডাকসুকে সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি।’

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/রাসেল

উপরে