আপডেট : ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ ১২:৩৫

রেমিট্যান্সের প্রবাহে ভাটার টান, বাড়তে পারে বেকারত্ব

অনলাইন ডেস্ক
রেমিট্যান্সের প্রবাহে ভাটার টান, বাড়তে পারে বেকারত্ব

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অব্যাহত দরপতনের প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর অর্থনীতিতে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। এতে সঙ্কোচিত হয়ে পড়ছে বাংলাদেশের শ্রমবাজার। রেমিট্যান্সের প্রবাহে ভাটার টান পড়েছে।

দেশের  দুই-তৃতীয়াংশ রেমিট্যান্সের উৎস মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার সঙ্কোচিত হয়ে পড়ায় সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রবাসী বাংলাদেশের আয়ের ওপর। ইতোমধ্যে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে।

এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে রেমিট্যান্স আরো কমে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের ওপর।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, বিনিয়োগ স্থবিরতার কারণে আপাতত রিজার্ভে এর কোনো প্রভাব না পড়লেও সামনে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বেড়ে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বেড়ে যাবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত ছয় মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৭৪৯ কোটি ডলার। এর মধ্যে ৪২৮ কোটি ডলার আসে মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশ থেকে। যা মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৫৮ শতাংশ। যেখানে বছরখানেক আগেও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসত মোট রেমিট্যান্সের ৬৭ শতাংশ।

গত অর্থবছরে (২০১৪-১৫) মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল ৯০৭ কোটি ডলার। এ হিসাবে ছয় মাসে আসে ৪৫৩ কোটি ডলার, যা চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের চেয়ে বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে আরো দেখা যায়, বিদায়ী বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে রেমিট্যান্স আসে ৭৮২ কোটি ৯৮ লাখ ডলার, আর শেষের ছয় মাসে এসেছে ৭৪৮ কোটি ২৩ লাখ ডলার। এতে সামগ্রিকভাবে রেমিট্যান্স কম এসেছে।

গত জুলাই-ডিসেম্বরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৭৪৮ কোটি ২৩ লাখ ডলার, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে এসেছিল ৭৪৮ কোটি ৭১ লাখ ডলার।

শুধু তাই নয়, আগের বছরের একই সময়ের চেয়েও রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেছে। গত অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশ, সেখানে চলতি অর্থবছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। 
দিন দিন মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিশ্লেষকেরা রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ডলারের মূল্য পতনের পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়াকে অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন। 
উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জায়েদ বখত জানিয়েছেন, “আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমায় দেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্যে আয় কমে গেছে। এর ফলে উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে দিচ্ছে তারা। বড় কোনো প্রকল্প তারা নিচ্ছে না। এর ফলে যারা ইতোমধ্যে সেখানে চাকরি করছে, তাদের আপাতত সমস্যা না হলেও নতুন করে শ্রমিক যাওয়ার যে সুযোগ হতো তা হচ্ছে না। ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে এর প্রভাব পড়ছে।”

তিনি বলেন, আপাতত এর কোনো প্রভাব দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদে পড়ছে না। কেননা বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ দুই হাজার ৭০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে উন্নয়ন ব্যয় বেড়ে গেলে এবং বিনিয়োগ বাড়লে তখন সমস্যা দেখা দিতে পারে। 
এ দিকে ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে দেশের বাজারেও জ্বালানি তেলের দাম কমানোর তাগিদ দিয়েছেন। তারা বলছেন, ২০১৩ সালে জ্বালানি তেলের দাম অভ্যন্তরীণ বাজারে বাড়ানো হয়েছিল। তখন প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেলের মূল্য ছিল ১২০ ডলার। দাম বাড়ানোর সময় বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভর্তুকি কমাতে দাম সমন্বয় করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে গেলে অভ্যন্তরীণ বাজারেও কমানো হবে।

২০১৩ সালের পর থেকে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে তা ৩০ ডলারে নেমে এসেছে। জ্বালানি তেলের দাম কমলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম কমানো হয়নি। ফলে পরিবহন ভাড়াসহ পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কমেনি, বরং বেড়ে গেছে।
তারা জানান, জ্বালানি তেলের দাম সামনে আরো কমে যাবে। আর এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার আরো সঙ্কুচিত হয়ে পড়বে। নতুন শ্রমিক তো যেতে পারবেই না, বরং কর্মক্ষম শ্রমিক দেশে ফিরে আসবেন। তখন দেশে বেকার সংখ্যা বেড়ে যাবে।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় দেশে বর্ধিত হারে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য শিল্পায়নের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সে জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমানো হলে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় অর্ধেকে নেমে আসবে। তখন স্থানীয় বাজারে পণ্যের দাম কমে গেলে চাহিদা বাড়বে। আর এ চাহিদা মেটানোর জন্য নতুন নতুন শিল্প হবে। এতে বাড়বে কর্মসংস্থান।

বিডিটাইমস৩৬৫ডটকম/জিএম

উপরে