আপডেট : ১৫ মার্চ, ২০১৬ ২০:২৯

ফিলিপিন্সের তদন্তে উঠে এলো রিজার্ভ চুরির অবিশ্বাস্য সব তথ্য

বিডিটাইমস ডেস্ক
ফিলিপিন্সের তদন্তে উঠে এলো রিজার্ভ চুরির অবিশ্বাস্য সব তথ্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনা নিয়ে প্রায় অবিশ্বাস্য সব তথ্য উঠে এসেছে ফিলিপিন্সের সিনেটের তদন্তে। তদন্ত কমিটির জেরার মুখে হ্যাকিংয়ের সঙ্গে রিজাল ব্যাংক সভাপতির সম্পৃক্ততার কথা জানিয়ে ব্যাংকটির জুপিটার শাখা ব্যবস্থাপক মায়া দেগুইতো নিজের দোষও স্বীকার করেছেন।

এছাড়াও তদন্তে জানা গেছে, অর্থ স্থানান্তরের সময় ফিলিপিন্সের রিজাল ব্যাংকের জুপিটার শাখার সবগুলো ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাও ভাঙা অবস্থায় ছিলো। আর অভিযুক্ত ৫টি ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিলো নয় মাস আগেই। মঙ্গলবার এ খবর দিয়েছে দেশটির পত্রিকা ইনকোয়ার।

সিনেটের ব্লু রিবন কমিটির বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানিয়েছে, টাকা চুরির ঘটনায় তারা আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তও শুরু করেছেন। এরই মধ্যে দেশটির মুদ্রা পাচারবিরোধী সংস্থাও তদন্তের স্বার্থে সিসিটিভি ফুটেজ চেয়েছে।

তারা আরসিবিসির মাধ্যমে কীভাবে টাকা স্থানান্তর হয়েছে তা খতিয়ে দেখছে। এছাড়া এ ঘটনায় ৬ ব্যক্তির যোগসাযোশও যাচাই-বাছাই করবে তদন্ত কমিটি।হ্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গত ৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলার চুরি করে জালিয়াত চক্র।

অন্যদিকে, তদন্ত কমিটির জেরার মুখে হ্যাকিংয়ের সঙ্গে রিজাল ব্যাংক সভাপতির সম্পৃক্ততার কথা জানান ব্যাংকটির জুপিটার শাখা ব্যবস্থাপক মায়া দেগুইতো। সিনেট শুনানিতে ব্যাংকের সব কর্মকর্তাকে উপস্থিত থাকার নির্দেশনা দিয়েছিল দেশটির এন্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল। সে মোতাবেক ব্যাংকটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী সহ প্রায় সব কর্মকর্তাই উপস্থিত ছিলেন।

নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায়, ফিলিপিন্সের এন্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের তদন্তে বের হয়ে এসেছে ৫টি অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের তথ্য।

এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পাচার হয় ৮১মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর এ ঘটনায় অভিযুক্ত রিজাল ব্যাংকের জুপিটার শাখা ব্যবস্থাপক মায়া দেগুইতোর বিরুদ্ধেও অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। সিনেটের তদন্ত কমিটির জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছেন, এ ঘটনায় যোগসাজশ রয়েছে ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহীরও।

প্রাথমিকভাবে প্রকাশিত সিনেটের তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ৫ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে রিজাল ব্যাংকের সবগুলো ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিলো। মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলো খোলা হয়েছিলোও গত বছরের ১৫ মে।

এছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঘটনা জানার পর গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঐ পাঁচ একাউন্টে অর্থ স্থানান্তর বন্ধে রিজাল ব্যাংককে অনুরোধ করার বিষয়টিও উঠে এসেছে তদন্তে। অভিযুক্ত অ্যাকাউন্টগুলো রিজাল ব্যাংক ম্যানেজারের সহায়তায় খোলা হয়েছে বলেও জানিয়েছে সিনেট তদন্ত কমিটি।

তবে, সম্প্রতি এনবিআই ফিলিপিন্স সরকার ও অর্থ পাচার বিরোধী পরিষদ ‘এএমএলসি’ সমন্বিতভাবে এ ঘটনার তদন্ত শুরু করে। এমনকি চীনা বংশোদ্ভূত এক ফিলিপিনো ব্যবসায়ীও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

