আপডেট : ৫ এপ্রিল, ২০১৬ ১০:০২

আসছে রমজান, বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম

বিডিটাইমস ডেস্ক
আসছে রমজান, বাড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম

পবিত্র রমজান শুরু হতে দুই মাস বাকি থাকলেও ওই সময়ের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর দাম এখনই বাড়ছে। বিশেষ করে ছোলা, চিনি, খেসারি ও অ্যাংকর ডালের দাম বেশ কিছুটা বেড়েছে। ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকেরা বলছেন, আগের চেয়ে বেশি দর দিয়েও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পণ্য কেনা যাচ্ছে না। এর প্রভাব পড়ছে বাজারে।

বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনেও কিছু কিছু পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারদর বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে পাওয়া ওই প্রতিবেদনে বিভিন্ন পণ্যের আমদানি তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, ওই পণ্যগুলোর সরবরাহে কোনো ঘাটতি হবে না।

তবে এবারের পবিত্র রমজানে চাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, গুঁড়া দুধ, আটাসহ কিছু পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। এসব পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারদর, দেশীয় উৎপাদন এবং সরবরাহ পরিস্থিতি ভালো বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও বাজারসংশ্লিষ্টরা।

আগামী মাসের প্রথম দিকে রমজান মাস শুরু হবে। সময় বাকি প্রায় দুই মাস। ঢাকার খুচরা বাজার ঘুরে এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যতালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত দুই সপ্তাহে ছোলার দাম কেজিতে প্রায় ১০ টাকা, এক থেকে দেড় মাসে চিনির দাম কেজিতে ৮-১০ টাকা, খেসারির ডালের দাম প্রায় ২০ টাকা এবং অ্যাংকর ডালের দাম প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে। প্যাকেট করা লবণ বাজারজাতকারী কয়েকটি কোম্পানিও তাদের লবণের দাম ৩-৪ টাকা করে বাড়িয়েছে।

বাণিজ্যসচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন এ বিষয়ে বলেন, ‘পরিস্থিতি আমরা অনেক দিন ধরেই পর্যবেক্ষণে রেখেছি। রমজান মাসে যে পরিমাণ ছোলার প্রয়োজন হয় তা দেশেই মজুত আছে। এ ছাড়া টিসিবি অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছে। তারা রোজার সময় কম দরে ছোলা বিক্রি করবে। ফলে দেশের বাজারে সংকট হবে না।’

ব্যবসায়ীরা জানান, ভারতে এক অঞ্চলে খরা এবং এক অঞ্চলে মৌসুমের সময় বৃষ্টির কারণে ডালের উৎপাদন কম হয়েছে। এ অবস্থায় ভারত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ডাল কেনা শুরু করায় দাম বেড়ে গেছে। ভারত একাধারে ডালের সবচেয়ে বড় উৎপাদক ও ভোক্তা। পাশাপাশি পাকিস্তানও ডালের বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে।

চট্টগ্রামভিত্তিক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অন্যতম বড় আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলেন, কোনো কোনো পণ্যের দাম টনপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ ডলার বেশি দিয়েও চাহিদা অনুযায়ী কেনা যায়নি।

ট্যারিফ কমিশনের দ্রব্যমূল্য মনিটরিং সেলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৮০ হাজার মেট্রিক টন আস্ত ছোলার চাহিদা আছে। এর মধ্যে ৭০ হাজার টনই পবিত্র রমজান মাসে প্রয়োজন হয়। ঢাকার বাজারে দুই সপ্তাহ আগেও প্রতি কেজি ছোলার দাম ছিল ৭০ টাকা, যা এখন ৮০ টাকায় উঠেছে।

ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে ব্যবসায়ীরা প্রায় ৪৬ হাজার টন ছোলা আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলেন। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১১ হাজার টনের ঋণপত্র। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দেশে প্রবেশ করা প্রতি টন ছোলার মূল্য (সিএনএফ) ছিল প্রায় ৮৪৭ ডলার। গত বছর এই ছোলা ৬০০-৬১০ ডলারে বিক্রি হয়েছিল। রমজান মাস উপলক্ষে ছোলা আমদানির ঋণপত্র খোলার হার বাড়লেও নিষ্পত্তি, অর্থাৎ দেশে প্রবেশের হার বেশি নয়। তাই ছোলার সরবরাহ বাড়াতে আমদানিকারকদের ঋণপত্র নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে, দেশে বছরে চিনির চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন। তবে রমজানে মাসিক চাহিদা সোয়া লাখ টন থেকে বেড়ে তিন লাখ টন হয়। গত কয়েক বছর আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় দেশেও খুচরা বাজারে প্রতি কেজির দর ৪০ টাকার নিচে নেমেছিল। কিন্তু গত বছর আগস্ট মাসে চিনি আমদানির শুল্কায়ন মূল্য (ট্যারিফ ভ্যালু) টনপ্রতি ৩২০ ডলার নির্ধারণ করে তার ওপর ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়। গত ডিসেম্বরে ট্যারিফ ভ্যালু বাড়িয়ে ৩৫০ ডলার করা হয়।

এত করে গত ডিসেম্বরে যে চিনি কারওয়ান বাজারে ৩৫-৩৬ টাকায় নেমেছিল, তা এখন ৫২-৫৪ টাকায় উঠে গেছে। গত দেড় মাসে এই নিত্যপণ্যটির দর কেজিতে ৮-১০ টাকা বেড়েছে বলে জানান কারওয়ান বাজারের আল-আমিন স্টোরের বিক্রেতা মো. তারেক হোসেন।

মসুর ডালের দরও চড়া। টিসিবির হিসাবে ছোট দানার মসুর ডাল কেজিপ্রতি ১৩৫ থেকে ১৪৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ থেকে ৩১ শতাংশ বেশি। বড় ও মাঝারি দানার মসুর ডালের দাম কেজিপ্রতি ১০০-১১৫ টাকা। গত বছরের এ সময়ের তুলনায় যা ২০ শতাংশ বেশি।

সবচেয়ে ভালো মানের লবণের দাম কেজিতে ৪ টাকা বাড়িয়ে গত ৩০ মার্চ ট্যারিফ কমিশনকে চিঠি দিয়েছে পূবালী সল্ট ইন্ডাস্ট্রিজ। বাড়ানো হয়েছে অন্যান্য লবণের দামও। এসিআই সল্টের বিজনেস ম্যানেজার মো. কামরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, গত কয়েক দিনে তাঁরা দুই দফায় লবণের দাম ৩ টাকা বাড়িয়ে কেজিপ্রতি ৩৫ টাকা নির্ধারণ করেছেন। মোল্লা সল্টও ৩ টাকা বাড়িয়ে লবণের দাম কেজিপ্রতি ৩৫ টাকা ধার্য করেছে।

পূবালী সল্টের চেয়ারম্যান পরিতোষ কান্তি সাহা বলেন, ‘দেশে অপরিশোধিত লবণের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছি। এখন এক বস্তা (৭৫ কেজি) অপরিশোধিত লবণ এক হাজার টাকা, যা স্বাভাবিক দামের তিনগুণ।’

বাণিজ্যসচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন এ ব্যাপারে জানান, লবণের দাম বাড়ার বিষয়টিও সরকারের নজরে আছে। অপরিশোধিত লবণ উৎপাদন পরিস্থিতি জানতে কক্সবাজারে খোঁজও নেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা চান অপরিশোধিত লবণ আমদানি করতে। তবে কৃষকদের সুবিধার জন্য আমদানির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।

সবশেষে ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোজ্যতেল ও পেঁয়াজের আন্তর্জাতিক বাজারদর স্থিতিশীল আছে। রসুনের দর বেড়েছে। তবে দেশীয় সরবরাহ ভালো। পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে এসব পণ্যের বাজারে নজরদারি করা প্রয়োজন।

সূত্র-প্রথম আলো

জেডএম

উপরে