অভিযুক্ত ব্যাংক ম্যানেজার জানান, রিজাল ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী লোরেনজো তানের বন্ধু ক্যাম সিন ওউং অভিযুক্ত অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে একটির গ্রাহক। ওই ম্যানেজার এও জানিয়েছেন, ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর আদেশে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ওউংকে ১৮ মিলিয়ন ডলার (৬০০ মিলিয়ন ফিলিপিনি মুদ্রা-পেসো) পাঠিয়েছেন।

আর ফিলরেম সার্ভিস করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট সালুড বাউতিস্তা সিনেট ব্লু রিবন কমিটিকে বলেছেন, ওই অর্থ মায়া দেগুইতোর নিদের্শেই পাঠানো হয়েছে।

সিনেট কমিটির ব্যাংকিং সেক্টরের চেয়ারম্যান শুনানিতে বলেছেন, যে পদ্ধতিতে অর্থ স্থানান্তরিত হয়েছে তা কিভাবে ব্যাখ্যা করবো সেটা বুঝে উঠতে পারছি না।

শুনানি চলাকালে সিনেট কমিটির চেয়ারম্যান তিয়োইফিতো গুয়েনাগোনার প্রশ্নের মুখে নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করেন মায়া দেগুইতো। ওই শাখা থেকে আরো যে চারজনের অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তরিত তারা হলেন-মাইকেল ফ্রান্সিসকো ক্রুজ, জেসি ক্রিস্টোফার লাগোরাস, আলফ্রেড স্যানটোস ভেরগারা এবং এনরিকো তিয়োদেরদো ভ্যাসকুয়েস।

গুয়েনাগোনা দেগুইতোকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ২০১৫ সালে ১৫ ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলো খোলা হয়ে থাকে তাহলে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এতো দিনে তিনি কেন বের করতে পারেননি। তাছাড়া ওই অ্যাকাউন্টে হঠাৎ করে কীভাবেই বা এতো টাকা স্থানান্তরিত হলো।

এসময় দেগুইতো বলেন, ‘স্যার সরি। আমি আমার দোষ স্বীকার করছি। তবে সবকিছুর জবাব আমি সিনেটের বিশেষ অধিবেশনে দেবো।’

কিন্তু বিশেষ অধিবেশন ডাকার কথা নাকচ করে দিয়ে দেগুইতোকে গুয়েনাগোনা বলেন, আমি শুধু আপনার কাছে জানতে চেয়েছি যে, শাখা ম্যানেজার হিসেবে আপনি ওই অ্যাকাউন্ট খোলার সময় সাক্ষর করেছেন কিনা।

এরপর দেগুতো বলেন, ‘আমি শুনেছি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। কিন্তু আমি সব কিছুর জবাব বিশেষ অধিবেশনেই দেবো।’

শুনানি চলার একটা সময় ক্ষোভে ফেটে পড়েন সিনেটরদের কেউ কেউ। শুনানির এক পর্যায়ে সিনেট কমিটির চেয়ারম্যান তিয়োইফিতো গুয়েনাগোনা উচ্চস্বরে বলে উঠেন, ‘আপনি কি গোপন করছেন?’

সিনেট কমিটির ব্যাংক বিভাগের চেয়ারম্যান বলেন, ভূয়া অ্যাকাউন্টধারীদের প্রতিরোধ করাই তাদের (ব্যাংকার) কাজ। কিন্তু?’

সিনেটে একই রকম ক্ষোপ প্রকাশ করেছেন আরসিবিসি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান নির্বাহী লরেনজো তান এবং ব্যাংকের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিলের প্রধান লুরিয়ানদা রোজারিও। তবে ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান নির্বাহী লরেনজো তানের বিরুদ্ধেই এই কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে।

ব্যাংকের ভূয়া অ্যাকাউন্টের বিষয়ে সিনেট কমিটির চেয়ারম্যান গুয়েনাগোনার প্রশ্নের জবাবে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী তান বলেন, ‘আমি দুঃখিত যে, ব্যাংকের গোপনীয়তা ও আইনের বাধ্যবাদকতার কারণে এই ইস্যুতে এখন কথা বলতে পারবো না। তবে অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাংকে তদন্ত চলছে, আসল ঘটনা কি ঘটেছিল সেটা জানাতে আমাদের ব্যাংক বদ্ধপরিকর।’

সূত্র:চ্যানেল আই

উপরে